জমি থেকেই অভাবি দাম, মজুত আলু নিয়ে চাষিদের সংকট শস্যগোলা বর্ধমানে
আমিনুর রহমান
রাজ্যের শস্য গোলা পূর্ব বর্ধমান জেলায় আলুর অভাবি দাম নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে চাষিদের মধ্যে। বর্ষাকালে খরিপের ধান চাষের খরচ জোগানোর জন্য হিমঘরে আলু রেখেছিলেন চাষিরা। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, আলুর দাম বাড়বে। গত প্রায় দুমাস পার হয়েছে, কিন্তু আলুর দরে কোন হেরফের হয়নি। ফলে রাজ্যের শস্যগোলা হিসাবে পরিচিত পূর্ব বর্ধমান জেলায় ঘোর সংকট দেখা দিয়েছে চাষিদের মধ্যে। একেবারে জমি থেকে আলু উঠার মুখেই ভালো দাম পাননি। তারপর গত কয়েকমাসে লোকসানের মুখে পড়ে আগামী মরশুমে আলু চাষিদের আগ্রহ অনেকটাই কম হবে বলে জানা গিয়েছে।
এ মুহূর্তে হিমঘরে রাখা জ্যোতি আলুর ৫০ কেজি বস্তা আলুর ফ্রি- বন্ড ১৩৫ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর হিমঘর থেকে বার করা বাছাই আলুর বস্তার দাম ১৭০ টাকা। এই দর চাষিদের কাছে অবশ্যই লোকসানের। চাষিদের দাবি যেভাবে আলু ফলানোর জন্য খরচ খরচা বেড়েছে তাতে এবার বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা, লোকসানের মুখে পড়ে দেনার দায় মাথায়। চাষিরা জানাচ্ছেন, গতবছর আলু চাষ করতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৩ টাকা ৫০ পয়সা। এরপর আছে বস্তার দাম, হিমঘর পাঠানোর খরচ। সব নিয়ে এখন যা বাজার মূল্য তাতে চাষিদের আয় প্রতি কেজিতে মাত্র দেড় টাকা।
চাষিদের আশা ছিল হিমঘরে আলু রেখে দিয়ে দাম কিছুটা বাড়তি মিলবে। কিন্তু গত দুমাসে দাম বাড়েনি। ফলে ব্যাপক লোকসানের মুখে চাষিরা। হতাশ হয়ে আমন ধান চাষের পর আলু চাষে নামবেন কিনা সে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এবার যে ভাবে লোকসানের মুখে পড়ে দেনার দায়ে পড়তে হয়েছে, তাতে টাকার অভাবে আলু চাষ করা যাবে না বলে দাবি চাষিদের।
প্রতি বছর মজুত আলু বিক্রি করে আমন ধান চাষে খরচ করেন। কিন্তু মজুত আলুর দাম এতটাই কম যে চাষিরা ওই আলু বিক্রি করে খুব একটা লাভ পাচ্ছেন না। ফলে বাইরে থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে চাষের খরচ জোগাতে হচ্ছে। এই অবস্থায় চাষিদের ক্ষোভ সামাল দিতে এগিয়ে এসেছিলেন রাজ্যের কৃষি বিপনন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। সেরকম হলে ভর্তুকির মাধ্যমে লোকসান থেকে রেহাই দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। অবস্থার কোন হেরফের হয়নি। এ বিষয়ে চাষিদের সমস্যা নিয়ে সরব হয়েছেন অল বেঙ্গল ট্রেড এন্ড ট্রের্ডাস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিশ্বেশ্বর চৌধুরী। তিনি বলেন, রাজ্যের জনদরদী মুখ্যমন্ত্রী চাষিদের দুরাবস্থার কথা ভেবে নিশ্চয় কোন ব্যাবস্থা নেবেন আশা করি। কারণ রাজ্যের কৃষি প্রধান জেলা হিসাবে দ্বিতীয় ফসল হচ্ছে আলু। এই চাষের উপর চাষিরা অনেকটাই নির্ভরশীল। আলুর ব্যাবসার মাধ্যমে বহু মানুষ জীবন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। তাই এই সংকটে সরকার নজর দিলে ভালো হয় বলে বিশ্বেশ্বর বাবুর দাবি।
চাষিদের দাবি, আলুর ‘বাম্পার’ ফলনের জন্যই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু বাংলা নয়, এবার পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে আলুর ফলনও অনেক বেশি হয়েছে। ফলে একেবারে শুরুতেও আলুর দাম খুব একটা ভালো পাননি চাষিরা। বস্তা পিছু দাম ছিল ২৫০ টাকা। ভালো দামের আশায় চাষিরা হিমঘরে আলু মজুত রেখেছিলেন। প্রগতিশীল আলু ব্যাবসায়ী সমিতির দেওয়া হিসাবে , রাজ্যের হিমঘর গুলোতে প্রায় ১৬ কোটি বস্তা আলু মজুত রাখা হয়েছিল। প্রতি বছর আগস্ট মাস পর্যন্ত মজুত আলুর ৫০ শতাংশ বের করে নেওয়া হয়। কিন্তু এবার বের হয়েছে ৩৯.৮৭ শতাংশ। চাষিরা জানিয়েছেন জুলাই মাসে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, অসম রাজ্য গুলোতে আলু পাঠানো হয় এ রাজ্য থেকে। কিন্তু এবার ওই সব রাজ্যে চাহিদা একেবারেই নেই।
আলুর দাম না পেয়ে অনেকটাই লোকসানের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। সরকারের বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া উচিত বলে দাবি সকলের। এখনো বহু চাষির আলু হিমঘরে মজুত রয়েছে। এই সময় চাষিরা আলু বিক্রি করে ধান চাষের খরচ জোগাড় করেন। দাম না বাড়লে চাষিরা সমস্যায় পড়বেন। ধান চাষ করতে কৃষকদের ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার চাষি ঋণে জর্জরিত হয়ে যাবে। চাষিরা বলেন, সারের দাম প্রতি বছর বাড়ছে। অথচ চাষিরা আলুর দাম পাচ্ছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনে চাষিরা আলু চাষে উৎসাহ হারাবে। সে ক্ষেত্রে রাজ্যের আলু চাষের ঘাটতির সম্ভবনা দেখা দিতে চলেছে। চাষিদের অভিযোগ ঢাকঢোল পিটিয়ে আলু চাষিদের জন্য একাধিক পরিকল্পনার কথা বলা হলেও কার্যত কোন সুবিধা মেলেনি। এ নিয়ে কৃষি প্রধান জেলায় ক্ষোভ তুঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে আগামী ডিসেম্বর মাসে সব মজুত আলু হিমঘর থেকে বের করে নিতে হবে। কিন্তু চাষিদের আশংকা ওই সময়ের মধ্যে হিমঘর খালি করা সম্ভব নয়। কারণ বাজারে চাহিদা এবং দাম দুটোই কম। প্রগতিশীল আলু ব্যাবসায়ী সমিতির রাজ্য সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, যা পরিস্থিতি তাতে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে রেহাই মিলবে না। হিমঘরে থাকা আলুর ভর্তুকি, আলুর বিদেশে রপ্তানি, পরিবহনে ভর্তুকির মতো দাবি তুলেছেন তিনি। এসব দাবি পূরন না হলে আগামী আলু চাষের মরশুমে আরও সমস্যা দেখা দেবে।