ক্রীড়া সংস্কৃতি

রীতি অনুযায়ী মকরস্নান জয়দেব কেন্দুলির মেলায়

খায়রুল আনাম (সম্পাদক সাপ্তাহিক বীরভূমের কথা)


করোনা  আবহের কারণে  অন্যান্য জায়গার সাথে সাথে বীরভূম জেলার ঐতিহ্যবাহী  শান্তিনিকেতনের  পৌষমেলা, পাথরচাপুড়ির দাতা বাবার  মেলা, বক্রেশ্বরের  মেলা, কঙ্কালীতলার মেলা-সহ অসংখ্য ছোট-বড় মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। এরফলে জেলার অর্থনীতিতে তার একটা চাপও পড়েছে। বহু ব্যবসায়ী, শ্রমিক তাঁদের রোজগারও  হারিয়েছেন।  এই পরিস্থিতির মধ্যেই করোনার প্রভাব কমার কথা সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক কিছুই একটু একটু করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে বলে দাবী করা হচ্ছে। আবার অপরদিকে বলা হচ্ছে যে, করোনার বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নিলে তার ফল মারাত্মক হতে পারে।     এই পরিস্থিতে জেলা বীরভূমের ইলামবাজার থানা এলাকার অজয় নদ তীরবর্তী  ঐতিহ্যবাহী জয়দেব-কেন্দুলির মকর সংক্রান্তির মেলা হবে কী না, তা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পৌষ সংক্রান্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলা চারদিন হলেও, মেলা চলে প্রায় মাসাধিককাল ধরে।  মকর সংক্রান্তিতে এখানকার অজয় নদে স্নান করলে, গঙ্গা স্নানের পুণ্য মেলে বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। এজন্য মকর সংক্রান্তিতে এখানে চার থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষ অজয়ে পুণ্যস্নান সারেন। এই উপলক্ষেই এখানে বসে মেলা।  যে মেলা বাউল মেলা নামেই খ্যাত। আর এখানে যে সব স্থায়ী আখড়া রয়েছে, সেইসব ছাড়াও  আসে কয়েকশো অস্থায়ী আখড়া।  এই মেলায় বাউল গানের সাথে বর্তমানে জায়গা করে নিয়েছে কীর্তন গানও।  প্রতি বছর ৭ পৌষের মধ্যে প্রশাসনিক আধিকারিকরা  জয়দেব মেলা আশ্রম কমিটির সাথে আলাচনায় বসে মেলার রূপরেখা তৈরী করে থাকেন। কিন্তু এবার তা না হওয়ায় জয়দেব মেলা আশ্রম কমিটি জয়দেবের অজয় নদের চরে  সভা ডেকে ঘটনার প্রতিবাদ করেন এবং জানান যে,  রাজনৈতিক দলের এবং সরকারী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চলছে। মিটিং, মিছিল, জনসভা যদি হতে পারে তাহলে জয়দেব-কেন্দুলির মেলাই বা হবে না কেন ?   এমন কী এমনও বলা হয় যে, প্রয়োজনে প্রশাসনের তোয়াক্কা না করেই ভক্তরা মেলার আয়োজন করবেন। এরপরই স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ, জেলা পুলিশসুপার শ্যাম সিং জয়দেব-কেন্দুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের সভাকক্ষে জয়দেব  মেলাআশ্রমিক কমিটি ও অন্যান্যদের সাথে আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানিয়ে দেন যে,  বর্তমান পরিস্থিতিতে এবার সরকারীভাবে  জয়দেব-কেন্দুলির মেলা  হবে না।  মকর সংক্রান্তিতে ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি, ২৯ পৌষ ও ১ মাঘ এখানে কেবলমাত্র  স্বনির্ভর গোষ্ঠীর স্টল থাকবে।  পুণ্যস্নান করতে আসা   ভক্তরা তাদের কাছ থেকেই  প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারবেন।  স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের এ জন্য স্থানীয় ব্লক প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।  এখানকার  স্থায়ী ৫২টি এবং অস্থায়ী ১০০টি আখড়াকে বসার অনুমতি দেওয়া হবে। সেখানে কোনও মঞ্চ তৈরী করা যাবে না। এখানে যে সব স্থায়ী দোকান রয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই বেচাকেনা করতে পারবেন। এজন্য সকলকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।  মেলায় কোথাও কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করা যাবে না। পুণ্যার্থীদের জন্য সমস্ত ধরনের ব্যবস্থা রাখা হবে।  প্রতিটি প্রবেশ পথে  মাস্ক, স্যানিটাইজার এবং থার্মাল স্ক্রিনিংয়ের  ব্যবস্থা রাখা হবে।  অজয় নদের তীরে  পাইপ লাইনের মাধ্যমে পরিস্রুত জল সরবরাহ করা ছাড়াও  প্রয়োজনীয় আলো, শৌচালয়,  নদে স্নানের পরে মহিলাদের পোশাক পরিবর্তনের জায়গা, মেলায় নজরদারি চালাবার জন্য ওয়াচ টাওয়ার,  সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থাও রাখা হবে। পুণ্যার্থীদের  সহযোগিতা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য থাকবে  পুলিশ সহায়তা কেন্দ্র। নজরদারি চালাবার জন্য থাকবে ড্রোন ক্যামেরার ব্যবস্থা।  সরকারীভাবে মেলা না হলেও,  পরিবহন  ব্যবস্থা চালু থাকায়  মকর সংক্রান্তিতে ধর্মীয় ভাবাবেগে যে বহু সংখ্যক  মানুষ জয়দেব-কেন্দুলিতে আসবেন, সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই সমস্ত ধরনের প্রস্তুতিই সেরে রাখতে চাইছে প্রশাসন।।     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *