“বাংলার ক্রীড়াজগৎকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখুন: সরকারের কাছে লক্ষ্মণ জয়সওয়ালের আবেদন”
“প্রকৃত ক্রীড়া প্রশাসকরা ক্রমশ কোণঠাসা, ক্রীড়াঙ্গনে প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব”
কলকাতা: কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান এবং ভারতীয় ক্রিকেটের একাধিক কিংবদন্তির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত বেলগাছিয়া ইউনাইটেড-এর অবৈতনিক সম্পাদক লক্ষ্মণ জয়সওয়াল পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের কাছে রাজনীতির প্রভাব থেকে রাজ্যের ক্রীড়া ক্লাবগুলিকে মুক্ত রাখার জন্য কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও পরিচালনার দায়িত্ব প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমী ও অভিজ্ঞ ক্রীড়া প্রশাসকদের হাতেই থাকা উচিত।
পূর্ব ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট পরিকাঠামো শিল্পোদ্যোগী এবং দীর্ঘদিনের ক্রীড়া প্রশাসক জয়সওয়ালের মতে, বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়া ক্লাবগুলির উপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব বাংলার সামগ্রিক ক্রীড়া পরিবেশকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, এর প্রভাব এখন শুধু ক্লাব পরিচালনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; রাজ্যের ক্রীড়ার মান, প্রতিভা বিকাশ এবং ক্রীড়া সংস্কৃতির উপরও তার নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ছে।
“ক্রীড়া ক্লাবের পরিচয় ক্রীড়াকেই ঘিরে হওয়া উচিত। কোনও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সংগঠনের সম্প্রসারিত শাখায় পরিণত হতে পারে না,”বলেন জয়সওয়াল। তাঁর কথায়, “বছরের পর বছর ধরে যে সমস্ত প্রকৃত ক্রীড়া প্রশাসক তাঁদের সময়, অর্থ, শ্রম এবং সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে ক্রীড়ার উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তা হলে তার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ক্রীড়ারই।”
জয়সওয়াল আশা প্রকাশ করেন, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার ক্রীড়া ক্লাবের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান গ্রহণ করবে। তাঁর দাবি, এমন একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক পদাধিকারী তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা প্রভাবকে ব্যবহার করে কোনও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে না পারেন।
তিনি একই সঙ্গে *দলমত নির্বিশেষে বিধায়ক, সাংসদ, পুরপ্রতিনিধি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের ক্রীড়া ক্লাবের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড থেকে একটি উপযুক্ত দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ক্রীড়ার স্বার্থে তাঁদের সহযোগিতা অবশ্যই স্বাগত, তবে সেই অংশগ্রহণ হতে হবে স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও কাঠামোর প্রতি সম্মান রেখে।
“এটি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য নয়। এটি ক্রীড়াকে রাজনীতির প্রভাব থেকে রক্ষা করার আবেদন,” স্পষ্ট করে বলেন জয়সওয়াল। তাঁর কথায়, “শাসক দল এবং সরকারের দায়িত্ব হল, কোনও ক্লাব যাতে রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের মাধ্যমে দখল বা নিয়ন্ত্রিত না হয়, তা নিশ্চিত করা। আমরা যদি সত্যিই বাংলার ক্রীড়ার গৌরব ফিরিয়ে আনতে চাই, তা হলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নয়, যোগ্যতা, নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা এবং ক্রীড়ার প্রতি অবদানই ক্লাব পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হবে।”
জয়সওয়াল মনে করিয়ে দেন, বাংলার ক্রীড়া ইতিহাসে এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রীড়াবিদ তৈরি করেছে এবং রাজ্যে এক শক্তিশালী ক্রীড়া সংস্কৃতির ভিত গড়ে তুলেছে। এই ক্লাবগুলির অনেকগুলিই গড়ে উঠেছিল এমন মানুষদের উদ্যোগে, যাঁরা ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজেদের সময়, অর্থ, শ্রম এবং সাংগঠনিক দক্ষতা উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশাসকদের ক্রমশ সরিয়ে দেওয়া হলে বাংলার ক্রীড়ার ঐতিহ্যের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
দীর্ঘদিন ক্লাব ও ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত প্রশাসকদের উপর বাইরের প্রভাব ও চাপের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জয়সওয়াল। তাঁর মতে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অবদান থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে অনেক ক্রীড়া প্রশাসককে আজ নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
“একদিকে আমরা তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার কথা বলছি, উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলছি, বাংলার ক্রীড়াকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছি; অথচ অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকেই দুর্বল করে দিচ্ছি, যাদের হাতে এই প্রতিভাদের গড়ে ওঠার দায়িত্ব,” বলেন তিনি। “প্রকৃত ক্রীড়া প্রশাসকদের যদি ভয় দেখানো হয়, প্রান্তিক করে দেওয়া হয় অথবা স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়, তা হলে ক্রীড়ার মান ক্রমশ নেমে যাওয়াই স্বাভাবিক।”
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় রাজ্যের সরকারকে ক্রীড়া সংস্থা, ক্লাব, ক্রীড়াবিদ এবং স্বাধীন ক্রীড়া প্রশাসকদের সঙ্গে বৃহত্তর পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ক্রীড়া ক্লাবগুলির স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট সুরক্ষা-কবচ তৈরিরও দাবি জানান।
“বাংলার ক্রীড়ায় নবজাগরণ প্রয়োজন। কিন্তু ক্রীড়া ক্লাবগুলি যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তা হলে সেই নবজাগরণ কখনও সম্ভব নয়,” বলেন জয়সওয়াল। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “সরকারকে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। রাজনীতিকরা ক্রীড়াকে সমর্থন করুন, ক্রীড়ায় সহযোগিতা করুন, ক্রীড়ার উন্নয়নে উৎসাহ দিন—কিন্তু ক্রীড়ার প্রশাসন ও পরিচালনার দায়িত্ব ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া প্রশাসক এবং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলির হাতেই থাকুক।”
লক্ষ্মণ জয়সওয়ালের কাছে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বাংলার ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব পরিচয় ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন।
“আমরা যদি চাই, আগামী প্রজন্ম সেই বাংলাকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাক, যে বাংলা একদিন ক্রীড়া কিংবদন্তিদের জন্ম দিয়েছিল, তা হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে—সেই কিংবদন্তিদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলি যেন ক্রীড়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকে; রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে না ওঠেI”
