করোনায় যাত্রামঞ্চে লক্ষাধিক শিল্পী অর্থনৈতিক সংকটে

প্রশাসন

জ্যোতিপ্রকাশ মুখার্জি


মঞ্চে জ্বলছে মৃদু আলো। মঞ্চের সামনে বসে আছে হাজার হাজার উৎসুক দর্শক। কেউ কেউ ইতস্ততঃ ছড়িয়ে।ওদিকে ঘোষক তারস্বরে চিৎকার করে যাচ্ছে – আর কিছুক্ষণ পর শুরু হতে চলেছে…। ‘ঢং’ করে বেজে উঠল ঘণ্টা। মিউজিকের তালে তালে মঞ্চে চলছে রঙিন আলোর খেলা।ধীরে ধীরে মঞ্চে হাজির হচ্ছেন যাত্রার শিল্পীরা। দৃশ্যের পর দৃশ্যে, রাতের পর রাত প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে হাজার হাজার দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মত উপভোগ করছে শিল্পীদের অভিনয়।
কিন্তু লকডাউনের জন্য আর পাঁচটা শিল্পের মত বড় বিপন্ন যাত্রা শিল্প – ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিল্প, যার মাধ্যমে শুধু লোকশিক্ষা হয়না বহু মানুষের কর্মসংস্হানও হয়।
‘ষষ্ঠি থেকে জষ্ঠি’ অর্থাৎ ষষ্ঠির দিন থেকে যাত্রা দল নিয়ে দল মালিকরা বের হলেও মূলত চৈত্র, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ – এই তিন মাস দলগুলির ব্যবসা চরম পর্যায়ে ওঠে। কিন্তু লকডাউনের জন্য এবার বাতিল হয়ে গেল একের পর এক ‘বুকিং’। অন্ধকার নেমে এল যাত্রা শিল্পে। সেই সঙ্গে রোজগার হারিয়ে সমস্যায় পড়ে গেল কয়েক হাজার শিল্পী, কলাকুশলী।
একসময় যাত্রা জগত বলতে মূলত চিৎপুরকেই বোঝাত। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেদিনীপুরের নন্দকুমার ও বেলদায়,পুরুলিয়া, বাঁকুড়া জেলাতেও গড়ে উঠল অনেকগুলো পেশাদার যাত্রা দল। সংখ্যাটা ১০০ এর বেশি। প্রতিটি দলে অভিনেতা-অভিনেত্রী, যন্ত্রশিল্পী, লাইটম্যান এবং অন্যান্য সাহায্যকারী কর্মী নিয়ে প্রায় ৪০ জন করে সদস্য থাকে।অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্প থেকে প্রায় পাঁচ হাজারটি পরিবারের অন্নসংস্হান হয়।এছাড়া পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্হানের ব্যবস্থা করেছে যাত্রা শিল্প।
এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দলমালিক ও শিল্পীদের। ‘শো’ শুরুর আগেই দলমালিকরা শিল্পীদের সঙ্গে আর্থিক চুক্তি, মহড়া, প্রচার ইত্যাদি বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা আগাম বিনিয়োগ করে। পরে সেই টাকা ধীরে ধীরে উঠে আসে। কিন্তু এবার লকডাউনের জন্য মূল সময়েই ‘শো’ বন্ধ। স্বাভাবিক ভাবেই বিনিয়োগ করা অর্থ তারা ফেরত পাননি এবং পাওয়ার সম্ভাবনাও নাই। একে আর্থিক সঙ্কট তার উপর নিয়মের বেড়াজালে পড়ে কতজন মালিক নতুন ‘সিজনে’ দল চালাতে পারবে সেই বিষয়ে অনেকের মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
কথা হচ্ছিল বিশিষ্ট প্রযোজিকা তথা অভিনেত্রী মলিনা দেবীর সঙ্গে। তিনি বললেন – ‘শো’ না হওয়ার জন্য চুক্তি ভিত্তিক শিল্পীদের কাছে টাকা ফেরত নেওয়া সম্ভব নয়। আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য নতুন ‘সিজন’এ অর্থ বিনিয়োগ করা যেমন ঝুঁকির তেমনি সামর্থ্যও নাই। একই সুর শোনা গেল মেঘদূত গঙ্গোপাধ্যায় সহ বেশ কয়েকজন প্রযোজকের কণ্ঠে। তাদের বক্তব্য – সরকার যদি প্রযোজকদের আর্থিক সাহায্য করে তাহলে নতুন বছরের জন্য আবার দল গঠন করা যাবে।
‘শো’ বন্ধ থাকায় ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ শিল্পীরা বেতন পাচ্ছেনা। এদের অনেকেরই বিকল্প আয়ের উৎস নাই। ফলে চুক্তি ভিত্তিক শিল্পীদের সঙ্গে এদেরও সংসার প্রতিপালন করা কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
সিরিয়ালের অভিনেত্রী সুব্রতা হালদার বেশ কয়েকবছর ধরে যাত্রা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বললেন – ‘শো’ বাতিলের জন্য আমাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ। আমাদের এমন একটা ‘ইমেজ’ গড়ে উঠেছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে ত্রাণও নিতে পারছিনা। ফলে ‘পেটে ক্ষিদে মুখে লাজ’ নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জানিনা আর কতদিন এভাবে বেঁচে থাকতে পারব। সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা অরণ্যদেব যাত্রা সূত্রে কলকাতায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন। যাত্রা ছাড়া তার অন্য কোনো আয় নাই,যাত্রাই তার ধ্যান-জ্ঞান। তিনি জানেন না আগামী দিনে তিনি এবং তার মত অন্য শিল্পীরা কিভাবে বাড়ি ভাড়া দেবেন বা সংসার চালাবেন।
অর্থাৎ সবমিলিয়ে যাত্রা জগতের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলী ও প্রযোজকদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। বর্তমান রাজ্য সরকার যাত্রা শিল্পের উন্নতির জন্য দুস্থ শিল্পীদের ভাতা সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন।মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জ্জীর সক্রিয় সহযোগিতার জন্য অনেক দিনের অন্ধকার কাটিয়ে যাত্রা শিল্প আবার ধীরে ধীরে আলোর দিকে ফিরছিল।অনেক শিল্পীর বক্তব্য এই সময় সবার প্রিয় ‘দিদি’ যদি তাদেরকে মাসে মাসে সামান্য আর্থিক সাহায্য করে তাহলে অনেকগুলি পরিবার বেঁচে যাবে।আবার আর্থিক সাহায্য পেয়ে প্রযোজকরা নতুন করে যাত্রা প্রযোজনা করার উৎসাহ পাবে।
অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী কুমার অভিনন্দন বললেন – অচিরেই করোনা আতঙ্ক কেটে যাবে। আবার আমরা মঞ্চে উঠে হাজার হাজার দর্শকের সামনে অভিনয় করার সুযোগ পাব।কিন্তু বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে প্রযোজক সহ সমস্ত শিল্পীরা কিভাবে আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে তারজন্য সবাই মিলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পথ খুঁজে বের করুক। নাহলে নতুন প্রজন্ম আর এই প্রাচীন লোকশিল্পে অংশগ্রহণ করবেনা। চোরাবালির অন্ধকারে তলিয়ে যাবে এই শিল্প।
সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে যাত্রা দলেরই একটি সংগঠন বেশ কয়েকজন শিল্পীর হাতে কিছু করে আর্থিক সাহায্য তুলে দিয়েছে এবং আগামীদিনে আরও কিছু শিল্পীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.