গ্রহরাজ ঠাকুরের বাৎসরিক উৎসবে সিঙ্গির মোড়ে মানুষের ঢল, লোকসংস্কৃতি রক্ষায় কুরচিগ্রামবাসীর উদ্যোগ প্রশংসিত
রাহুল রায়, কাটোয়া : পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া ২ ব্লকের করুই অঞ্চলের কুরচি-সিঙ্গির মোড়ে পাঁচদিনব্যাপী গ্রহরাজ ঠাকুরের বাৎসরিক উৎসবের সমাপ্তি হলো বুধবার রাতে। পুজোপাঠ, নরনারায়ণ সেবা, যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিগান, বাউলগান এবং নৃত্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পাঁচদিন ধরে জমজমাট ছিল গোটা এলাকা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্প ও লোকসংস্কৃতিকে ধরে রাখার কুরচিগ্রামবাসীদের উদ্যোগ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
উৎসবের পাঁচদিনই মন্দির চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় ছিল মানুষের ভিড়। পুজো এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন এলাকার মানুষ। উৎসব উপলক্ষে সিঙ্গির মোড়ের রাস্তার দু’পাশে বসে মেলা। মেলায় মিষ্টি, খাবার, খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান বসে। শিশুদের বিনোদনের জন্যও ছিল নানা আয়োজন। ফলে সন্ধ্যা নামার পর থেকেই মেলা ও মন্দির চত্বর কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
উৎসবের চতুর্থ দিনে অনুষ্ঠিত হয় কবিগান ও বাউলগানের আসর। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমান। লোকশিল্পীদের পরিবেশনায় মেতে ওঠেন দর্শকরা। এর পর বুধবার ছিল উৎসবের শেষ দিন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার বাধা কাটিয়ে বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত মন্দির চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ নৃত্য অনুষ্ঠান।
ব্যারাকপুরের ত্রিনয়নী ডান্স গ্রুপের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন দলের ছাত্র-ছাত্রীরা। একের পর এক মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মন জয় করে নেন খুদে ও তরুণ শিল্পীরা। নৃত্যের তালে মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। অনুষ্ঠান দেখতে সন্ধ্যা থেকেই দর্শকদের ভিড় বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মহিলা দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনুষ্ঠান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠান। এতে খুশি উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে এলাকার মানুষ। নৃত্য অনুষ্ঠানকে ঘিরে সিঙ্গির মোড় চত্বরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। দর্শকদের উৎসাহ ও হাততালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর।
উৎসবের শেষে পুজো কমিটির সদস্যরা উপস্থিত সমস্ত দর্শক, শিল্পী ও সহযোগী ব্যক্তিদের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকেও ধন্যবাদ জানান। তাঁদের সহযোগিতা ও উপস্থিতির কারণেই পাঁচদিনের এই বাৎসরিক উৎসব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।
কুরচিগ্রামবাসীদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। তাঁদের বক্তব্য, আধুনিকতার দাপটে হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কবিগান, বাউলগান, যাত্রা ও নৃত্যের মতো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয় বছরেও গ্রহরাজ ঠাকুরের বাৎসরিক উৎসবকে ঘিরে কুরচিগ্রামবাসীদের এই উদ্যোগ আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদী এলাকার মানুষ।
