শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকার, এবার কি ফাঁস হবে কাশ্মীর জেলের চাপা রহস্য? মোদি-শাহ-শুভেন্দুকে চিঠি, বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবিতে সরব আইনজীবী জয়দীপ মুখার্জী
স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর রহস্যমৃত্যু নিয়ে ফের জাতীয় স্তরে জোরালো প্রশ্ন তুললেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তথা অল ইন্ডিয়া লিগ্যাল এইড ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ মুখার্জী। পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পাঠানো এক বিস্তারিত চিঠিতে তিনি বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের কাছেও। ফলে বিষয়টি যে জাতীয় রাজনীতির অন্দরে নতুন করে বড়সড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল—ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্মভূমি হুগলি-সহ পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে এই প্রথম বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর সেই রাজনৈতিক পালাবদলের আবহেই জনসংঘ প্রতিষ্ঠাতার রহস্যমৃত্যুর প্রকৃত সত্য সামনে আনার দাবিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন জয়দীপ মুখার্জী। তাঁর বক্তব্য, ইতিহাসের এই অমীমাংসিত অধ্যায় সামনে আনার জন্য বর্তমান সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জয়দীপ মুখার্জীর অভিযোগ, ১৯৫৩ সালে কাশ্মীরের জেলে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যু কোনও স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল এক গভীর রাজনৈতিক রহস্যে ঘেরা অধ্যায়। অথচ সেই সময়কার কংগ্রেস সরকার তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কখনও পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করেনি বলেই দাবি তাঁর। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। তাই তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজও অজানা থেকে যাওয়া শুধু ইতিহাসের প্রতি নয়, দেশের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিও অবিচার।
এই কারণেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন অথবা সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে নতুন করে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি দেশের প্রতি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার দাবিও তুলেছেন জয়দীপ মুখার্জী।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই চিঠির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে জয়দীপ মুখার্জীর দীর্ঘ গবেষণা। বহু বছর ধরেই তিনি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যু রহস্য এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান প্রসঙ্গে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি তথ্য, পুরনো আর্কাইভ, ঐতিহাসিক দলিল, আইনি নথি ও বিভিন্ন অসঙ্গতি খতিয়ে দেখে তিনি একাধিকবার নতুন তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এমন বহু তথ্য ও প্রশ্ন রয়েছে যা সামনে এলে স্বাধীনোত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হতে পারে।
ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এই চিঠি নিছক আনুষ্ঠানিক আবেদন নয়; বরং বহু দশক ধরে চাপা পড়ে থাকা ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার এক বড়সড় উদ্যোগ। বিজেপি সমর্থকদের একাংশ ইতিমধ্যেই একে “ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের লড়াই” বলে দাবি করতে শুরু করেছে। ফলে জয়দীপ মুখার্জীর এই পদক্ষেপ যে নতুন করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মৃত্যু রহস্য এবং নেতাজীর অন্তর্ধান প্রসঙ্গকে জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে তুলে আনল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।