রাজনীতি

অনুব্রতহীন মঙ্গলকোট আউশগ্রামে রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে

জ্যোতিপ্রকাশ মুখার্জি,


গত ২৩ শে জুলাই তৃণমূল ‘সুপ্রিমো’ মমতা ব্যানার্জ্জী দলীয় সংগঠনের বেশ কিছু পরিবর্তন করেন। পর্যবেক্ষকের পদ তুলে দিয়েছেন। অন্তত তিনটে জেলার সভাপতির পদ পরিবর্তন করেছেন। এই মুহূর্তে কোনো জেলায় চেয়ারম্যান, জেলা সভাপতি বা কো-অর্ডিনেটর ছাড়া অন্য কোনো পদ নাই। ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ২৪ শে জুলাই বিকেলে পরিবর্তন পুনর্বিবেচনা করার দাবি বা আর্জি জানিয়ে গুসকরায় রীতিমত সভা করে বসল পূর্ব বর্ধমানের আউসগ্রাম ১ ও ২ নং ব্লকের তৃণমূলের একশ্রেণির নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি অনুব্রত মণ্ডলের হাতেই দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে।
বীরভূমের বাইরে বেশ কয়েক বছর ধরে আউসগ্রাম, মঙ্গলকোট ও কেতুগ্রামের দলীয় দায়িত্ব সামলেছেন বর্তমান বাংলা রাজনীতির অন্যতম বর্ণময় চরিত্র অনুব্রত মণ্ডল যিনি সবার কাছে কেষ্ট মণ্ডল নামে পরিচিত। তার হাত ধরেই দল সংশ্লিষ্ট তিনটি বিধানসভায় এবং গুসকরা পৌরসভায় ক্ষমতা লাভ করে। গোটা রাজ্যে দলের ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জ্জী যেমন শেষ কথা তেমনি বীরভূম ও এই তিনটি ব্লকে কেষ্ট মণ্ডলই হয়ে ওঠেন শেষ কথা। অন্যান্য নেতাদের ভূমিকা সেখানে গৌণ। দলীয় মহলে জনশ্রুতি যার মাথায় কেষ্ট মণ্ডলের আশীর্বাদের হাত থাকে তিনিই এলাকার নেতা হয়ে ওঠেন। সেক্ষেত্রে জনসাধারণের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি বা পরিচিতি না থাকলেও অসুবিধা নাই। ওয়াকিবহাল মহলের মতে এরফলে যোগ্য ব্যক্তির পরিবর্তে অনেক অযোগ্য ব্যক্তি নাকি ক্ষমতার অন্দরে চলে আসে। আউসগ্রামে বাতিলের তালিকায় চলে যান চঞ্চল গড়াই, চন্দ্রনাথ ব্যানার্জ্জী (চাঁদু), নির্মল গোস্বামী, জগা তুড়ি, পঙ্কজ বালা, রতন পাল, সুন্দর গোপাল চোংদার বা প্রশান্ত ঘোষদের মত দুর্দিনের নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলকোটের দুর্দিনের নেতা, সিপিএমের আমলে বারবার লাঞ্ছনার শিকার প্রণব মণ্ডল দল থেকে বহিষ্কৃত হন। আর এক নেতা বিকাশ চৌধুরী জেলে বন্দী। এলাকায় কান পাতলেই শোনা যায় নিজের এক ‘প্রিয়পাত্র’ কে জায়গা করে দেওয়ার জন্যই নাকি এই সিদ্ধান্ত। যাইহোক নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া অনেকেই আবার তৃণমূলের প্রথম ‘কোর’ কমিটির সদস্য ছিলেন। সি.পি.এমের আমলে চালু ছিল ‘শীত, গ্রীষ্ম,বর্ষা গুসকরার দলীয় অফিসে চাঁদুদাই ভরসা।’ চঞ্চল গড়াই বা চাঁদু বিজেপিতে যোগ দিলেও এলাকার মানুষের চোখে ওরা আজও তৃণমূলেরই। আর এক ডাকাবুকো নেত্রী মল্লিকা চোংদার সম্বন্ধে মাঝে মাঝে শোনা যায় তাকে নাকি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাকেও অপাংক্তেয় করে রাখা হয়েছে।
কেষ্ট মণ্ডলের আমলেই আউসগ্রাম, মঙ্গলকোটের অনেক তৃণমূল নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘কাটমানি’র অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে তাদের নাম করে অভিযোগ করেছেল। তিনি নিজেও বারবার তাদের সতর্ক করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি বা নেননি।
কোনো এক দলীয় সভায় জনৈকা মানবাধিকার কর্মীকে তিনি গাঁজার কেসে জেলে ভরে দেওয়ার ‘হুমকি’ দেন। তারপর থেকে দলের চুনোপুঁটিরা পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে ‘গাঁজার কেস’ দেওয়ার হুমকি দিতে শুরু করে । এই ঘটনা মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এছাড়া পুলিশকে বোম মারার হুমকি, বিরোধীদের বিরুদ্ধে গুড়-বাতাসা, নকুল দানা, পাঁচন ইত্যাদি ‘শব্দ বন্ধনী’র ব্যবহার রাজ্য-রাজনীতিতে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করে। যদিও তিনি অনেক ক্ষেত্রে ‘স্লিপ অফ টাং’ বলে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেন তার এসব বলা উচিত হয়নি। প্রকাশ্যে ভুল শিকারের ক্ষমতা সবার থাকেনা।
যত দোষই থাকুক, বিপদের সময় রাত-বিরাতেও দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি দ্বিধা করেননা। এই মুহূর্তে, অন্তত খাতায় কলমে, তার বিরুদ্ধে থাকা মল্লিকা চোংদার পর্যন্ত তার এই গুণের কথা স্বীকার করেন। অনেকে স্পষ্ট করে বলেন – কেষ্টদা না থাকলে আউসগ্রাম, মঙ্গলকোটে সংগঠন গড়ে তোলা ছিল কঠিন কাজ। তবে অনেকে একথাও বলেন – নিজের অযোগ্য প্রিয়পাত্রদের জায়গা করে দিতে গিয়েই নাকি অনেক যোগ্যদের বাদ দিয়েছেন।
স্বাভাবিক ভাবেই এই রকম একজন নেতার পরিবর্তে অন্যজন দায়িত্ব পেলে প্রতিবাদ হবেই, এটা স্বাভাবিক। তবে এই প্রতিবাদ কতটা অনুব্রত মণ্ডলের স্বার্থে এবং কতটা অনুব্রত মণ্ডলের অনুগ্রহে পাওয়া নিজের পদ রাখার স্বার্থে সেটা সময় বলবে। যতই দল থেকে বহিষ্কার করা হোক চঞ্চল গড়াই আজও এলাকায় একইরকমের জনপ্রিয় থেকে গেছেন।অপাংক্তেয় রাখার চেষ্টা করলেও মল্লিকা চোংদারের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেকের আশঙ্কা নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতা হয়তো তাদের ক্ষমতা বৃত্ত থেকে সরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের সম্বন্ধে জনমনে বিরূপ ধারণা আছে অথবা যাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সাধারণ মানুষকে তৃণমূল সম্বন্ধে চটিয়ে দিয়েছে। এলাকার রাজনীতি সম্বন্ধে যারা ওয়াকিবহাল তাদের মতে বিক্ষোভকারীদের একটা অংশ মূলত পদ হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদ করেছে। বাকিরা অজানা ভয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।
সদ্য দায়িত্ব প্রাপ্ত সুভাষ মণ্ডলকে বিক্ষোভ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দিতে চাননি। তিনি বলেন – দলটা তার একার নয়। সবার মিলিত প্রয়াসে সাফল্য আসবে। আমার মাথার উপরে যারা আছেন তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব।
অন্যদিকে মল্লিকা চোংদার বললেন – দিদির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা লড়াই করে দলকে ক্ষমতায় এনেছেন, যারা নানা কারণে দল ছেড়ে দিয়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন আশা করা যায় দলে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হবে। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির বর্তমান নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের বিজেপির বিরুদ্ধে একসাথে লড়তে হবে। আমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করলেও গুসকরা তথা আউসগ্রামের বুকে বিজেপির বিরুদ্ধে একসাথে লড়াই করব।
কি হবে – সেটা সময় বলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *