রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দ্বিমাসিক আর্থিক নীতির ঘোষণা:
বিশ্ব ও ভারতের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি:

পার্থ প্রতিম সেন
(প্রাক্তন চেয়ারম্যান পশ্চিমবঙ্গ গ্রামীণ ব্যাংক)

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মনিটারি পলিসি কমিটি প্রতি দু’মাস অন্তর অন্তর মিটিং করে বিশ্ব অর্থনীতি (গ্লোবাল ইকনমি), দেশের অর্থনীতি ( ডোমেষ্টিক ইকনমি) পর্যালোচনা করে আগামী দিনে অর্থনীতি কোন খাতে বইবে, সে সম্বন্ধে নিজেদের ধারণা, অনুমান, দৃষ্টিভঙ্গি বা আউটলুক বর্ণনা করে।

পর্যালোচনায় অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টর বা ক্ষেত্রে যেমন কৃষি, উৎপাদন, পরিষেবা ক্ষেত্রে বৃদ্ধি বা হ্রাস সম্বন্ধে আলোকপাত করা হয়।

তাছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা করা হয়। কারণ মূল্যবৃদ্ধি বা
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের বৃদ্ধির যোগাযোগ আছে। মূল্যবৃদ্ধি হতে থাকলে সুদের হার বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির বৃদ্ধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার খায়।

তাছাড়া রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অনেক সময় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রেপো রেট পরিবর্তন করে।

বৈশ্বিক অর্থনীতি বা গ্লোবাল ইকনমি: বিশ্ব অর্থনীতি আপাততঃ নিম্নমুখী বলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মত ব্যক্ত করেছে, কারণ হিসেবে বলেছে বিশ্বের প্রায় সবদেশেই মুল্যস্ফীতিতে লাগাম টানার জন্য সুদের হার বাড়ানোর ফলে ফিনান্স করা বা লগ্নির ক্ষেত্রে একটা টাইট সিচুয়েশন বা আঁটোসাঁটো ভাব বিরাজ করছে ফলে রিয়েল ইকোনমিতে উৎপাদন ও সাথে সাথে জোগান ব্যাহত হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ জীবন ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে উপভোক্তাদের অর্থনীতিতে আস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং তাঁরা নিত্যপ্রয়োজনীয় বা বিলাসী দ্রব্য সামগ্ৰী কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন।

প্রতিটি দেশেই মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত উঁচুস্তরে বিদ্যমান রয়েছে যার মূল কারণ হল খাদ্যসামগ্ৰী এবং জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি। তবে অতি সম্প্রতি মূল্যবৃদ্ধি নিম্নমুখী
হওয়ার কিছু কিছু লক্ষণ সুস্পষ্ট হচ্ছে যার ফলে আর্থিক আঁটোসাঁটো ভাব কিছুটা হলেও শিথিল হবে আশা করা হচ্ছে এবং সুদের হার বৃদ্ধির গতি কিছুটা কম হবে হয়ত। সরকারি বন্ড ইল্ড নিম্নমুখী হওয়ায় আমেরিকার ডলারের দাম সুউচ্চ চূড়া থেকে কিছুটা নেমে এসেছে। তবে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পুঁজির প্রবাহ অস্থির ও অনিশ্চিত এবং উন্নত অর্থনীতিতে বৈশ্বিক পুঁজির উপচেপড়া অবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির সহায়ক বলে মনে হচ্ছে না।

দেশীয় অর্থনীতি বা ডোমেস্টিক ইকোনমি: দেশীয় অর্থনীতিতে গত আর্থিক বছরের (২০২১-২০২২) দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের তুলনায় এই আর্থিক বছরের (২০২২-২০২৩) দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে রিয়েল জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশ যদিও এই বছরে প্রথম ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির হার ছিল ১৩.৫ শতাংশ। জোগানের দিক থেকে দেখলে এই বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গ্ৰস ভ্যালু এডেড বা ‘জিভিএ’ বৃদ্ধির হার ৫.৬ শতাংশ।

এই আর্থিক বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ( অক্টোবর – ডিসেম্বর, ২০২২), দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ভালো বর্ষণ হওয়ার ফলে এবং জমা করে রাখা জলের লেভেল গড় থেকে বেশি থাকায় রবি শষ্যের বপনে এই বছরের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে।

পারচেজিং ম্যানেজার ইনডেক্স ( পিএমআই) এবং অন্যান্য হাই ফ্রিকোয়েন্সি ইন্ডিকেটরস থেকে স্পষ্ট যে
উৎপাদন শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও কাজকর্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উৎসব মরশুমকে সামনে রেখে অনেক উপভোক্তাই খরচ কমিয়ে অর্থ জমাতে থাকেন। আবার উৎসব মরশুমে উপভোক্তারা প্রয়োজনীয় নয় এমন অনেক দ্রব্য সামগ্ৰী কেনাকাটা করেন।

উৎসব মরশুমে এই জমানো অর্থ খরচ করা এবং প্রয়োজন বহির্ভূত বিলাসী দ্রব্য সামগ্ৰী কেনাকাটার ফলে দেশীয় অর্থনীতিতে চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, তবে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি সমান হয়নি। গ্ৰামীণ ক্ষেত্রের তুলনায় শহরে চাহিদা বেশি বেড়েছে তবে গ্ৰামীণ এলাকায়ও চাহিদা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও কিছু কিছু প্রসার ঘটেছে। ১৯ মাস পর পর বৃদ্ধির পর অক্টোবর মাসে পণ্য সামগ্ৰী রপ্তানির সংকোচন হয়েছে। তেল ও সোনা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আমদানি কমেছে।

কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা উপভোক্তা মূল্যসূচক সেপ্টেম্বরের ৭.৪ শতাংশ থেকে কমে গিয়ে অক্টোবরে দাঁড়িয়েছে ৬.৮ শতাংশ।

শস্যকণা, দুধ, মশলাপাতির দাম না কমলেও আনাজপাতি ও বিভিন্ন রকমের মশলার দাম কমার ফলে খাদ্যদ্রব্য সম্বন্ধীয় মূল্যসূচক নিম্নমুখী হয়েছে। এলপিজি, কেরোসিন, জ্বালানি কাঠ ইত্যাদির দাম কমার ফলে জ্বালানি সংক্রান্ত মূল্য সূচকও অক্টোবর মাসে নিম্নমুখী হয়েছে।

তবে কোর বা মূল খুচরো (সিপিআই) মূল্যসূচক উচ্চস্তর ( ৬ শতাংশের
আশেপাশে)দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে আছে কারণ তার প্রায় প্রতিটি উপাদানের দাম বা মূল্য উপরের দিকে বিরাজমান।

দেশের অর্থনীতির ফিনান্সিয়াল সেক্টরে লিকিউডিটি অর্থাৎ ক্যাশ বা ক্যাশ সমতুল্য অর্থের প্রাচুর্যতা যথেষ্ট আছে।

গত অগাষ্ট -সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবর নভেম্বর মাসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লিকিউডিটি এডজাস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটির আওতায় ব্যাঙ্কিং সিস্টেম থেকে প্রতিদিনের গড় ক্যাশ বা ক্যাশ সমতুল্য ফান্ডের বিলয় বা অ্যাবজর্বশন কম ছিল অর্থাৎ ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে লিকিউডিটি বেশি ছিল।

১৮ নভেম্বর তারিখে বছর থেকে বছরের হিসেব অনুযায়ী, এমথ্রি মানি সাপ্লাই বা অর্থের জোগান বেড়েছে ৮.৯ শতাংশ এবং ব্যাঙ্কদের দেয়া ঋণ প্রদান বেড়েছে ১৭.২ শতাংশ।

২ ডিসেম্বর তারিখে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে ছিল ৫৬১.২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা কিনা এক স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে বলে গণ্য করা যায়।

আগামী দিনের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আউটলুক বা দৃষ্টিভঙ্গি: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বলেছে আগামীতে ইনফ্ল্যাশন বা মূল্যস্ফীতির চলন বা গতি-প্রকৃতি নির্ভর করবে বৈশ্বিক এবং দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতির উপর। যদিও আনাজপাতির দাম শীতকালে কমার সম্ভাবনা আছে, তবে শস্যদানা এবং মশলাপাতির দাম জোগানের অপ্রতুলতার জন্য অদূর কালে হয়ত উপরের দিকেই থাকবে। পশুখাদ্যের মূল্য ঊর্দ্ধমুখী থাকার ফলে দুধের দামও ঊর্দ্ধমুখী থাকার সম্ভাবনা বেশি। বিশ্বে ও দেশে বিভিন্ন ধরণের প্রতিকূল আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনার জন্য খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি থেকেই যায়। তাছাড়া বৈশ্বিক চাহিদা কমছে এবং ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এখনও পর্যন্ত না
হওয়ার কারণে খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির মূল্যের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।

বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্ৰী উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের মূল্য যদি কিছুটা কমে এবং জোগান শৃঙ্খলে চাপ সহজ হয়, তা হলে আগামী দিনে উৎপাদিত সামগ্ৰীর মুল্য কিছুটা নিম্নমুখী হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল বা অন্যান্য দ্রব্যবস্তু যে সবের মূল্য আগে বৃদ্ধি করা হয়নি, সে সব ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে এবং সেই কারণেই কোর ইনফ্ল্যাশন বা মূল মূল্যস্ফীতির হার খুব বেশি নড়াচড়া না করার আশঙ্কাই বেশি।

উপরে বর্ণিত সব ধরনের ফ্যাক্টরস এবং অশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ধরে নিয়ে ২০২২-২৩-এর জন্য সম্ভাব্য খুচরো মূল্যস্ফীতি ৬.৭ শতাংশ ধরে নেয়া হয়েছে। তারমধ্যে ২০২২-২৩ সালের তৃতীয় ও চতুর্থ ত্রৈমাসিকের সম্ভাব্য খুচরো মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৬.৬ শতাংশ এবং ৫.৯ শতাংশ হিসেবে অনুমান করা হয়েছে।

একটু এগিয়ে আগামী আর্থিক বছরে (২০২৩-২০২৪) মৌসুমী বায়ুর আনাগোনা স্বাভাবিক ধরে নিয়ে খুচরো মূল্যস্ফীতি বা ভোগ্য পণ্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি আরো কিছুটা মাথা নোয়াবে বলে ধারণা করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের প্রথম এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের কনজ্যুমারস প্রাইস ইনডেক্স নির্ভর বা খুচরো মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৫ শতাংশ এবং ৫.৪ শতাংশ অনুমান করা হয়েছে।‌

উল্লেখ্য, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বর্ণিত কনজ্যুমারস প্রাইস ইনডেক্স নির্ভর মূল্যস্ফীতির টার্গেট হল ৪ শতাংশ, উপরের দিকে সহনসীমা ৬ (৪+২) শতাংশ এবং নীচের দিকে ২ (৪-২) শতাংশ।

২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে খুচরো মূল্যস্ফীতি লাগাতার উপরের সহনসীমা ৬ শতাংশর উপর থেকেছে, তবে আশা করা হচ্ছে আগামী আর্থিক বছরের শুরু থেকে খুচরো মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশর নীচে নামবে কিন্তু টার্গেটের (৪ শতাংশ) উপর থাকবে।

রবি শস্যের ফলন ভালো হবে বোঝা যাচ্ছে, তাই কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধির সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। কনট্র্যাক্ট – ইনটেনসিভ ক্ষেত্রগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে শহরে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও বিক্রি বেড়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক থেকে দেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে সরকারি খরচ বাড়ছে, তাই দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ছে যা কি না দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক শুভ সংকেত।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সার্ভে অনুযায়ী জানা যায়,
অর্থনীতিতে উপভোক্তাদের আস্থা বাড়ছে, প্রয়োজনীয় এবং বিলাস সামগ্ৰীর কেনাকাটা বাড়ছে।

তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির কিছু সমস্যার সম্মুখীন থাকবে আমাদের দেশের অর্থনীতি।
যেমন: প্রথমতঃ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত সন্ত্রাস-অশান্তি জনিত লাগাতার ও দীর্ঘায়িত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, দ্বিতীয়তঃ বৈশ্বিক আঁটোসাঁটো আর্থিক (ফিনান্সিয়াল) অবস্থা অর্থাৎ পুঁজি বা অর্থ সবদিকে সবদেশে স্বাধীন ভাবে চলাচল করতে পারছেনা। তৃতীয়তঃ পণ্য সামগ্রীর বৈদেশিক চাহিদা কমে যাওয়া।

উপরে বর্ণিত দেশের অভ্যন্তরে এবং বিশ্বের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি বিচার বিশ্লেষণ করে ২০২২-২৩ আর্থিক বছরের সম্ভাব্য জিডিপি বা মোট ঘরোয়া উৎপাদনের বৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। ২০২২-২৩ আর্থিক বছরের তৃতীয় ও চতুর্থ ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধি যথাক্রমে ৪.৪ শতাংশ এবং ৪.২ শতাংশ অনুমান করা হয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরের ( ২০২৩-২৪) প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের মোট ঘরোয়া উৎপাদনের বৃদ্ধি যথাক্রমে ৭.১ শতাংশ এবং ৫.৯ শতাংশ অনুমান করা হয়েছে।

পলিসি রেটের পরিবর্তন: ঊর্দ্ধমুখী মুল্যস্ফীতিতে লাগাম পরানোর জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গত মে মাস থেকে প্রায় প্রতি দ্বিমাসিক মনিটারি পলিসি কমিটি মিটিং-এ রেপো রেট বাড়িয়েছে। রেপো রেট ৪ শতাংশ থেকে ১৯০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৯০ শতাংশ। সম্প্রতি ৫-৭ ডিসেম্বরে হওয়া রিজার্ভ ব্যাঙ্ক মনিটারি পলিসি কমিটির মিটিং-এ আরো ৩৫ বেসিস পয়েন্ট রেপো রেট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কারণ এখনও হেডলাইন ইনফ্ল্যাশন বা শিরোনাম মূল্যস্ফীতি বা সমূহ মূল্যস্ফীতি উপরের সহনসীমা ৬ শতাংশর নীচে নামেনি এবং মূল মূল্যস্ফীতি বা কোর ইনফ্ল্যাশনও উপরের দিকে অবিচলিত অবস্থায় বিরাজ করছে।

উল্লেখ্য, শিরোনাম বা সমূহ মুদ্রাস্ফীতি থেকে খাদ্যদ্রব্য সংক্রান্ত মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংক্রান্ত মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে পাওয়া যায় মূল মূল্যস্ফীতি বা কোর ইনফ্ল্যাশন। খাদ্যদ্রব্য এবং জ্বালানি সংক্রান্ত মূল্যস্ফীতি বাদ দেয়ার কারণ হল এই দু’ধরণের মূল্যস্ফীতি খুব বেশি ভলেটাইল বা অস্থির অর্থাৎ খুব বেশি ওঠানামা করে।

৩৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানোর পর ‘লিকিউডিটি এডজাস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটি’র আওতায় রেপো রেট এখন দাঁড়িয়েছে ৬.২৫ শতাংশ।

উল্লেখ্য, রেপো রেট হল সেই সুদের হার যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে অর্থরাশি ধার নেয়।

রেপো রেট বাড়া মানে ব্যাঙ্কগুলি ঋণের উপর সুদ বাড়াবে যার ফলে হোম লোন বা ব্যবসার লোন, সব ধরনের লোনেই সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা।

তবে গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে ঋণের উপর সুদের হার বাড়লেও সব ব্যাঙ্কেই ঋণ প্রদানের পরিমাণ বাড়ছে এবং গ্ৰাহকরা বেশি বেশি করে হোম লোনের মত পার্সোনেল লোন‌ নিচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ঋণ।

পরিশেষে মনিটারি পলিসি কমিটির মিটিং শেষে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্ণর শক্তিকান্ত দাশ কি বলেছেন একটু শুনে নেই। তিনি বলেছেন,

” বিশ্ব অর্থনীতি এবং আমাদের দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গত তিন বছর ছিল অস্বাভাবিক ধরণের চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ কারণ আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল পরপর অনেকগুলো আঘাতের।

কোভিডের আগে কয়েকবছর অর্থনীতিতে ধাক্কা সামলানোর জন্য আমরা যে সব ব্যবস্থা গ্ৰহণ করেছিলাম যেমন বিভিন্ন ধরণের রিজার্ভ বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি টার্গেটের কাছাকাছি রাখা ইত্যাদি, সেই সব কারণে এবং দুর্যোগপূর্ণ দিনে আমাদের সতত চেষ্টা ছিল সময়মত কার্যকারী পদক্ষেপ গ্ৰহণ করা, যার সুফল এখন আমাদের সন্তুষ্টি প্রদান করছে।

বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের দেশের দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনার উন্নতি সাধনে যে আমাদেরকে নিরলস ভাবে কাজ করে যেতে হবে সেটা ভুললে চলবে না।

সবুজায়ন বা সবুজ উৎপাদন, জোগান শৃঙ্খল এবং মালপত্রের বন্টনে পুনর্বিন্যাস, উৎপাদনের জন্য উৎসাহ বা প্রণোদনা জ্ঞাপন, ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং এবং উন্নত আর্থিক পরিষেবা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে আগামী দিনে বিশাল সুযোগ নিয়ে আসবে।

নতুন বছর ২০২৩ আগত। আমরা নতুন বছরে পদার্পণ করব ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও সুযোগ নিয়ে, জি২০ দেশগুলোর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব আমাদের দেশ ভারতবর্ষকে অর্পণ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমরা আরও উন্নত অবদান রাখতে পারব।

“বসুধৈব কুটুম্বক” হল আমাদের জি২০ দেশগুলোর সভাপতিত্বের মূল ভাবনা যা তে কিনা স্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত হয় আমাদের বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং সর্বজনীন মঙ্গল সাধনের দর্শন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *