সাহিত্য বার্তা

উড়ান( পর্ব ১)

উড়ান (পর্ব-১),
দেবস্মিতা রায় দাস,

 বিশাল ঝাঁ চকচকে লবির খুব সুন্দর সাজানো সোফায় বসে ওয়েট করতে করতে একটু অস্থির ভাবে চারপাশটায় আর একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল পালক। রিসেপশনের মেয়েটা অনেক্ষণ থেকেই বেশ অবাক দৃষ্টি দিচ্ছে তার দিকে। যদিও খুব একটা ভাল করে ড্রেস আপ করার সময় সে পায়নি, তবুও এমনভাবে তাকিয়ে থাকার কি আছে কে জানে! অভ্যাসবশত গীটারটাকেও পিঠে করে নিয়ে চলে এসেছে। 

একটু অস্থিরভাবেই মুখের ওপর এসে পড়া চুলটাকে আলগোছে কানের পাশে সরিয়ে রাখলো পালক। আজকের এই ইন্টারভিউটা তার জন্য খুব খুব জরুরি। অফ শোল্ডার টপের নিচে স্প্যাগাটি আর একটা জিন্স পড়েই চলে এসেছে সে। যদিও এটা কোনো কর্পোরেট অফিসের ইন্টারভিউ নয়, একটি নামকরা রেডিও চ্যানেলের আর জের ইন্টারভিউ!

পালক আর একবার চারপাশে তাকিয়ে নিল। বাকি সকলে সত্যি অনেক গ্রুমড ওয়েতেই এসেছে এখানে।এমনিতেও তার বিশেষ একটা আসেনা ওইসব… আর রাতে ওই পার্টির পর একেবারেই সময় পায় নি। গলার আওয়াজ তার বেশ ভাল, অন্যরকম, তা সে গানই হোক বা কিছু পাঠই হোক.. তাই পার্টি হলেও সুযোগটা ছাড়েনি। প্রায় দুটোর সময় পৌঁছায় বাড়িতে। তাতে অবশ্য বিশেষ একটা অসুবিধা হয় না। বাড়িতে অসুস্থ মা ছাড়া আর কেউ নেই। তাই গ্যাজুয়েশনের পর পরই একটা চাকরির তার খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে!

লবিতে আপাতত সে আর রিসেপশনিস্ট মেয়েটা ছাড়া আর দু জন। একজনকে তো দেখে পালকের মনে হল একে দেখলেই এখুনি সিলেক্ট হয়ে যাবে। তবে আর তার কোনো আশা নেই, মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায় পালকের। হঠাৎ তার নাম শুনে চমকে তাকায় সামনের দিকে। একটা মভ কালারের শার্ট আর জিন্স পড়া মহিলা এসে তাকে ডেকে ভিতরে নিয়ে গেল। পালকের বুক ঢিপ ঢিপ করছে।

ভিতরে একটা টেবলের ওপাশে দুটো লোক আর একজন মহিলা বসে। নিজেদের মধ্যে কথা বলাতেই তারা ব্যস্ত। একবার মাত্র পালকের দিকে তাকিয়েই আবার নিজেদের কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল তারা। পালক একটু ইতস্তত ভাবে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা নীচে রেখে বসল। মভ শার্ট পরা মেয়েটি তাকে ঘরে ঢুকিয়েই বিদায় নিয়েছিল।

পালকের ঠিক সামনে বসা চুলবিহীন আর ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি লোকটা একবার আলগোছে তাকিয়ে নিল তার গীটারের ব্যাগটার দিকে। বেশী বয়স না, বছর চল্লিশ হবে, তাও পালকের থেকে প্রায় পনেরো বছরের বড়ো। তার পাশের ছেলেটির বয়স অনেকটাই কম.. দারুণ ভালো চেহারা, বেশ সুন্দর দেখতে। একটা ব্ল্যাক শার্টে তাকে দারুণ এট্রাকটিভ লাগছিল। নার্ভাসনেসের মধ্যেও সেটা পালকের নজর এড়ায় না। পাশের মহিলা একটু বয়স্ক.. কিন্তু তার দারুণ আপডেশনে সঠিক বয়স বোঝা মুশকিল।

নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতেই হঠাৎ ফ্রেঞ্চ কাট লোকটি হাত বাড়ালো পালকের দিকে….

“হাই আমি রোহিত, রোহিত রায়। আমাদের এই ‘ফ্রেন্ডস হাইফাইভ’ চ্যানেলের ম্যানেজমেন্ট হেড। আমার পাশে করণ রাস্তোগী.. টেকনিকাল টিটবিটস গুলো দেখে আর ম্যাডাম রীনা এইচ আর ডিপার্টমেন্ট হেড। এন্ড ইউ আর….”

বলে পালকের সি ভি র দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে বলল..

“পালক?? পালক মুখার্জি, বাঃ বেশ আনকমন নাম!! সো ইউ সী পালক, এখানে অনেক ক্যান্ডিডেটস এসেছে.. গত দুদিন ধরে অনেক ইন্টারভিউ আমরা নিলাম.. সো উই আর কাইন্ডা বোরড ইউ নো! সো এমন কিছু বলো বা করো যাতে আমাদের অন্যরকম লাগে…. এন্ড উই আর কনভিসড টু টেক ইউ, রাইট!!”

এতো স্মার্ট এটাকিং এপ্রোচে পালকের তো অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। সে কি বলবে ভেবেই পেল না। হঠাৎ রীনা ম্যাডাম বলে উঠলেন..

“হোয়াই আর ইউ ফ্রাইটেনিং হার, রোহিত? ওকে কিছু একটা অন্তত ক্লু দাও!”

রোহিত হেসে ফেলল..

“”ওকে ওকে, এস ইউ সে ম্যাডাম। ওকে পালক তুমি এক কাজ করো.. “নমস্কার বন্ধুরা.. ‘ফ্রেন্ডস হাইফাইভ’ এফ এম এর তরফ থেকে আমি পালক বলছি” এই কথাটাই নাহয় একটু ইউনিক ভাবে শোনাও তো আমাদের!! এইটুকু তো নিশ্চয়ই পারবে! এন্ড ইফ ইউ পাস অন দিস, কাল থেকেই জয়েন করো।””

প্রথক কিছুক্ষণ পালক একটু চোখ বুজে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে বুঝি বলতে পারবে না। তারপর তার সবসময় বন্ধুদের বলা কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। তার বাচনভঙ্গি, গলার ভয়েস, সবকিছু একদম অন্যরকম তারা বলে সবসময়! হঠাৎ চোখ খুলেই এক অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে নিজের মনের মতোন করে সাজিয়ে বলে ফেলল কথাগুলো।

তার বলা শেষ হওয়ার পর সবাই একে অপরের দিকে একটু তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপরই প্রথম কথা বলল করণ..

“ইউ আর সিলেক্টেড, জয়েন ফ্রম টুমরো। তুহিনা ইউল আপডেট ইউ উইথ দি প্যাকেজ ডিটেইলস।”

পালক বুঝল ওই মভ শার্টই তুহিনা। এই চাকরিটার তার অত্যন্ত বেশী করেই দরকার ছিল। দশটা পাঁচটার গতেবাঁধা কাজ যে তার জন্য নয়, তা সে অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল। মনের মতোন কাজও হবে সাথে টাকারও খুবই দরকার ছিল। তবেই সে তার স্বপ্নপূরণের দিকে হাঁটার সাহস পাবে। আনন্দের বাহুল্যে সে দেখতে পেল না ওই ঘরেই বসা একজোড়া চোখ কিন্তু তাকে গিলে খাচ্ছে!!

ক্রমশ….

 164 12,89,834

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *