সাহিত্য বার্তা

সাবাশ করোনা যোদ্ধা – শরদিন্দু ঘোষ

সাবাশ করোনা যোদ্ধা,
শরদিন্দু ঘোষ,

ঘরের আরাম কেদারায় বিলাসিতায় শরীর এলিয়ে
চোখ রেখেছিলে টিভির পর্দায়
আলগোছে টেনে নিয়েছ খবরের কাগজ
মাসের পর মাস।

তোমরা কেউ শিক্ষক, নেতা মন্ত্রী, কিংবা ডাক্তার

অভয় দিয়ে বলেছিলাম, ঘরে থাকো, সুস্হ থাকো।
আমরা আছি রাস্তায়।

চিনিয়েছিলাম, কনন্টেইনমেন্ট জোন

বুঝেছিলে এ বাঁশ-দড়ি বাঁধার আয়োজন বিয়েবাড়ির নয়
এ সব মহামারির লক্ষ্মন রেখা
কোথায় আছে কত ভেল্টিলেটর বেড
লিখে রেখেছিলে সেসব জরুরি তথ্য।

বিলাস বহুল ডাইনিং রুমে ইয়া বড় টিভির পর্দায়
চিকেন তন্দুরে কামড় দিতে দিতে উপভোগ করেছিলে মৃত্যু পথযাত্রী স্বামীর দেহটা অ্যাম্বুলেন্স তোলার জন্য এক অসহায় নারীর আপ্রাণ চেষ্টা

ওঠো না ওঠো – সেই কাতর আর্তি তোমাদের মার্বেলে মোড়া ড্রইং রুমের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছিলাম আমরাই।
জানি না তাতে রসভঙ্গ হয়েছিল কিনা

জনমাননবহীন নিস্তব্ধ দুপুরে কুকুরের সঙ্গে ভাগ করে খেয়েছি বিস্কুট

তপ্ত পিচের রাস্তায় মাইলের পর মাইল হেঁটেছি পরিযায়ী শ্রমিকের সাথে

মনে পড়ে সেই চলন্ত ট্রলি ব্যাগে ওপর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটির কথা?
যন্ত্রের মতো সেই ব্যাগ টেনে চলেছেন এক পৌঢ়া।
মনে পড়ে?

কিংবা রেল লাইনের ওপর পড়ে থাকা সেই রক্তমাখা রুটিগুলোর কথা!
আবছা আবছা মনে পড়ছে কি!

সে সব ছবি আমাদেরই তোলা

খুঁটে খুঁটে সংবাদ তুলে ধরা আমাদের নেশা।
আমাদের দিন নেই, রাত নেই, ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ নেই
লকডাউনের সন্ধ্যায় গভীর রাতের নীরবতা দেখেছি রাজপথে
বুভুক্ষু মানুষের লাইন দেখেছি লঙ্গরখানায়
দেখেছি হকের রেশন কার্ডের জন্য শিশু কোলে মাকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে

তোমরা তখন নামি ব্রান্ডের স্যানিটাইজারে হাত ঘষে দামি মাস্কে মুখ ঢেকে দেশনেতাদের কথায়
থালা বাজিয়েছো, শাঁখ বাজিয়েছো

সম্মান দেখিয়েছ অনেক।
প্রয়োজনে চতুর্থ স্তম্ভের সঙ্গে তুলনা করেছ গলার শিরা ফুলিয়ে।
কুর্নিশ তোমাদের।
শুধু ভ্যাকসিন দেওয়ার তালিকা তৈরির সময় ব্রাত্য আমরা

আজ তোমাদের কত হুড়োহুড়ি!
অবাক চোখ দেখছে সবই
সেই তোমরা নাকি ডাক্তার, জননেতা!
কত বড়াই তোমাদের!
স্বার্থপরের মতো শুধু প্রাণভয়ে লুকিয়েছিলে স্ত্রীর আঁচলের আড়ালে।

সেই তোমাদেরই
দামি শো কেসে সাজানো করোনা যোদ্ধার স্মারক! বিবেকের দংশনে ক্ষতবিক্ষত তোমরা
খুব হাসি পাচ্ছে
হাসি পাচ্ছে তাড়াহুড়োয় তোমাদের মুখোশটা খুলে পড়তে দেখে।

ওহে কুলাঙ্গার দেশদ্রোহীর দল
প্রতিষেধক দাও ওই দিন মজুরকে, পথের মানুষদের
বুকে টেনে নাও তোমার মুখে গরম ভাতের যোগান দেওয়া কৃষকদের

আমাদের কথা ছাড়ো
বারুদের গন্ধ নাকে টেনে বোমার ওপর দিয়ে এগিয়ে যাই বীরদর্পে
বুকের এক্কেবারে পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায় গরম সীসা।
দিনের পর দিন জলে ভিজে রোদে শুকিয়ে এক একটা তপ্ত শলাকার টুকরো আমরা
ভাইরাস ঢুকেছে বেরিয়েছে
জং ধরাতে পারেনি ইস্পাতে
যতদিন কলমে আছে মশি
অশির শানে ফালাফালা যে হতেই হবে তোমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *