স্তন ক্যান্সার হওয়ার বয়স তো আমার নয়”: এই ধারণা কীভাবে রোগ নির্ণয়ে দেরি ঘটাতে পারে
ডাঃ প্রগতি সিংহল, কনসালটেন্ট – ব্রেস্ট অঙ্কোলজি ও অঙ্কোপ্লাস্টিক সার্জারি,
নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত
কোনও তরুণী যখন স্তনে কোনও গাঁট আবিষ্কার করেন বা স্তনে কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তখন তাঁর প্রথমেই মনে হতে পারে, “এটা হয়তো হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে” অথবা “আমার তো স্তন ক্যান্সার হওয়ার বয়স হয়নি।” অল্পবয়সি মহিলাদের স্তনের অনেক পরিবর্তনই ক্ষতিকর নয়, তবে শুধুমাত্র বয়স কম বলে কোনও পরিবর্তনকে উপেক্ষা করলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় দেরি হতে পারে, যা চিকিৎসার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়লেও, অল্পবয়সি মহিলাদেরও এই রোগ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, তরুণীদের স্তন ক্যান্সার দেরিতে শনাক্ত হয়, কারণ উপসর্গগুলিকে উপেক্ষা করা হয়, ঋতুচক্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় অথবা ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা, সিস্ট কিংবা সংক্রমণের মতো সাধারণ সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। তাই শুধুমাত্র বয়সের কারণে স্তনে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তনকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, ভারতে স্তন ক্যান্সারের আক্রান্ত ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগীর বয়স ৬০ বছরের কম এবং তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীর বয়স ৩৫ বছরেরও কম।
স্তন ক্যান্সারের সবচেয়ে পরিচিত সতর্কতামূলক লক্ষণ হল স্তন বা বগলে নতুন কোনও গাঁট বা পুরু হয়ে যাওয়া অংশ অনুভব করা। এ ছাড়াও, স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন, নির্দিষ্ট কোনও স্থানে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ত্বকে টোল পড়া বা কুঁচকে যাওয়া, লালচে ভাব, ফোলাভাব, ত্বক পুরু হয়ে যাওয়া, কমলালেবুর খোসার মতো ত্বকের গঠন, স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া অথবা স্তনবৃন্ত থেকে তরল নির্গত হওয়ার মতো লক্ষণগুলির ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে, কোনও কারণ ছাড়াই নিজে থেকে তরল বের হলে বা রক্তমিশ্রিত স্রাব দেখা গেলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। এই লক্ষণগুলির অর্থ যে ক্যান্সারই হয়েছে, তা নয়; তবে নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
অল্প বয়সেও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস, BRCA1 বা BRCA2-এর মতো বংশগত জিনগত পরিবর্তন, অতীতে বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসা নেওয়ার ইতিহাস এবং নির্দিষ্ট কিছু স্তনজনিত সমস্যার ব্যক্তিগত ইতিহাস। তবে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অনেক তরুণীর ক্ষেত্রেই কোনও স্পষ্ট ঝুঁকির কারণ থাকে না। তাই পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস নেই বলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তরুণীদের নিজেদের স্তনের স্বাভাবিক চেহারা ও গঠন সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। এর অর্থ ভয় পেয়ে বারবার স্তন পরীক্ষা করা নয়; বরং ঋতুচক্রের পরেও কোনও পরিবর্তন স্থায়ী হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। স্তনে নতুন বা অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তন দেখা গেলে গাইনোকোলজিস্ট, ব্রেস্ট স্পেশালিস্ট অথবা প্রাথমিক চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। শারীরিক পরীক্ষা এবং বয়সের ভিত্তিতে চিকিৎসক আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম বা অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। ইমেজিং পরীক্ষায় সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়লে বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে।
বার্তাটি সহজ: স্তনের বেশিরভাগ গাঁটই ক্যান্সার নয়, কিন্তু কারণহীন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিটি পরিবর্তনকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অযথা উদ্বেগ কমানো যায়, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় এবং ক্যান্সার ধরা পড়লে ভালো ফলাফলের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। বয়স কম হলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি একেবারে থাকে না—এমন নয়। নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
