সরকার বনাম দল,

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী,

   যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একাধিক রাজনৈতিক দলের অবস্থান এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অথবা বিভিন্ন দল মিলে 'কোয়ালিশন' সরকার গঠন। রাজনৈতিক দল তাদের সমর্থক অথবা সমগোত্রীয় মানুষের হলেও সরকার সমস্ত নাগরিকদের। রাজনৈতিক দল ও সরকার ভিন্ন ধারণা হলেও, আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য, বাস্তবে এ'দুটি সমার্থক হয়ে উঠেছে। বাংলায়  এর প্রভাব খুবই বেশি।
         দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মব  লিঞ্চিং এর ঘটনা ঘটলেও রাজনৈতিক সংঘর্ষ কার্যত শূন্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো। এখানে মব লিঞ্চিং এর ঘটনা না ঘটলেও কার্যত সারাবছর ধরেই রাজনৈতিক সংঘর্ষ ঘটেই থাকে। পারিবারিক পরিচয়ের পরিবর্তে এখানকার বাসিন্দাদের রাজনৈতিক পরিচয়টা মুখ্য হয়ে ওঠে।  তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস বা সিপিএম হিসাবেই সে পরিচিতি লাভ করে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই শাসক বা বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত। যেহেতু ও বিরোধীদলের সঙ্গে যুক্ত সুতরাং  ওকে কোনো সরকারি সাহায্য দেওয়া যাবেনা- এটাই এই রাজ্যের অলিখিত নিয়ম হয়ে উঠেছে। বামফ্রন্টের আমল থেকেই এই ট্রাডিশন পশ্চিমবঙ্গে সমানে চলে আসছে।
     বাম আমলে দেখা গেছে বাম বিরোধীরা জব কার্ড পেতে হিমশিম খেয়েছে। জব কার্ড ইস্যু হয়ে গেছে অথচ সেগুলো প্রাপকের হাতে না দিয়ে পঞ্চায়েত অফিসে অথবা দলীয় অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। র‍্যাশন কার্ড সহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থকদের যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বামবিরোধীরা ততটাই অবহেলিত থেকে গেছে। স্হানীয় নেতাদের নির্দেশ বা অনুমতি না থাকলে বিরোধীরা স্হায়ী বাসিন্দার অথবা পারিবারিক আয় সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট পেতনা। এমনকি থানা পর্যন্ত অভিযোগ নিতনা। এই ধরনের অসংখ্য অভিযোগে ভরপুর ছিল বাম আমল।
         যেহেতু নেত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জ্জী তাই ভাবা হয়েছিল তৃণমূল আমলে পরিস্থিতির 'র‍্যাডিক‍্যাল' না হলেও ব্যাপক পরিবর্তন হবে। অস্বীকার করার উপায় নাই বেশ কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় অন্যদল বিশেষ করে সিপিএম থেকে আগত ধান্দাবাজরা দলীয় পদ পেয়েছে সেখানে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। যেকোনো সরকারি সাহায্য পেতে হলে, শুধু বিরোধীদলের সমর্থকদের নয় সাধারণ জনগণকেও, তাদের তোয়াজ করতে হবে। তবেই সরকারি সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য কোনো কোনো জায়গায় কট্টর তৃণমূলের নীচু তলার কর্মীরা একই আচরণ করে। দেখে মনে হবে তারাই যেন এক একটা ক্ষুদে মুখ্যমন্ত্রী।
        কিছু কিছু জায়গা থেকে একটা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বিজেপির সমর্থকদের নাকি করোনা ভ্যাকসিনের টোকেন দেওয়া হচ্ছেনা। বিশেষ করে বিধানসভা ভোটে যেসব জায়গায় তৃণমূল পেছিয়ে আছে। কেন পেছিয়ে আছে সেসব নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ নাই। তাদের এই আচরণ ভবিষ্যতে সেইসব এলাকায় তৃণমূলকে আরও পেছিয়ে দেবে সেই ভাবনাও এদের নাই। তাছাড়া ভ্যাকসিনের খরচ দিচ্ছে সরকার কোনো ব্যক্তি নয়। সুতরাং ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে, যেখানে রাজ্য সরকার কোভিড পুরোপুরি দূর করার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে, এই ধরনের মনোভাব পোষণ করা ঠিক নয়। জানা যাচ্ছে রাজ্যের একটি মানবাধিকার সংগঠন ইতিমধ্যেই নাকি এই বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। হয়তো নীচু তলার এক শ্রেণীর তৃণমূল কর্মীর জন্য রাজ্য সরকারের মুখ পুড়তে চলেছে।  
        স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্যই পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের অস্তিত্ব আজ চরম সংকটের মুখে। এই আচরণ তৃণমূলকেও অদূর ভবিষ্যতে বিপদে ফেলতে পারে। সুতরাং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বুঝতে হবে দল এবং সরকার সমার্থক নয়। সরকারের কাজে দলীয় হস্তক্ষেপ পুরোপুরি অনভিপ্রেত। জনপ্রতিনিধিরা প্রতিটি মানুষের। দলীয় সমর্থকরা বাড়তি সুবিধা পেলেও অন্য দলের সমর্থকরা যাতে বঞ্চিত না হয় সেবিষয়ে সচেতন হতেই হবে। নাহলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে কখনোই সেটা কাম্য নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *