সাহিত্য বার্তা

উড়ান পর্ব (২)

উড়ান (পর্ব- ২),
দেবস্মিতা রায় দাস,

এফ এম অফিস থেকে বেরিয়ে পালক প্রথমেই তার দুই সবথেকে কাছের মানুষকে ফোন করল। একজন তার মা, অন্যজন তার বেস্ট ফ্রেন্ড, তাদের কলেজেই পড়তো জিৎ। দুজনেই খুব খুশি হল.. জিৎ তো খুব শিগগিরি দেখা করে ট্রিট দিতে বলল। পালক ও খুব খুশি।

আপাতত এক মাস ট্রেনি হিসেবে কাজ শিখতে হবে, তাই স্যালারি একটু কম। পরে সেটা আরো বাড়বে। রাতের দিকে হলে তার গানের কল শো গুলো করতে পারবে। আপাতত টাইম দিয়েছে সকাল এগারোটা থেকে সাতটা, পরে যে কোনো রকম টাইমে আসতে হতে পারে,, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছে তুহিনা ভালোমতোই।

পালকের এখন যা অবস্থা.. তাতে যে কোনো শর্তই তার কাছে গ্রহনযোগ্য। সামনের রবিবার একটা কল শো আছে তার, মধ্যমগ্রামের একটা ক্লাবে। গত দু বছর ধরে ভালই করছে সে এই শোগুলো.. কলেজের ফেস্টেও গাইতো।

বাড়ি ফেরার পথে ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন নিয়ে ফিরল। তারপর মায়ের সাথে অনেক্ষণ ধরে গল্প করে নিজের ঘরে গিয়ে রবিবারের গানগুলোর একটা লিস্ট বানিয়ে.. নতুন অফিস, রোহিত স্যার, করণ রস্তোগী, কাল থেকে এক নতুন অধ্যায় শুরু.. এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখের পলক জুড়ে এল, তা বুঝি নিজেও টের পেলোনা!

পরের দিন সকালে উঠে থেকেই সাজো সাজো রব পড়ে গেল। একে তো প্রথম দিন, তায় এবারে আর আগের মতোন ওইভাবে যেতে চায় না পালক। তুঁতে রঙের একটা বেশ সুন্দর কুর্তি, ম্যাচিং ইয়াররিং, ঠোঁটে হাল্কা লিপগ্লস আর চোখে একটু কাজলের ছোঁয়া দিতেই পুরো পাল্টে গেল তার অবয়ব। মা বেশ খুশি খুশি মনেই টিফিন গুছিয়ে দিয়ে বাইরে অব্ধি এলেন সি অফ করতে। অনেকটা যেন দুশ্চিন্তামুক্ত দুজনেই। কিন্তু সামনের দিন বোধহয় অতোটাও সোজা ছিল না পালকের জন্য।
প্রথম দিন দেরী করতে চায় না, তাই অনেকটা সময় হাতে রেখেই নিজের স্কুটিতে রওনা হয়ে পড়ল পালক। জিৎ পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পালক রবিবার শোতে একসাথে যাবে বলে তাকে কাটিয়ে দিল।

আজকে আর সেই অফিস আগেরদিনের মতোন গিলে খাচ্ছে না তাকে। ঢুকেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটাকে একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে গুডমর্নিং বলাতে সেও আজ হাসিমুখেই তা ফেরত দিল। তুহিনার সাথে দেখা হতেই তার সপ্রশংস দৃষ্টি পালকের নজর এড়ালো না। একে তো সময়ের অনেক আগে পৌঁছে যাওয়া, আর তার আজকের প্রেসেন্স। তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে একটা রুমে বসিয়ে দিল। সেখানে আরো জনা চারেক ছেলেমেয়ে ছিল। তখনো সবাই পৌঁছাতে পারেনি। প্রত্যেকে এক একটা সিস্টেমে কানে হেডফোন দিয়ে বসে। তাকেও তুহিনা একটা সিস্টেমে বসিয়ে দিয়ে গেল। সকলকে কিছু অডিও ক্লিপ দেওয়া হয়েছে শোনার জন্য। এখন কিছুক্ষণ এরমই চলবে। একটায় লাঞ্চ, লাঞ্চের পর করণ রস্তোগী তাদের ক্লাস নিতে আসবে। নামটা শুনেই পালকের হার্টবিট বেড়ে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকি সকলেও এসে গেল। প্রথম দিন, পালক তাকিয়ে দেখে নিল তাকে নিয়ে জনা দশেক ছেলেমেয়ে আছে। এরা প্রত্যেকেই নতুন। আগের দিনের ভয়টা আজ অনেকটা যেন কেটে গেছে তার। সেও বেশ মন দিয়ে অডিও ক্লিপটা শুনতে লাগলো। তার পাশে বসা মেয়েটা একবার তার দিকে তাকিয়ে হাসলো। বেশ মিষ্টি দেখতে। অডিওটায় বেশ কিছু লাইন বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে একি কন্ঠে। সেটাই তাদের শুনতে দেওয়া হয়েছে। পালক রেডিও ভালোই শোনে। সেও দেখেছে বলার ধরণেই কতোকিছু পাল্টে যায়। শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। সবাই যে যার সিস্টেমে হেডফোনেই ব্যস্ত। কখন যে একটা বেজে গেল যেন টেরই পাওয়া গেল না।

লাঞ্চে পালক টিফিন এনেছিল, কিন্তু ক্যান্টিনে গিয়ে দেখলো অজস্র খাবারের ব্যবস্থা সেখানে। আলু পরোটা, ছোলা বটোরা থেকে শুরু করে পাস্তা ম্যাগি চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস কিছুরই কোনো কমতি নেই। একপাশে লস্যি, ফলের জুসও আছে দেখলো। রকমারি খাবারদাবার। তখনই ঠিক করে নিল মাঝে মাঝেই টিফিন আনবে না, এখানেই খাবে। বেশ দারুণ জায়গা.. পালকের সবকিছুই দারুণ লাগছে। একবারও যদি বুঝতে পারতো যে বাইরে থেকে যা চকচক করে.. তার সবকিছুই ভাল হয় না। মা অবশ্য আজ টিফিনে চাউমিন দিয়েছিল, আর মার হাতের যে কোনো খাবারেই পালক যেন অন্যরকম স্বাদ পায়।

তার টেবিলেই এসে বসল মেয়েটি। আলাপ হল। নাম সুরভি, শ্যামবাজারে থাকে। বাবা উকিল, একমাত্র সন্তান। বাড়ি খুবই রক্ষণশীল। তার অনেকদিনের শখ আর জে হওয়ার, তাই অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে এখানে আসা। সিলেকশনের পরেও কিন্তু কিন্তু ছিল। পালক জানল সুরভি খুব সুন্দর আবৃত্তি করে, অবশ্য তার গলাটাও খুব মিষ্টি। পালকের গলার আওয়াজ আবার অন্যরকম.. একটু ভারী কিন্তু খুবই আকর্ষণীয়।

লাঞ্চের পর ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথেই করণ রস্তোগীকে দেখতে পেল। একে স্যার বলতে একদম ইচ্ছা হয় না পালকের, বরং বেশ বন্ধু বন্ধু লাগে। করণ কিন্তু সবার সাথে আলাপ সারতে সারতেই পরিষ্কার সবাইকে বলে দিল.. কাউকে স্যার না বলতে, সবাইকে নাম ধরে ডাকতে। পালক নিশ্চিন্ত হল। এক ঘন্টা ক্লাস নেবে করণ। ইংলিশেই বলছিল। পালক লক্ষ্য করল করণের উচ্চারণ খুব স্পষ্ট, বলার ধরণও খুবই ইউনিক। এখানে বোধহয় সবাই এইরকম। দেখল সবাই তাকে বেশ পছন্দই করছে। পালকের তো ওই দিকে তাকিয়েই পুরো সময় কেটে গেল।

এরপরে আবার কিছুক্ষণ গ্যাপের পর তাদের ওই অডিও ক্লিপ শুনতে হবে বেশ কিছুক্ষণ। এর মাঝখানে রোহিত রায় একবার কনগ্র‍্যাচুলেট করতে এল সকলকে। একটা ব্যাপার দেখে পালক অবাক হয়ে গেল বেশীরভাগ সময়ই যেন তার দিকে তাকিয়েই কথা বলল স্যার। একদম চলে যাওয়ার আগে বেশ সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল..

“ভেরি হ্যাপি দেট ইউ আর আ পার্ট অফ আস নাউ.. বাই দি ওয়ে ইউ হ্যাভ আ ভেরি নাইস ভয়েস এন্ড ইউ লুক ভেরি কিউট টুডে!”

“থ্যাংক ইউ স্যার”

একটু মাথা নেড়ে রোহিত বেরিয়ে গেল। পালকের গালে একটু গোলাভী আভা এসেও আবার সাথে সাথেই তা মিলিয়ে গেল। প্রথম দিন বলে একটু তাড়াতাড়ি সবাই ছাড়া পেয়ে গেল।।

ক্রমশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *