রাজনীতি

প্রয়াত ছোড়দার সাথে নিবিড় যোগাযোগ ছিল শান্তিনিকেতনের

খায়রুল আনাম (সম্পাদক – আয়না টেলি নিউজ)


তাঁর এই চলে যাওয়া অকস্মিক, আবার হয়তো তা নয়ও। আটাত্তর বছর বয়সে চলে গেলেন বঙ্গ রাজনীতির এক বর্ণনয় চরিত্র-সোমেন মিত্র।  ইতিপূর্বেই চলে গিয়েছেন তাঁর এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, নুরুল ইসলাম, কুমুদরঞ্জন সেনগুপ্ত, জীবন মুখোপাধ্যায় ও আরও অনেকেই। তাঁর একান্ত শুভার্থী এ. বি. এ. বরকত গণিখান চৌধুরীও চলে গিয়েছেন অনেক আগেই।  সেই সূত্রেই বলা যায়, এক সময় বঙ্গ রাজনীতি যাঁঁদের নিয়ে আলোড়িত হতো, তাঁদের মধ্যে অবশ্যই রয়ে গেলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।  বুধবার  ২৯ জুলাই গভীর রাতে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বঙ্গ রাজনীতির এই ‘ঠাণ্ডা মাথার’ মানুষটি। ২১ জুলাই শরীরে ক্রিয়েটিনিন-এর মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তিনি ওই বেসরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৭২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিয়ালদার বিধায়ক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বিরোধের জেরেই  এক সময় যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন।  দেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  ইন্দিরা গান্ধির   জরুরী অবস্থা জারি এবং তা প্রত্যাহারের পরবর্তী সময়ে দেশে যে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাতে, লোকসভা ভোটে ইন্দিরা গান্ধির পরাজয়ের সাথে সাথে কেন্দ্রে ক্ষমতা হারায় কংগ্রেস। কংগ্রেস ভেঙ্গে নানা উপদলেরও জন্ম হয় ওই সময়।  ইন্দিরা গান্ধি কিছুদিন  ক্ষমতার বাইরে থাকলেও, পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন। আবার তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পরে  পুত্র রাজীব গান্ধি প্রধানমন্ত্রী হলেও, দলের অভ্যন্তরীন গোলযোগের কারণে প্রণব মুখোপাধ্যায় যেমন কংগ্রেস ছাড়েন তেমনি, সোমেন মিত্রও  প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস গঠন করেন ২০০৭-০৮ সালে। তবে, তার স্থায়ীত্ব খুব একটা ছিলো না।  প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিও এক সময় ইন্দিরা কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন–যদি কখনও শোনেন, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি মাতাল হয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, কুকুরের গালে চুমু খাচ্ছে, বিশ্বাস করবেন। কিন্তু প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি  ইন্দিরা কংগ্রেসে ফিরে গিয়েছে, এটা বিশ্বাস করবেন না। যদিও পরবর্তীতে তৎকালীন মুম্বাইয়ে কংগ্রেস অধিবেশনে সেই প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে ইন্দিরা গান্ধির হাত ধরে কংগ্রেসের মঞ্চে   উঠতে দেখেছি। অধিবেশন শেষে রাতের দিকে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে সে কথা জিজ্ঞাসা করতেই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছিলেন–কংগ্রেসের সদর দরজার চেয়ে খিড়কি দরজার সাইজটা অনেক বড়।   কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে ছিলাম মাথা নীচু করে, আজ ঢুকলাম মাথা উঁচু করে। পরবর্তীতে আমৃত্যু প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি থেকে গিয়েছিলেন কংগ্রেসে। যদিও শেষের সময়টায় তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন না।   আর সোমেন মিত্রও এক সময় রাজ্যে বাম শাসনের অবসান ঘটাতে কংগ্রেস ছেড়ে  তৃণমূল কংগ্রেসে গেলেও, পুনরায় কংগ্রেসেই ফিরে এসেছিলেন। এবং আমৃত্যু তিনি কংগ্রেসেই ছিলেন।  ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে।         যতদূর মনে পড়ে, সোমেন মিত্র শিয়ালদা এলাকায় ৪৫, আর্মহার্স্ট স্ট্রিটে থাকতেন।  আমি থাকতাম ২৫, আর্মহার্স্ট স্ট্রিটে আর এই এলাকায় একটি দৈনিক সংবাদপত্রের দফতর রয়েছে ২৫, আর্মহার্স্ট স্ট্রিটে। যা এখন হ্যারিসন রোড হিসেবে নামাঙ্কিত হলেও,  এটি এখনও আর্মহার্স্ট স্ট্রিট নামেই অধিক পরিচিত।  এই দৈনিক সংবাদপত্রের দফতরে যাওয়া-আসার সূত্রেই  সোমেন মিত্রের সঙ্গে পরিচয় এবং একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এবং ক্রমে তা যথেষ্ট গভীরতাও পেয়েছিল। আমরা কয়েকজন মিলে এই এলাকার ‘পূরবী’  সিনেমা হলে প্রায়ই যেতাম ছবি দেখতে। সোমেন মিত্র সেটা জানতে পেরে, আমাদের যাতে সিনেমার টিকিট পেতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য নিজেই কাউকে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে এনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিতেন। কয়েক বার তাঁর সাথে গিয়ে বসেছি শ্রদ্ধানন্দ পার্কে ও কফি হাউসে। কোনও রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও, যখনই বীরভূমে বা বোলপুরে এসেছেন, দেখা হয়েছে তাঁর সাথে। একবার তিনি কংগ্রেস সেবা দলের একটি কর্মসূচিতে বোলপুরে এলে, সেই সংগঠনের একজনের আব্দারে তাঁকে শ্রীনিকেতনে একটি পেট্রল পাম্পের উদ্ধোধনও করতে হয়। সে দিন সোমেন মিত্র  হাসতে হাসতে বলেছিলেন, জানো, জীবনে অনেক কিছুই  উদ্বোধন করেছি, অনেক অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কিন্তু পেট্রল পাম্প উদ্বোধনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম হলো। সেটাই শারীরিকভাবে তাঁর সাথে শেষ দেখা।  একদিন আর্মহার্স্ট স্ট্রিট  ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন সোমেন মিত্র। আর আজ সব্বাইকে ছেড়েই চলে গেলেন  তাঁর অনুগামী ও শুভার্থীদের প্রিয়–ছোড়দা ।। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *