ভারত চেতনা – হুমায়ুন কবীর

ক্রীড়া সংস্কৃতি

হুমায়ুন কবীর


কে না জানে শিক্ষার সাথে জ্ঞান কোথায় যেন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে, আর জ্ঞান বিকশিত করে চেতনাকে। চেতনার ইতিহাস বড্ড পুরাতন আর এই ইতিহাস পুরাকালে ভারতবর্ষেরই ছিল একচেটিয়া। মানুষের ১৩৫০ গ্রাম মস্তিস্কের কোষে কোষে সঞ্চিত জ্ঞানই হল চেতনার আধার। চার হাজার বছরেরও বেশী পুরাতন ভূর্জপত্রে লেখা ঋক বেদ পৃথিবীতে অন্যতম পুরান গ্রন্থ আর তার জন্মভিটে ভারতবর্ষ, গ্রন্থ আকারে ঋক বেদ শিক্ষার শুধু নয় জ্ঞান আর চেতনার শক্তপোক্ত প্রমান। তবে শিক্ষ ছাড়া চেতনা হয় না বা শুধু মানুষেরই চেতনা আছে তাতো নয়, নইলে ফি’বছর সাইবেরিয়া থেকে গুচ্ছের হাঁস উড়ে আসতে পারতো না সাঁতরাগাছি ঝিলে, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বড় করে ফিরেও যেতে পারত না বছরের পর বছর, এমন হাজারো উদাহরনের ছড়াছড়ি জীববিজ্ঞানের বইগুলোতে। মজার ব্যপার হল ঋক বেদেই আছে ভারতের উল্লেখ, দুশ্মন্ত আর শকুন্তলার সন্তান রাজচক্রবর্তী ভরত চেয়েছিলেন অখণ্ড ভারতে হাজারো ভাষাভাষী আর ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর বিশ্বাসের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মনুষ্যের মধ্য জাতীয় চেতনা জাগাতে, ভৌগলিক বা রাজনৈতিক বাঁধনে নয়, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটিয়ে। অভিজ্ঞতা জ্ঞান আর চেতনার বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও আধুনিক মানুষের গুহা ছেড়ে দুপায়ে হেঁটে বেরিয়ে আসা নয় নয় করে হয়ে গেল ষাট সত্তর হাজার বছর, চেতনা তখনও ছিল, আজও আছে তবে আমাদের ভারতবর্ষে এটি বহু প্রাচীন হলেও চেতনার জাগরন পরবর্তীকালে সেভাবে হয়নি, আমাদের সামনে দিয়ে হামাগুড়ি মেরে বেরিয়ে আসা য়্যুরোপ-আমেরিকা ড্যাং ড্যাং করে অনেকখানি এগিয়ে গেছে চেতনার হাইওয়েতে আর আমরা বহু পুরাতন তামাদি হয়ে যাওয়া চেতনা নিয়ে দিন দুপুরে মিথ্যাচারন করছি গলি-ঘুঁজিতে।
আরও একটু এগিয়ে এলে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চানক্যকে পেয়ে যাই খ্রিষ্ট পূর্বের শ’তিনেক বছর আগে, মৌর্য বংশের চন্দ্রগুপ্ত-বিন্দুসারদের নীতি আর চেতনার অথেন্টিক গুরু চেতনার সুগন্ধ আজও ছড়িয়ে থাকেন অন্তরজালে, কুলকুচি করার মত অবলীলাক্রমে পঙক্তি পঙক্তিতে নীতির মাধ্যমে চেতনা ছড়িয়ে আসছেন এতগুলো বছর, খুব প্রাসঙ্গিক চিরকালীন এক চিন্তক। চানক্য নীতিতে ম ম করত তখনকার রাজনীতি আর অর্থনীতি। তাঁর নীতিই ছিল তখনকার রাজা রাজড়াদের পথনির্দেশিকা আর বর্তমানের মারপ্যাঁচের যুগের রেফারেল উপদেশ।
পৃথিবী জুড়ে সাড়া ফেলে দেওয়া চেতনার কথা যদি ভারতবর্ষের বাইরে গিয়ে ভাবি, যদি উঁকি মারি পশ্চিমে, খ্রিষ্টপূর্বে ইহুদিদের রমরমা বাজার, এমনই এক ইহুদি মা মেরীর কোল আলোকিত করে যীশু জন্মালেন বেথলেহেমের পশুখোঁয়াড়ে, খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার শুরুর বছর চারেক আগে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি যীশুর বানীর ছত্রে ছত্রে চেতনার উন্মেষ, ছড়িয়ে পড়ল ভালোবাসার কথা, ক্ষমা আর শান্তির বার্তা। ভক্ত হয়ে গেল বহু ইহুদি। ভগবান আসলে কেমন, তাঁকে কেমন করে ডাকব তাই নিয়ে ইহুদিদের সঙ্গে গোল বাধল, ইহুদিরা মানল না ওঁর চেতনার বাণী, বিরুদ্ধাচারনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হয় ইহুদি কতৃপক্ষকে, রোমান সম্রাট পন্টিয়াস পাইলেটর হুকুমে ক্রুশ বিদ্ধ হলেন যীশু কিন্তু মৃত্যু হল কোথায়? চমকপ্রদভাবে জেগে উঠলেন প্রভু হয়ে, তাঁর চেতনা বিকশিত হল পৃথিবী জুড়ে। পৃথিবীতে আজও এক তৃতীয়াংশ মানুষ যীশুর সেই জাগিয়ে যাওয়া চেতনার আনুগামী।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে জন্মালেন আর এক মহাপুরুষ, মধ্যপ্রাচ্যের বেদুঈনদের অরাজকাতার মাঝে আবু আল কাশিম মুহাম্মদ ইবন আদব্দুল্লাহ ইবন হাশিম আকা মুহাম্মদ। আল্লাহ্‌র দূত পয়গম্বর মুহাম্মদ একাত্ববাদ আর বাস্তববোধ সম্বল করে বিচার বিবেচনাবোধ তরঙ্গের মত বইয়ে দিলেন সমাজে, মহান আল্লাহ্‌র বানী সুরাতে সুরাতে ভরে দিলেন মানুষের মধ্যে চেতনা জাগাতে, মক্কার মাটিতে জন্ম নিল নতুন ধর্ম ইসলাম। মূর্তি পুজার বিরোধী এই পয়গম্বর প্রতিরোধের মুখে পড়লেন এমনকি তাঁর নিজস্ব কুরাইশ বংশের মধ্যেও। মক্কা ছেড়ে পাড়ি দিলেন মদিনায়, হিজরার পর বছর পাঁচেকের রক্তক্ষয়ী লড়াই লড়তে হল মুহাম্মদকে, জিতলেন মুহাম্মদ। বছর আটেক পরে ফিরে এলেন মক্কায় প্রায় বাধাহীন অসম যুদ্ধের মাধ্যমে, মুক্তি দিলেন বন্দীদের, ক্ষমা করে দিলেন তাঁর বিরধীদের, নতুন এক চেতনার জন্ম হল মক্কার মাটিতে। হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল ইসলাম, বহু মানুষ হয়ে উঠলেন ইসলাম আর মুহাম্মদের আনুগামী।
যদি ফিরে তাকাই ভারতের ইতিহাসের দিকে, অষ্টম শতাব্দী শুরুর দিকে আরব থেকে মোহাম্মাদ বিন কাশিম দখল করলেন সিন্ধু আর মুলতান, তারপর মাহমুদ গজনি, মুহম্মদ ঘোরি হয়ে দাস বংশ, খিলজি বংশ আর তুঘলক বংশ পেরিয়ে ভারত দেখল লোদি বংশ। ভারতে শুরু হল মুসালমান শাসকদের একছত্র জয়জয়কার। যুদ্ধ আর জয় করে নেওয়া একের পর এক ভূখণ্ড, শক্তির আস্ফালনের সঙ্গে জয়ের নেশা, শাসকদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেলেও মধ্যযুগ হল অবিশ্বাস,বাহাদুরি আর হানাহানির কাল। হৃদয়ের বা মনের জয় নয় ভূখণ্ডের দখলদারির সাথে সাথে আস্ত মানুষ আর সম্পদের জয়, শৌর্য- বীর্যের ঝঙ্কার তাই মানবিক চেতনার অভাবের অভিযোগ তোলাই যায় এই সময়টাতে।
দক্ষিণ ভারতে চোল, চালুক্য, হয়শল, বাহমানি সুলতানি আমল, দাক্ষিনাত্যের আরও সুলতান এবং নিজামদের শাসনে মানব চেতনার সঙ্গে সঙ্গে চেতনার অবক্ষয়ের উদাহরনও রয়েছে ভুরি ভুরি।
ষোড়শ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে মোঘল সাম্রাজ্যের শুরু। শাসন, উন্নয়ন, শিল্পকলার মিশেল এই অধ্যায়ে চেতনার বিকাশ নিশ্চয়ই ঘটেছে তবে মধ্যযুগীয় মাপ মত। মাঝের পনেরটা বছর শের শাহ সুরী জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগিয়েছেন তাঁর মত করে। আকবর থেকে শাজাহানের সময় পর্যন্ত নানান সামাজিক উদারতা, দূরদর্শিতা, শিল্পকলার বিকাশের জুগেও মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটে। ঔরঙ্গজেব দক্ষ প্রশাসক হিসাবে সাফল্য পেয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করলেও তাঁর নিয়ত নিয়ে সন্দেহ ছিলই। ভিন্ন ধর্মের প্রতি তাঁর অসহিষ্ণুতা, সন্দেহবাতিক চরিত্র আর মানবিকতার অভাব মোঘল সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দেয় অনেকখানি। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত টিমটিম করে টিকে থাকলেও শেষ মোঘল সম্রাট অভিমানী বাহাদুর শাহ জাফরের হাত থেকে ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে নেয় সিপাহী বিদ্রোহের বছর ১৮৫৭ সালেই, এর পরেই পুরোদমে ভারতবর্ষে শুরু হয়ে গেল পুরদস্তুর ইংরেজ শাসন। রেঙ্গুনে ইংরেজদের জেলে কবি এবং শেষ মোঘল সম্রাট বাহদুর শাহ জাফর মৃত্যু বরন করলেন ১৮৬২ সালে, ‘না ম্যায় কিসিকা আঁখ কা নুর হুঁ, না কিসিকা দিল কা করার হুঁ’। ভারতের মাটিতে অবসান হল মুসলমান শাসনের কিন্তু মুসলমানরা মিশে গেল আমজনতার সাথে, হাজার বছরেরও বেশী মিলে মিশে থাকতে থাকতে ভারতবর্ষই হয়ে গেল তাদের দেশ।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ ছিল শঠতা আর বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত এক নিদর্শন। দেখতে দেখতে একশ বছরের মধ্যে পুরো ভারতবর্ষ দখল করে নিল ব্রিটিশ শাসকরা, কঠোর শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে দমন পীড়ন ছিল নিত্যাকার দিনলিপি তবে ইংরেজ শাসকদের মধ্যেও চেতনার বিচ্ছুরন দেখেছে ভারতবাসী।
পরাধীন ভারতে বহু ঘটনার মধ্যে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করার মত, তাঁর মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক, জন্ম নিলেন রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর, নরেন্দ্রানাথ দত্ত এবং মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধী। ভারতে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে আলাদা আলাদা কাজের মধ্য দিয়ে এঁদের প্রভাব আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সালটা ১৮৬১, জন্ম নিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারতবাসী পেয়ে গেল এক অসামান্য কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার-সুরকার, আধ্যাত্মিক চিন্তক, দার্শনিক এবং সৃষ্টিশীল এক মহাপুরুষ। তাঁর লেখার বারে বারে উঠে এসেছে ভালোবাসা, প্রেম, আবেগ, আনুভতি, বিরহ, ব্যথা-বেদনা, সমস্ত আঙ্গিকে সব রকম মানুষের ভাবাবেগের কথা সহজ ভাবে – জটিল চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে, পরতে পরতে বিচ্ছুরিত হয়েছে নানা রঙের জীবনকথা। পরাধীন ভারতে জন্মেছেন রবীন্দ্রনাথ আবার মৃত্যুও এসেছে পরাধীন ভারতেই, স্বাধীনতার আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়েননি তবে মোহনদাস গাঁধীর বন্ধু লিখেছেন ‘বনিকের মানদণ্ড দেখা দিল, পোহালে শর্বরী, রাজদণ্ড রূপে’ কিংবা জালিওয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদ জানালেন নাইট উপাধি ত্যাগ করে। এমন ভুরি ভুরি উদাহরন তাঁর কর্মকাণ্ড আর লিখনিতে প্রকাশ পেয়েছে বারে বারে, ভালোবাসার মাধ্যমে জয় আর ক্ষমাই ছিল কবির চেতনার মূলমন্ত্র,তাই তিনি ‘প্রশ্ন’ করতে পারেন ‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে দয়াহীন সংসারে- তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালবাসো- অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো…। কবির চেতনার বহিপ্রকাশ শুধু তাঁর সৃষ্টির পাতায় লেখা রয়েছে তাই নয় তিনি মানুষের চেতনায় সেই যে প্রভাব বিস্তার করলেন আজও একইভাবে রয়ে গেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে।
ভারত মহাপুরুষদের জন্য উর্বর মাটি, ১৮৬৩ সালে জন্ম নিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রখর বুদ্ধির ছাত্র নরেন্দ্রনাথ পড়াশুনার পাঠ চুকানোর পর পুরোদমে শ্রী রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এলেন হিন্দু ধর্ম আর আধ্যাত্মিক শিক্ষার আনুশীলনে। ভগবানের খোঁজ সেই শুরু, শেষটায় উপলব্ধি ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। গুরুকে ছাপিয়ে বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তরুন এই সন্ন্যাসী, জীবে প্রেমই ঈশ্বরের সাধনা, পৃথিবীতে সব ধর্মই সত্য আর সবার উপরে মানুষ সত্য। বিশ্বভাতৃত্বে বিশ্বাসী চিন্তাশীল এই দার্শনিক সন্ন্যাসী ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক আবার পশ্চিমী দর্শনের এক আদর্শ ছাত্র। ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে তাবৎ বিশ্বকে চমকে দিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনায়, দর্শনে আর অন্য ধর্মের প্রতি সম বিশ্বাসে। রামকৃষ্ণ মিশনের এই প্রতিষ্ঠাতা ন্যুইয়র্কে বেদান্ত সমাজ গড়ে তুলেন আত্মচেতনা আর আত্মশুদ্ধির জন্য। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় তরুন এই সন্ন্যাসীর মৃত্যু পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিল তবে যে মানব চেতনার ভাবধারা ছড়িয়ে গিয়েছেন বিশ্বজুড়ে তা আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুকরণীয়।
হালফিলের জ্ঞান আর চেতনা যদি খুঁজি তারও ঘাটতি নেই ভারতবর্ষের মাটিতে, ১৮৬৯ সালে ২রা অক্টোবর জন্ম নিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধী, এলোমেলো ভাবে কেটে গেল শৈশব-কৈশোর, লন্ডনে পাড়ি দিয়ে আইনি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে, উকিল হিসাবে কাজ নেই। বন্ধুর পরামর্শে পাড়ি দিলেন দক্ষিন আফ্রিকা। ট্রেন সফরে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটেও ঘাড় ধাক্কা খেয়ে বাইরে বেরুতে হল গায়ের চামড়া কালো বলে। শুরু হল এক নতুন ধরনের চেতনার, সত্যের ক্ষমতা যাচাইয়ের আন্দোলন সত্যাগ্রহ। ডারবানের কাছে ফোয়েনিক্স ফার্ম গড়লেন শান্তিপূর্ণ এবং অহিংস সত্যাগ্রহের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে। পরবর্তী কালে তলস্তয় ফার্ম থেকে সত্যাগ্রহের মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুললেন বিভিন্ন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে, জেল খাটলেন এসব করতে গিয়ে। বছর কুড়ি দক্ষিন আফ্রিকায় কাটিয়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এর নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের আমন্ত্রনে ফিরে এলেন দেশে, ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে হিংস-অহিংস লড়াইয়ের পর ভারতছাড় আন্দোলনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এল কাঙ্খিত স্বাধীনতা, নতুন এক চেতনার উন্মেষ ঘটল স্বাধীন ভারতে। ধর্মোন্মাদ শক্তির হাতে গাঁধীর মৃত্যু বরনের মধ্যে দিয়ে অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরী হলেও সামলে নিল ভারতবর্ষ শুধু মানবিক চেতনা আর গাঁধীজির শিখিয়ে যাওয়া অহিংসার শিক্ষায়।
স্বাধীনতা পেয়ে আমরা ভারতবাসী আনন্দে ঊর্ধ্ববাহু হলাম, গর্বে বুক ফুলে ওঠে যখন শুনি ‘ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম, আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে’। নাৎসি জামানায় জার্মান শব্দটাই যেমন তাতিয়ে দিত হের হিটলারের সমর্থকদের, তেমনি ভারতীয় শব্দটাই ভাষা, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত ভারতবাসীর উপলব্ধিতে ছিল জাতীয়তাবাদের দ্যোতক। ধনী-দরিদ্র, ছোটবড় সব দেশ আর জাতি নিজেদের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হবে, গর্ববোধ করবে এ আর নতুন কি? একসময় ব্রিটিশরা বলত তাদের অধিকৃত এলাকায় সূর্য অস্ত যায় না, এতটাই ছিল তার বিস্তৃতি। এখনটা যেমন দাপট দেখায় আমেরিকা, তারা আজ অহঙ্কারের শিখরে, মুখনিঃসৃত কথাই শেষ কথা, পৃথিবীর বাকিদের জন্য ফরমান।
সদ্য স্বাধীন দ্বিখণ্ডিত ভারত নয়, টুকরো টুকরো দীর্ণ ভারতে (বিভিন্ন প্রিন্সলে স্টেটের দৌলতে) সামাজিক অবস্থান, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো, পরিষেবা, মিলিটারি ক্ষমতা ইত্যাদি হাজারো নেই এর লম্বা ফিরিস্তি আর তা নিয়ে গর্ব করার মত কিছুই ছিল না তবুও জাতীয়তাবাদে ঘাটতি ছিল না কোন ভারতীয়র। কোন ভারতীয়র ছিল না সুইস ব্যাঙ্কে জমানো টাকা বা দেশে বিদেশে গোপন সম্পদের পাহাড়, ছিল সুগভীর আত্মোপলব্ধি আর গর্ববোধ ছিল জাতিকে নিয়ে, দেশ ছিল শুধু তার বহিঃপ্রকাশ।
ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির ফলে খণ্ডিত ভারত সাম্প্রদায়িক বিষবাস্পে জর্জরিত হয়ে এসেছে বরাবর আর আজকের ভারতও চরম উগ্রপন্থার শিকার। সেই কোন মুদ্দত থেকে আমরা হেঁকে চলেছি ‘ভারত মানবতার আর এক নাম’, তার মেলা কারনও ছিল। বিভেদ কিছু ছিলই তবে আজকের মত জাতের নামে চোরাস্রোত বইত না রন্ধ্রে রন্ধ্রে, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থসিদ্ধির নামে পরিকল্পনা মাফিক বিষ গাছ বপন করাও নয়। সাদাসিদে কিংবা অশিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত, শিক্ষিত সব মানুষের মনে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের বিষ নিশ্চিতভাবেই আর্সেনিকের বিষের চাইতেও মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে বাধ্য। যে ভারতকে আমরা চিনি স্বামী বিবেকানন্দের জীবন আর লেখার ছত্রে ছত্রে যেখানে ব্রাহ্মন থেকে চণ্ডাল, আপামর ভারতবাসী তাঁর ভাই, বিভিন্ন জাত আর পেশার মানুষ তাঁর স্বপ্নের ভারতের ধমনীতে বয়ে চলা রক্তস্রোত। ব্রিটিশের অধীন ভৌগলিক ভূমিখন্ড ভারতের মুক্তির চাইতে তাঁর কাছে বেশী জরুরী ছিল জাতির অভ্যন্তরে ঘুনপোকার মত ভিতর থেকে ক্ষয় করে চলা জাতপাতের লড়াই তাই অভিশাপ দেওয়ার মত করে সাবধান করে দিয়ে গেছেন আত্মম্ভরি উচ্চবর্ণের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পরামর্শ দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের গলাতেও সেই সুর মিলে গেছে, ‘মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান’।
বিশ্বায়নের যুগে চেতনার লোপ না পেলেও বিস্তর ক্ষয় ক্ষতির প্রমাদ গুনছে চেতনার তাড়নায় রাতের ঘুম হারাম করা ভারতবাসী। সামাজিক মূল্যবোধের অধঃপতন থাবা বসিয়েছে আমাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনাতেও। সংস্কৃতির অবক্ষয় এগিয়ে চলার পথে অবশ্যম্ভাবী কিন্তু চলমান ক’বছরে চেতনার সামগ্রিক পতন এককথায় বিস্ময়কর। যেখানে পারিবারিক শ্রদ্ধা-ভালবাসার জায়গায় টান পড়েছে অন্তরজালের যুগে সেখানে জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যের ঝাণ্ডা ধরার চওড়া কাঁধ কোথায়? আজকের বস্তুতান্ত্রিক স্বার্থবাদের যুগে অহম এক বিশাল সমস্যা। প্রকৃত জাতীয়তাবাদ তাই দূরবীন লাগিয়ে খুঁজতে হয়।
আধুনিককালে ভারতের যে চেতনার মিউটেশন বা পরিব্যপ্তি ঘটেছে তা কি অতীতের বহুযুগ ধরে বহমান চেতনার শর্টকাট রুট? আমরা কি আবার মধ্যযুগে ফিরে যেতে চাই রেট্রোগেশিভ ইভোলিউশনের মাধ্যমে? আমরা কি কোনদিন অবসর মত বসে ভেবে দেখব না যে ধর্ম নিয়ে আমরা মাতোয়ারা সেই ধর্ম জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কোন কাজে আসে? ধর্ম বাদ দিয়ে কি মানুষ বেঁচে নেই? বেঁচে থাকতে পারে না? মেকি জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের জিগির তুলে হানাহানি কাটাকাটি ঘরে ঘরে, লুটপাট, ধর্ষণ, যুদ্ধের জয়-পরাজয়? ব্রিটিশের পলিশি সামান্য পরিবর্তন করে ‘পোলারাইজ অ্যান্ড রুল’? আমি জাতীয়তাবাদী, আমার কাছে যাহা পুরান তাই বিজ্ঞান, আমার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হও, হয় আমার পেছনে দাঁড়াও নয়তো উল্টো দিকে দাঁড়াও, গনতন্ত্র আর সংখ্যার গলার জোরে তোমাকে দেগে দিই দেশদ্রোহী বলে, আমার একটা শত্রু চাই এই মুহূর্তে, কাল্পনিক হলেও চলবে নইলে আর জয় আসবে কার বিরুদ্ধে? জয়ের আস্ফালনের মধ্যে দিয়ে বাকি সমস্ত চেতনা, প্রয়োজনীয়তা, উন্নয়ন, এগিয়ে যাওয়া এসবই আমার কড়া ডোজের জাতীয়তাবাদের কাছে তুচ্ছ, আমাদের মধ্যে আর কোন ইস্যু নেই, নেই কোন লক্ষ্য।
এই একবিংশ শতাব্দীর দু’দশক শেষের মুখে আমদের চেতনাও কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে, বার বার চোখ কচলে নিজের চোখে দেখা অনাচার, দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি সব ঢোক গিলে কেমন যেন মেনে নিই, প্রতিবাদ তো নয়ই বরং অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত আর অহংকারী সেই সব কেষ্টবিষ্টুদের পিছনে ভিড় বাড়াই, হাঁটতে হাঁটতে গলা চিরে আকাশের দিকে হাত ছুঁড়ে আস্ফালন করি, সমর্থন জোগাই আমাদের সেই অসাড় চেতনাকে মেরে ফেলে।
বিপ্রতীপ আশা, ভারতের চেতনার উন্মেষ ঘটবে ঠোক্কর খেতে খেতে, আবার একটা রাঙা সূর্য উঠবে গাঢ় নীল আকাশে, জন্ম হবে কোন এক মহামানবের, মন চাইবে, ‘দেবতা এদেশে মানুষ হয়েছে জানি, মানুষকে দেখি গনদেবতার বেশে’।
Last year this article was published in the ‘Desh’ Patrika on 17.05.2019 as the cover story.

বিঃদ্রঃ – গত বছরে আজকের দিনে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কপিটি সময়ের সাথে আজও এই লেখাটি সমসাময়িক

Leave a Reply

Your email address will not be published.