সাহিত্য বার্তা

সময়ের হ্যাঁ

সময়ের হাঁ,


নীহার চক্রবর্তী,

সমাজ-বিদ্যার অধ্যাপক হেনরি বার্নস অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক হলে নারী-স্বাধীনতার ওপর ভাষণ দিচ্ছিলেন। উপস্থিত গোটা পঞ্চাশেক সমাজের বেশ উঁচু-তলার মানুষ তার কথাগুলো গালে হাত দিয়ে বেশ মনোযোগ সহকারে শুনছিল।
অধ্যাপক বার্নস ইতিহাস থেকে শুরু করে একেবারে বর্তমানে এসে ঠেকলেন। সেই সুদূর থেকে বর্তমান নারী-সমাজ কিভাবে পুরুষ তথা সমাজের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে, তার কথাই তিনি সবাইকে শোনাচ্ছিলেন।

হঠাৎ এক মহিলা দর্শকদের মাঝ থেকে উঠে দাঁড়ালো।
যতটা গলায় জোর দেওয়া যায় সে সেভাবে অধ্যাপক বার্নসের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এই যে, মশ্যায়। অনেক হয়েছে। এবার থামুন। ইতিহাস-বর্তমান সঠিক হলেও আপনি ঠিক নন। আপনি পারলে গোটা নারী-সমাজকে খেয়ে ফেলবেন।‘
তার কথায় চমকে উঠলো সবাই। তার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকলো। কেউ কিন্তু তাকে বসতে বলল না। বরং কেউ-কেউ হাত নেড়ে তাকে কথা চালিয়ে যেতে বলল।

সে আবার শুরু করলো।
‘আমি ওই অধ্যাপকের দ্বিতীয়া স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী অধ্যাপকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে ডিভোর্স দিয়ে এখন ইতালিতে আছে। আমি এসব পরে জেনেছি। আমার ওপর দিনের পর দিন রোলার চালিয়েছে ওই অপদার্থ। কিই না করেছে ও। সিগারেটের ছাঁকা কম খাইনি। শেষমেশ বাধ্য হয়ে সরে এসেছি। এখন আবার বিয়ে করেছে। জানি না পরের স্ত্রী কেমন আছে। তবে ভালো থাকার কথা নয় তার।‘
একনাগাড়ে কান্নাভেজা গলায় কথাগুলো বলে মহিলা তার আসনে বসে গেলো।

কিন্তু অধ্যাপক বার্নস গেলো কোথায়? মঞ্চ থেকে সে কখন নেমে গেলো? হতবাক সবাই।
তবে খুব খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া গেলো হলের এককোণে। সে সেখানে দুই হাত চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে নিয়ে এসে বসিয়ে দেওয়া হল এক চেয়ারে।
আর সেই মহিলা?
তাকেও কোথায় খুঁজে পাওয়া গেলো না। হলের কোণে-কোণে যাওয়া হল। নাহ, কোথাও সে নেই।
সবাই বুঝল, উনি বুঝি সবার চোখ এড়িয়ে বাইরে যাওয়ার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

সেই অধ্যাপক হেনরি বার্নস এখন শয্যাশায়ী। তৃতীয়া স্ত্রীর দেখা নেই। সে নাকি একাই সুইজারল্যান্ডে ছুটি কাটাতে গেছে। দ্বিতীয়া স্ত্রী সেদিন তার সম্বন্ধে যেটুকু পেরেছিল বলেছিল। তারপর থেকে অধ্যাপক সম্পর্কে তার ভাবতে বয়েই গেছে।
শুধু তার শিয়রে দেখা গেলো তার প্রথমা স্ত্রী জুলিয়াকে। ইতালি থেকে লন্ডনে ঘুরতে এসে সে খবর পেয়ে ছুটে এসেছে অধ্যাপক হেনরি বার্নসের কাছে।

প্রথমা স্ত্রীই এখন শয্যাশায়ী অধ্যাপকের একমাত্র ভরসা।
এই সেই নারী…
যে সব কালের নারী-সমাজের এক প্রতিনিধি ।একদিন অনেক কান্না বুকে নিয়ে তাকে ছেড়ে ইতালিতে চলে গিয়েছিলো। আবার ফিরে এসেছে আর একবার বুঝি কাল-কালান্তরের অভিনয়ের ঝাঁপি খুলে দিতে।

 106 12,89,834

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *