নাট্য পর্যালোচনা:
সুটকেস
আমরা প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছি এক একটা সুটকেস হাতে, ভেতরে কি আছে না দেখেই ; এক গোপন আকাঙ্ক্ষায়-আশঙ্কার চোরাবালিতে! সম্প্রতি মুক্তাঙ্গনে ক্যালকাটা কোরাস থিয়েটারের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হল বাদল সরকারের তৃতীয় ধারার বিখ্যাত নাটক সুটকেস। নতুন আঙ্গিকে। বর্তমানে কোলকাতা জুড়ে নাটকের একটা ধারা-প্রতিযোগিতা চলছে – চটকদার, শারীরিক কর্ষদধর্মী নাট্য উপস্থাপনায়; সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধতার আকুতির মাঝে সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এই নাটক।
শ্যামল-পারুল-অবনী আর সুটকেস ! নাটকের শুরুতে দেখা যায় শ্যামল বিপদে পড়ে একটি সুটকেস হাতে বন্ধু অবনীর বাড়িতে এসেছে সেটি রাখতে। অবনীর স্ত্রী পারুল ও একে অপরের বন্ধু। সংসার জীবনের ব্যস্ততা, আদর্শগত জীবনধারার কারণে এখন আর খুব বেশি যোগাযোগ নেই দুই বন্ধুর মাঝে। শ্যামলের প্রতি পারুলের পূর্বের মুগ্ধতা বজায় থাকলেও প্রাক-স্বাধীনতা উত্তাল সময়ে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সুটকেস রাখতে অস্বীকার করে। শ্যামলের চমক ভাঙ্গে। কোনক্রমে জোর করে সুটকেস রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। ইতিমধ্যে অফিস থেকে ফিরে আসে অবনী। ঘরের কোণে চাবি বন্ধ সুটকেস দেখে স্ত্রীর কাছে জানতে চায় - কোথা থেকে এলো ! স্বদেশী করা পুরানো বন্ধু তার স্ত্রীর সঙ্গে গোপনে দেখা করে এই কাজটি করে গেছে জেনে অভিমানে-আতঙ্কে-আশঙ্কায় ভেঙে পড়ে অবনী! পারুল আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অবনীর মুখ থেকে আপন মনে বেরিয়ে আসে- 'যতদিন তুমি আমি আছি, ও সুটকেস আমাদের মাঝে থাকবে!'
এই আর্তি চিরকালীন। ভয়-সন্দেহ-অস্তিত্বহীনতার লড়াই যত না অপরের সঙ্গে, তার চেয়ে হাজারগুন বেশি নিজের সঙ্গে নিজের! সুটকেস আসলে আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আবার সম্পর্কের মাঝে দেওয়ালও। এক ছাদের নিচে বাস করা স্বামী স্ত্রীর মনের দূরত্ব কতখানি - এই প্রশ্ন রেখে নাটক শেষ হয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন-অপূর্ণতা-পারস্পরিক দূরত্ব অথচ পুরানো প্রেমে ঝলক – অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন পারুলের ভূমিকায় চান্দ্রেয়ী নিয়োগী। প্রতিমুহূর্তে প্রাপ্তির সুখ ও অজানা আশঙ্কার দোলাচল তার শরীরী ভাষায় ধরা পড়েছে। বিশেষ করে সুটকেস নামক বস্তুটি যে স্নেহে-আদরে-আতঙ্কে বুকে জড়িয়ে মঞ্চে পদচারণা করেছেন – এক কথায় অসাধারণ। প্রাণ পেয়েছে সমগ্র নাটক। অবনীর ভূমিকায় গৌরব সেন শুরুতে একটু নড়বড়ে থাকলেও চূড়ান্ত পর্বে অসাধারণ। গল্প যখন ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছে তখন অবনীর কর্তৃত্ব-দাপট-অসহায়তা একইসঙ্গে ফুটে উঠেছে বাস্তবতার মানদণ্ডে। বরং সাধারণ লেগেছে শ্যামলের ভূমিকায় নির্দেশক স্বয়ং শুভ্রজিৎ লাহিড়ীর অভিনয়। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্রের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে বারে বারে। লক্ষ্যভ্রষ্ট মনে হয়েছে! একটি ছোট্ট অথচ গুরুত্বপুর্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রতিবেশী বিন্দুবাসিনী রূপী রূপা দত্ত চৌধুরী। যেন ছুরির ফলার মত তীক্ষ্ণ – মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দাপিয়ে বেড়িয়েছেন!
আলো কল্যাণ ঘোষ। মিউজিক কৃশাণু ব্যানার্জি ও প্রক্ষেপণে রব। মঞ্চ সজ্জায় রাণা চ্যাটার্জি এবং সহকারি নির্দেশনায় মৌসুমী রায়।
এ নাটকে বড় সেট বা আলো নেই- চরিত্র গুলোই একে একটি জোরালো আলো। মধ্যবিত্ত সংসার জীবনের টানা পোড়েন নিয়ে বহু পূর্বে লেখা নাটক আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। বাদল সরকার সেখানেই অনন্য।
পর্দা সরিয়ে নাটক শুরু হচ্ছে উদাত্ত কন্ঠে পারুলের নাট্য অনুশীলনের মধ্য দিয়ে - কিন্তু কেন!! মূল নাটকের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক ঠিক বোঝা গেল না! এমনই কিছু বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে পারলে আরো অর্থবহ হয়ে উঠবে এ নাটক।
- ( গোপাল বিশ্বাস, কোলকাতা)
