নাট্য সমালোচনা: নাটক “এবং ইন্দ্রজিৎ”
লিখেছেন: শুভাশিস খামারু (নাট্যব্যক্তিত্ব)
আমার তখন জন্ম হয়নি । ১৯৬৩ । আমার জন্মের চার বছর আগে । জীবন জীবিকার টানাপোড়েনে বাদল সরকার তখন ফ্রান্সে । একটা কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল এই নাটক লেখার ভিত । দু বছর পরে ৬৫ তে বহুরূপী পত্রিকার ২২তম সংখ্যায় ছাপা হয় “এবং ইন্দ্রজিৎ” । নাট্য হিসাবে প্রস্তুত করেছিল শৌভনিক নাট্যদল । ওই ৬৫তেই । মুক্তাঙ্গন মঞ্চে প্রথম অভিনয় । নির্দেশনায় গোবিন্দ গাঙ্গুলি ।
বলা হয় সুধীন্দ্রনাথ সরকারের নাট্যজীবনে মোড় ফেরার পথসন্ধি “এবং ইন্দ্রজিৎ” । এই নাটক নিয়ে নাটককারের অভিমত ছিল – “নিজেকে স্বীকার করা, নিজের সাধারণত্বকে স্বীকার করা মানুষের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন ।” এ নাট্যের জন্মাবার ৬১ বছর পরেও কী অপরিহার্য প্রাসঙ্গিকতা । থিয়েটার শূন্য প্রযোজনা । বয়সে নবীন কিছু ছেলেমেয়ের এই নাট্য নির্বাচন ও নির্মাণ – ভালোবাসার সাথে শ্রদ্ধা আদায় করে নেয় ।
ইন্দ্রজিৎ তো অমল-বিমল-কমলের মতো গড়পড়তা একটা মানুষ না । সে স্বাতন্ত্র্যকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা এক আলাদা মানুষ । এই আলাদা থাকাতেই তার যত অশান্তি । সেই অশান্তির ভয়ে সে তার নাম বলে নির্মল । নিয়মের অশান্তির এই ভয় থেকে স্বস্তি পেতে সে বোঝে, ‘মেঘের আড়াল দরকার এখন’ ।
থিয়েটার শূন্যর এই নির্মাণের ভালো লাগার কারণটা শুধু শ্রুতি মূলক নয় । এ নির্মাণের দৃশ্যসৌন্দর্য্যের দীপ্তিতে । সংলাপের প্রকাশ যেমন অনায়াস, নিটোল, আতিশয্যহীন – তেমনি আঙ্গিক অভিনয়ের সৌষ্ঠব । প্রত্যেকেই । মেদহীন, সুঠাম । বাদল সরকারের সেই ছোট ছোট বা স্বল্প শব্দ ব্যবহারে সংলাপ আর কাব্যময়তার সেই অনন্য রীতিকে সার্থক করে তুলেছে কৌশিক, সৌমী, স্নেহা, শুভ্রাংশু, দেবদাস, অর্ণব, সুদীপ্তরা । রীতিমতো টিউনড টিমওয়ার্ক । অপূর্ব অভিনয় যূথবদ্ধতা । তাই আলাদা করে কৌশিক আর সুদীপ্তর অসাধারণ অভিনয়ের প্রশংসা করতে আর ইচ্ছে করছে না ।
অনভিনীত অভিনয়ের সৌকর্যে মোবাইল বাজাকে কেন্দ্র করে মঞ্চে অভিনেতাদের তুলে আনার যে আপাত পরিচিত বিষয় – তাও অপূর্ব । সত্যিই বোঝা যায়নি । “প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব” শব্দটা বহুদিন পরে ব্যবহার করার সুযোগ পেলাম এই তরুণ তুর্কীদের জন্যে । আলো দিয়ে অনেক কবিতা এঁকেছে সৈকত । আবহ প্রয়োজন পূরণে নিখুঁত । মঞ্চ নিয়ে যে নৈর্ব্যক্তিক বিমূর্ততা তা কোথাও কি একটু জ্যামিতিক হয়ে যাচ্ছে? একটু ভাবা যেতে পারে । গিরিশ মঞ্চে এ নাট্যের চতুর্থ অভিনয় দেখে বড়ো ভালো লাগা নিয়ে বাড়ি ফেরা ।
