দোল উৎসবে মেতে উঠল মাধবডিহির প্রত্যন্ত গ্রাম,

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী,

      দোল মানেই আনন্দের উৎসব, মনকে রাঙিয়ে দিয়ে মিলনের উৎসব। মুহুর্তের জন্য ভুলে যাওয়া হয় সব দুঃখগাথা। করোনার আতঙ্ককে দূরে সরিয়ে রেখে মাধবডিহির বড় সুন্দরপুর গ্রামের 'সৃজনী' গোষ্ঠীর সৌজন্যে দোলের দিন এক অসাধারণ  মিলন উৎসবের সাক্ষী থাকল ছোট সুন্দরপুর, সেরপুর সহ পাশ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের অসংখ্য মানুষ। উৎসবের শুরুটা হয়েছিল বছর দু'য়েক আগে। এবার তৃতীয় বছরে পদার্পণ করল। 

     সাতসকালে আবির নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে বড় সুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দারা। শিশু থেকে শুরু করে গ্রামের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী মনের আনন্দে মেতে ওঠে দোলের উৎসব বসন্ত উৎসবে । একে অপরকে রাঙিয়ে দেয় আবিরে। মেয়েদের পরনে হলুদ শাড়ি এবং ছেলেদের পরনে ছিল হলুদ পাঞ্জাবী ও সাদা চুড়িদার। ঐতিহ্যবাহী শান্তিনিকেতনের দৃশ্য ফুটে ওঠে গ্রামের ক্যানভাসে। 

   প্রথা মেনে বৈকাল চারটে নাগাদ প্রথমে গ্রামের দুর্গামন্দিরে মূর্তির পাদদেশে আবির লেপন করা হয়। তারপর সবাই মিলে পদযাত্রার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরপরিচিত বসন্ত উৎসবের গানের তালে নৃত্য করতে করতে পাশের গ্রাম ছোট সুন্দরপুরে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে বাঙালির প্রথানুযায়ী ছোটদের মাথায় আবির দেওয়া হয় এবং গুরুজনদের পায়ে আবির দিয়ে তাদের আশীর্বাদ চেয়ে নেওয়া হয়। যাইহোক ছোট সুন্দরপুর গ্রামে গিয়ে উভয় গ্রামের বাসিন্দারা মিলিতভাবে আর একদফা আবির খেলায় মেতে ওঠে। সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় প্রতিবেশী সেরপুর গ্রামের বাসিন্দারা। বহু মানুষের সমাগমে বসন্ত উৎসব পরিণত হয় মিলন উৎসবে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। 

     তবে এখানেই বসন্ত উৎসব শেষ হয়নি। ফেরার পথে পোদ্দার পুকুর ফুটবল মাঠে আর একদফা আবির খেলা শুরু হয়। সঙ্গে ছিল ছোট্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রঙিন পোশাকে রবীন্দ্রনাথের গানের তালে গ্রামবাসীদের নৃত্যের দৃশ্য ছিল সত্যিই অসাধারণ। বহু মানুষের সমাগম ঘটলেও কোথাও নুন্যতম বিশৃঙ্খলা ছিলনা। শেষে সৃজনী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে গ্রামের দুর্গামন্দিরে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেককে মিষ্টিমুখ করানো হয়। 

    এই উৎসবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়ে গ্রামের মেয়ে অম্বিকা, বকুল প্রমুখদের চোখে-মুখে ছিল খুশির আমেজ। বকুলের বক্তব্য - এত আনন্দ অন্য কোনো উৎসবে পাওয়া যায়না। একই সুর অম্বিকার কণ্ঠে। তার বক্তব্য - শুধু নিজেদের গ্রামের নয়, অন্য গ্রামের বাসিন্দারা যখন উৎসবে যোগ দেয় তখন তার তাৎপর্য তো অন্যরকম হতে বাধ্য। কিছুক্ষণের জন্য সবকিছু ভুলে সত্যিকারের আনন্দ পাওয়া যায়। 

      কন্যা ইলোরাকে সঙ্গে নিয়ে সেরপুর গ্রাম থেকে এসেছিলেন সঞ্জয় চক্রবর্তী। তারও আনন্দের অনুভূতি একইরকম। তিনি বললেন - যেভাবে জেলার একটা প্রত্যন্ত গ্রাম আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে সত্যিই সেটা অকল্পনীয়। সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা থাকায় ইলোরা কিছুটা আনন্দ থেকে বঞ্চিত থেকে গেছে। 

    গ্রামের বাসিন্দা এবং অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা উজ্জ্বল মালিক বললেন- শহরের আধুনিকতা থেকে দূরে থাকা আমরা গ্রামের বাসিন্দা। কৃত্রিমতা বর্জন করে উৎসবের মধ্যে মিলনের সুর তুলে ধরার জন্য গত তিন বছর ধরে আমরা এই বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে চলেছি। নিজেদের গ্রামের সঙ্গে সঙ্গে অন্য গ্রামের বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে বসন্ত উৎসব সত্যিকারের মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে । এটাই তো কবিগুরুর লক্ষ্য ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *