ক্রীড়া সংস্কৃতি

রবীন্দ্রনাথ-জাতীয়বাদ ও আন্তজার্তিকতাবোধ

রবীন্দ্রনাথ-জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবোধ

স্নেহাশিস চক্রবর্তী

মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষ ক্রমশ নিজেকে সমাজবদ্ধ করেছে নিজের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই। এই সমাজব্যবস্থা থেকেই উদ্ভব জাতীয় চেতনার বা ভালো করে বললে জাতীয় জনসমাজ। সাধারণত জাতীয় জনসমাজ ততক্ষণই জাতীয়তাবাদে এসে পৌঁছাতে পারে না যতক্ষণ না পর্যন্ত রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ না ঘটে বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে একটি সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা যতক্ষণ সীমায়িত না হয় ততক্ষণ জাতীয় রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা দানা বাঁধতে পারে না। তাই বলা যেতে পারে জনসমাজের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তন যখন একটা নির্দিষ্ট সীমায়িত ভূখণ্ডের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়, সেই জনসমাজকে আমরা জাতি বলতে পারি । আর যেই মাত্র এই জাতির উত্থান সূচিত হয়ে যায় সেখান থেকেই নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয় – আর সেটা হল জাতীয়তাবাদ । অধ্যাপক গিলকাইস্টের মতে একটি রাষ্ট্রের অধীন সুগঠিত জনসমাজকে বলে জাতি । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৭৫৭ সালে ভারতীয় জনসমাজ ছিল, কিন্তু ভারতীয় জনসমাজের আলাদা করে কোনো রাজনৈতিক চিন্তন তখনো শুরুই হয় নি, পরবর্তীতে রাজনৈতিক চেতনা এসে ভারতীয় জনসমাজকে সুগঠিত করে ও একটা পূর্ণ জাতিতে পরিণত করে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত ভারতকে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ একটি ভারতীয় জাতি স্বাধীনতাপ্রাপ্তিতে এসে খানিক অবসর নেওয়ার সুযোগ পায়।

তাহলে আমরা জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝি সেটি কিছুটা পরিস্কার হল আশা করি – আর সেটি হল, জাতীয়তাবাদ হল জাতির প্রতি ভালোবাসা, নিজস্ব ভূখণ্ডের বা দেশের মানুষকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতা, একটি মহৎ রাজনৈতিক আদর্শ যা একটি দেশকে বা জাতিকে প্রেরণা যোগায়, পরাধীনতার গ্লানি থেকে নিজেকে উত্তরিত করে সমগ্র দেশকে ও জাতিকে একত্রিত করা । ম্যাৎসিনি তাই বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক জাতির কতকগুলি গুণ থাকে এবং সেগুলি একত্রে মানবজাতির অমূল্য সম্পদ’ ।

সরাসরি আমরা চলে আসি চলুন এবার রবীন্দ্রনাথে । প্রশ্ন এসে আপনাকে ঘিরে ধরবে যে, রবীন্দ্রনাথ কি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ? তথাকথিত পড়াশুনার বাইরে থাকা রবীন্দ্রনাথের মতো একজন মানুষের চিন্তন কি কখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ভুক্ত করা যায় ? ইত্যাদি ইত্যাদি । আসলে ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ ভারতে তখন মাত্র প্রবেশ করছে হয় অনুপ্রবেশকারী ব্যবসায়ী ইংরেজ বা ফরাসী বা ওলান্দাজদের হাত ধরে । তখন একজন দু’জন করে বাঙালি ভারতীয়ও কালাপানি পেরিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে নিয়ে আসছেন আমাদের স্বদেশে, কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অশিক্ষা এবং রাজনৈতিক অসচেতনতা ভারতীয় জাতিসত্তাকে এই ‘নতুন আলো’ গ্রহনে প্রভূত ব্যাঘাত সৃষ্টি করেই চলেছিল ।

আসলে জাতি হিসেবে প্রকট হয়ে ফুটে বেরোতে চাইলে সবার আগে দরকার ব্যক্তির আত্মবিকাশ, অথচ সেই অঞ্চলেই আমরা ছিলাম অত্যন্ত সাবেকি, আমাদের জাতিগত বিন্যাস তখন ছিল আমাদের মতে অনেকটা এই রকম, “আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স, এবং নিজের বাক্-চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ।” গুটিকয়েক বাঙালি এরমধ্যে পড়বেন ঊনবিংশ শতকে যারা এই ‘নতুন আলোক’ মানুষের মধ্যে লড়াই করে হলেও দিয়ে যেতে চেয়েছেন সতত । ব্যক্তির চিন্তনের আত্মবিকাশই ক্রমশ স্বাদেশিকতাবোধের উন্মেষ ঘটায় । রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ ব্যক্তিত্ব বাহ্যত সমাজ বা ধর্ম আন্দোলনের নামে মানুষের মনে স্বাদেশিকতার বিস্তার ক্রমশ ঘটাতে যে সক্ষম হয়েছেন, আজ তা অকপটে স্বীকার করাই যায় । সমাজ বা ধর্ম আন্দোলনের এই ইতিহাস কখনো সীমাবদ্ধ থেকেছে হিন্দু ধর্ম–ব্রাহ্ম ধর্ম অভিঘাত সংঘাতে আবার কখনো-বা ইসলাম ও খ্রিস্টানদের ক্রমশ ধর্মান্তকরণের বিভিন্ন অপপ্রয়াসে । ক্রমশ এই সমস্ত দ্বান্দিক পরিবেশ মুদ্রিত হতে থাকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় – সেখান থেকেও অতি দ্রুত তা ছড়িয়ে পরে সমাজের বিভিন্ন কোণায় ।

জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথকে খুঁজতে গেলে আমদের অবশ্যই প্রবেশ করতে হবে রবীন্দ্র প্রবন্ধে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো জাতীয়তাবাদের প্রায় নতুন সংজ্ঞা এঁকে দিয়ে গিয়েছেন বলা যেতে পারে । জমিদার রবীন্দ্রনাথ ৩০ বছর বয়সে হাজির হলেন জমিদার হিসেবে শাসন করতে তাদের জমিদারি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ পতিসর ও অন্যান্য অংশে। এখানে এসেই গ্রামের পূর্ণাবয়ব রবীন্দ্রনাথ চেয়ে দেখলেন। সমস্ত দিক অবলোকনের পর রবীন্দ্রনাথ প্রথম উত্থাপন করলেন – আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বনির্ভরতা প্রয়োজন, সমবায় আন্দোলনের প্রয়োজন, সার্বজনীন শিক্ষার প্রয়োজন, অহিংস অথচ সভ্যতার বিকাশকে কাজে লাগিয়ে আমাদের উচিৎ তুল্যমূল্য বিচারে অপরের সমকক্ষ হয়ে ওঠা। আমাদের প্রয়োজন গ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্রের স্বীকৃতি আদায়, জাতি-ধর্ম-শ্রেণী-পুরুষ-নারী পরিচিতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে যুগের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্যই এখানে । পল্লীসমাজের উন্নয়নের জন্য তিনি ১৯০৮ সালে রচনা করলেন আলাদা নিয়ম-নীতি বা সংবিধান । প্রত্যেকটি পল্লীতে লোকশিক্ষার প্রচলন, আদর্শ কৃষিক্ষেত্র বা খামার স্থাপন, স্থানীয় শিল্পের উন্নতিসাধন ও স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের উন্নতি – এই ছিল মুলত রবীন্দ্র ভাবনাচিন্তা, রবীন্দ্র মননে ও চিন্তনে। অর্থাৎ স্বদেশী মানুষকে শিক্ষায় ও কর্মে স্বনির্ভর করে না তুলতে পারলে জাতীয় চেতনার প্রসার ঘটানো যে কখনই সম্ভবপর নয়, এটি রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন অন্তর থেকে । যার পরিণতিতে ১৯২২ সালে তিনি ক্রমশ সরে গেলেন বন্ধু এলমহার্স্টকে সাথে নিয়ে পল্লীউন্নয়নের কাজে ভুবনডাঙ্গাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের অঞ্চলে। ‘শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ও আদর্শ’ প্রবন্ধে ( ভাদ্র, ১৩৪৬ বঙ্গাব্দ ) রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,”এই কখানা গ্রামকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে হবে – সকলে শিক্ষা পাবে, গ্রাম জুড়ে আনন্দের হাওয়া বইবে, গান-বাজনা, কীর্তন-পাঠ চলবে, আগের দিনে যেমন ছিল । তোমরা কেবল কখানা গ্রামকে এইভাবে তৈরি করে দাও। আমি বলবো এই কখানা গ্রামই আমার ভারতবর্ষ। তাহলেই প্রকৃতভাবে ভারতকে পাওয়া যাবে।” ‘সমবায়নীতি’ ( ১৩৬০ ) প্রবন্ধ বইতে রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো ‘লোভসর্বস্ব ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা’-র বিকল্প এক অর্থনীতি ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ মানবিকতা’-র নতুন এক অর্থনীতির সন্ধান দিয়ে গিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ চিন্তনে ও মননে ছিলেন অত্যাধুনিক মস্তিস্কের অধিকারী এক ব্যক্তিত্ব। তিনি অনুভব করতেন, ইংল্যান্ডের মিলের কাপড়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তুলনামূলক সস্তা বিদেশী বস্ত্রকে পুড়িয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত করে নয়, বিজ্ঞানকে ও যন্ত্র-সভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সমমূল্যের বা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। আজ থেকে একশ / দেড়শ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তা করতে পেরেছিলেন, যা আজকের দিনের রাষ্ট্রনায়করাও তাদের সুমস্তিস্কে নিতে অক্ষম বলেই আজও আমাদের দুঃখ মেটেনি। যে সময়কালে পুত্রদেরকে বিদেশে শুধুমাত্র ব্যারিস্টারী বা আই সি এস পড়তে পাঠানো হত, সেখানে রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো উল্টোপথে হেঁটে ১৯০৬ সালে নিজ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে পাঠালেন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যা ও গোষ্ঠীবিদ্যা শিখে আসার জন্য। ১৯০৯ সালে ফিরে এসে প্রায় আশি বিঘা জমিতে তারা বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ শুরু করলেন । যেখানে যথোপযুক্ত সার প্রয়োগ ও জলের প্রয়োজনে পাম্প মেশিনের সাহায্যও নেওয়া হয়েছিল। অদূরেই তারা ইংরেজদেরকে হকচকিয়ে দিয়ে রীতিমতো ট্র্যাক্টর দিয়েও জমি চাষ করিয়েছেন, এক ফসলী জমিকে দুই বা তিন ফসলী চাষে রূপান্তরিত করেছেন রবীন্দ্র-স্নেহচ্ছায়ায় ।

আসলে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাপ্রণালিতে যুক্ত ছিল মনুষ্যত্ব, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার মতো সর্বোচ্চ আদর্শের এক ভিত্তিভূমি । স্বদেশ, জাতীয়তাবাদ ও সেখান থেকে আরো উচ্চে আন্তর্জাতিকতাবোধ জাগিয়ে তুলে পৃথিবীর মানুষকে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ মানবতা’র মন্ত্রে দীক্ষিত করতে। দুর্ভাগ্য আমাদের, দুর্ভাগ্য আমাদের দেশের, দুর্ভাগ্য আমাদের বিশ্ববাসীর – আমরা হয়তো রবীন্দ্রনাথের এই জাতীয়তাবাদকে ও সেখান থেকে মানবিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আন্তর্জাতিকতাবোধে পৌঁছানোর রাস্তাগুলো সংকীর্ণ ক্ষুদ্রতর রাজনৈতিক স্বার্থেই পরিত্যাগ করেছি বা জেনেবুঝেই একটি বিকল্প অর্থনীতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছি। ফলত, আজ আমরা ক্রমশ এক অমানবিক, অস্ত্রশস্ত্রধারী দেশ হিসেবেই ( প্রায় সকল ধনতান্ত্রিক দেশসমূহ ) এগিয়ে চলেছি আমাদের আত্মাকেই খুন করতে । ধর্মের জন্য নির্লজ্জ রাজনীতির প্রকাশ, মনুষ্যত্বকে অপমান ও জাতীয়তাবাদী মানসিকতাকে ধর্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলে আগামী জাতির জন্য কি রেখে যাচ্ছি, সে প্রশ্ন করার সময় হয়েছে বৈকি ।

এত ভেদাভেদের মাঝেও রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করে গেছেন সমন্বয়বাদীদের একত্র করার । ১৮৬৭ সালে প্রথম হিন্দুমেলার মাধ্যমে সংস্কার প্রচেষ্টার বাইরে জাতীয়তাবাদী প্রথম অভিব্যাক্তি লক্ষ করা যায় । ১৮৭৬ সালে ‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান’ গঠিত হয়, সর্বপ্রথম সুরেন্দ্রনাথ, আনন্দমোহনদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আলোচনা থেকে সরাসরি জাতীয় আন্দোলনে অবতীর্ণ হলেন তারা । এরপর ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম । ক্রমশ যা ছিল আলোচনার বিষয়, আলোচিত হতে হতে সমাজ তথা জাতিকে সেখান থেকেই মাথা তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন সংঘবদ্ধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্রোতের দ্বারা।

জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথের একটি ধারণা আপনাদের সামনে রাখছি তার ‘গোরা’ উপন্যাস থেকে, “মা তুমিই আমার মা । তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই, শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা, তুমিই আমার ভারতবর্ষ” । আসলে জাতি-ধর্ম-বিচার-বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বভারতীয় মানবতার এই কল্যাণময় ঐক্যানুভূতিই ‘গোরা’ উপন্যাসের চরম সিদ্ধান্ত। এখানে আর একটি বিষয় মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, ‘গোরা’ উপন্যাসের ‘গোরা’ চরিত্রের সত্যানুসন্ধান এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের আত্মানুসন্ধান কিন্তু সমার্থক হয়েই প্রতিভাত হয়েছে । সর্বজনীন সত্যানুসন্ধিৎসাই রবীন্দ্রনাথের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সর্বমানবিক মিলনের বাণী শুনিয়ে রবীন্দ্রনাথ অপ্রান চেষ্টা করে গিয়েছেন ভারতীয় মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করতে । জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথের বিজয় এখানেই ঘোষিত হয়, অথচ তিনি না ছিলেন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, না ছিলেন তৎকালীন তথাকথিত কুলীন সমাজের অংশীদার, উল্টে বরঞ্চ রবীন্দ্রনাথকে তৎকালীন তথাকথিত কুলীনসমাজ থেকে যথেষ্ট কটু ব্যবহারই পেতে হয়েছিল, সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ের পরেও । রবীন্দ্র মননে সততই ছিল হিন্দু-অহিন্দু সকলকেই স্বীকার করেই ভারতীয় জাতীয় সত্তা। আর এই জাতীয় সত্তার বিস্ফোরণের নামই জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথ ।

রবীন্দ্র-উপন্যাসের অপর আরেকটি ধারাতে আমরা দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস ১৩২২ বঙ্গাব্দে ক্রমান্বয়ে ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকায় প্রকাশ করে চলেছেন, সেই সময় কোনো এক অনামী মহিলা সেই উপন্যাসের খণ্ডাংশ পড়ে লেখককে বহু প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছেন । রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অগ্রাহয়ন, ১৩২২ সংখ্যায় ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের টিকা টিপ্পনী-তে জানালেন সেই অনামিকা মহিলাকে যে, “দেশের আধুনিক কাল গোপনে লেখকের মনে যে সব রেখাপাত করেছে ঘরে বাইরে গল্পের মধ্যে তার ছাপ পড়েছে ও লেখকের ভালোমন্দ লাগাটাও বোনা হয়ে গেছে।” তাহলে আমরা কি পাচ্ছি, লেখক রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বীকার করছেন তার অনুসন্ধিৎসু মন উপন্যাসের একটা শিল্পোকরণ সংগ্রহ করছেন মাত্র একদম আধুনিক সমাজের চলনের থেকেই, আর সেটাই লেখকের আত্মপ্রক্ষেপনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে গল্পে বিভিন্ন চরিত্র-চিত্রনের মাধ্যমে। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে আমরা পাই, ছোট্ট হলেও ভারতীয় রাজনীতি তথা স্বদেশী আন্দোলনের তৎকালীন স্বল্প চিত্র। যেখানে ব্যবসায়ী জমিদারের ( অর্থনৈতিকভাবে বড়োলোকের ) প্রতিভূ হিসেবে সাচ্চা স্বদেশী নিখিলেশ গোপনে ও প্রকাশ্যে ভারতীয় স্বদেশী আন্দোলনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন দেশের আগামী স্বাধীনতার জন্য। নিখিলেশের শিক্ষক চন্দ্রনাথবাবু তার ছাত্রের এই ধরণের কাজকর্মকে পূর্ণ মাত্রায় সমর্থন করেন ও আত্মতৃপ্তি লাভ করেন এই ভেবে যে দেশ নিবেদিত একজন ছাত্রকে তিনি তৈরি করেতে পেরেছেন। স্বাধীনতার আন্দোলনে যখন চরমপন্থী ও নরমপন্থী বিরোধ তুঙ্গে, তখন চরমপন্থীদের নামে কুলাঙ্গার সন্দীপের মতো চরিত্র এসে দেশমাতৃকার নামে এককভাবে সমস্তটাই গ্রাস করতে চান, ব্যক্তিগত লোভ-লালসা তার পরিপূর্ণ, দেশ বা স্বাধীনতা আন্দোলন তার কাছে শুধুই ব্যক্তিগত ব্যবসার একটি সরঞ্জামমাত্র । তাই বুঝি লেখক বলিয়ে নেন, “দেশের নামে ত্যাগ যারা করবে তারা সাধক কিন্তু দেশের নামে উপদ্রব যারা করবে তারা দেশের শত্রু। তারা স্বাধীনতার গোড়া কেটে আগায় জল দিতে চায়।” এই উপদ্রব দেশের সন্তান করলেও তিনি ভক্ষ, তাকে সরিয়ে দেওয়াটাই উপযুক্ত দেশের ও দশের স্বার্থে । তাহলে আমরা রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী ধারণা কি ছিল, কিছুটা অনুমান করতে পারছি ? অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ মানবিকতা’ সমর্থনে সতত কথা বলেছেন পরিণত অবস্থাতেও।

এই ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ মানবিকতা’র ধ্যানাগ্রাহী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতটা জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেন সে বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা আজও চলেছে। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ বলেন – রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। জুগিয়েছেন স্বাধীনতার প্রেরণা। জাগিয়েছেন তার চেতনার রঙে, নানা বর্ণ সমাহারে। ভাসিয়েছেন তার সত্তার জ্যোতির্ময় শিখার আলোকের ঝর্ণাধারায়। রবিরশ্মির শুভ্র দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে ভারতবর্ষসহ বিশ্বময়। তবে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ছিল সামগ্রিক অর্থে। অর্থাৎ, সর্বজনীন। একই সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর। ইউরোপীয় ও ভারতীয় দুই ধারার সমন্বেয়েই যে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী ধারণা পরিপুষ্ট হয়েছে এ কথাকে মনে রেখে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ রবীন্দ্রনাথকে বলেছেন ভারতীয় রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ।

আসলে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের ধারণা ছিল বহুমাত্রিক আর তাই রবীন্দ্রনাথকে সমালোচিত হতে হয়েছে সবথেকে বেশি। রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে একদিকে যেমন পাশ্চাত্যে গিয়ে ‘ন্যাশানালিজম’ বক্তৃতায় পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদকে একেবারে তুলোধুনো করেছেন, এমনকি পাশ্চাত্যের ন্যাশানালিজম বা জাতীয়তাবাদ যে পৃথিবীর বা মানবিকতার ভয়ঙ্করতম শত্রুতে পরিণত হতে যাচ্ছে, সে কথা প্রকাশ্যে জানাতে তিনি দ্বিধা করেন নি। তিনি সমালোচিত হলেও মাত্রই কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের এই ধারণাকে ফলপ্রসু করে মানবনিধনযজ্ঞ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল । এই ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বমানব বা আন্তর্জাতিকতাবোধের এক নতুন নায়ক হিসেবে পরিগনিত হয়েছেন। তিনি জানতেন ধর্ম ও জাতিকে বিচ্যুত করলে সেখানে রাষ্ট্রের ভিতর ধিকিধিকি আগুণ থেকে যায়, যা একেবারেই জাতীয়তাবাদের পরিপন্থী, শুধুমাত্র একটি ভৌগলিক সীমারেখা কখনই জাতীয়তাবাদের মূল সূত্র হতে পারে না, তাই ন্যাশালালিজম শব্দের উপর ক্রমশ বিশ্বাস হারিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । দেশের মানুষের মধ্যে যতক্ষণ এক জাতি এক প্রাণ বোধ সঞ্চার না হবে ততক্ষণই শাসক স্বৈরাচারী হিসেবে জাতিকে বা দেশকে শোষণ করতেই থাকবে, রবীন্দ্রনাথ এমন জাতিয়তাবোধের বিরোধিতা করেছেন এককভাবে । ঠিক এই কারণেই তার রচিত ‘তাসের দেশ’-এর তাসেরা মানুষ হয়ে ওঠে, ‘অচলায়তন’ ভেঙে পড়ে, ‘মুক্তধারা’ বইতে থাকে এবং ‘রক্তকরবী’র সেই ভীষণ রাজারও পতন ঘটে।

রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’-এ ইংরেজ রাজত্বের অবসানের অবশ্যম্ভাবিতার যে বিশ্বাস ফুটে উঠেছে, তার সেই একই বিশ্বাস সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও। তার পাহাড় মেঘ হয়, নদী থাকে সতত প্রবহমান, আর মানুষ এগিয়ে চলে মুক্তির লক্ষ্যে- সব বন্ধন ছিন্ন করে। তার মতে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। মানুষের শক্তির ওপর আস্থা তার অবিচল। এখানেই রবীন্দ্রনাথ উত্তরিত হন ‘ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র’- এই ত্রয়ীর আরো উপরে যেখানে দণ্ডায়মান থাকে আন্তর্জাতিকতাবোধ ও ‘রাজনীতি নিরপেক্ষ মানবিকতা’ । বিশ্বমানবে রূপায়িত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এখানেই আমাদের পথ দেখান আগামীর ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *