কাঠকয়লার টুকরো দিয়ে আঁকে সুন্দর ছবি

প্রশাসন

জ্যোতিপ্রকাশ মুখার্জি


বাংলার নানান প্রান্তে ছড়িয়ে আছে প্রচুর প্রতিভা। টিভি চ্যানেলগুলির রিয়েলিটি শো-এর জন্য ইতিমধ্যেই আমরা বহু প্রতিভার সন্ধান পেয়েছি। যদিও সেগুলি মূলত নৃত্য,সঙ্গীত বা কমেডি শো। এর বাইরেও আরও অনেক প্রতিভা প্রচারের আলোয় আসতে না-পেরে অবহেলার অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। এরকমই এক বিরল প্রতিভা পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের বনাই দত্ত।
মা-বাবার একমাত্র সন্তান বনাই এর আসল বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের গলসীর আদ্রাহাটিতে। বাবা জগন্নাথ দত্ত দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। মেয়ে বড় হলে তার পড়াশোনার সুবিধার্থে জগন্নাথ বাবু সপরিবারে দুর্গাপুরে এসে বসবাস শুরু করেন।মা নারায়ণী দত্ত সামান্য একজন গৃহবধূ।
কম্পিউটার সায়েন্সের মাস্টার ডিগ্রিধারী বনাই এর ছোট বয়স থেকেই কারুশিল্পের প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। হাতের সামনে চক, পেনসিল বা কাঠকয়লার টুকরো যেটাই পেত সেটা দিয়েই ঘরের মেঝেতে এঁকে ফেলত সুন্দর সুন্দর ছবি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে ঠাকুর-দেবতা বা প্রকৃতির বিভিন্ন দৃশ্য ছিল তার আঁকার বিষয়। আবার অনেক সময় কাগজ কেটে আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করে ফেলত সুন্দর সুন্দর ফুল।ঘর নোংরা করার জন্য বাচ্চা মেয়ে বনাই এর কপালে বরাদ্দ ছিল মায়ের নিত্য বকুনি। মেয়ের আগ্রহ দেখে জগন্নাথ বাবু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বনাই এর জন্য এক অঙ্কন শিক্ষিকা নিয়োগ করেন।শুরু হয় তার আনুষ্ঠানিক অঙ্কন শিক্ষা।
কিন্তু প্রথাগত শিক্ষার বাইরেও নিজের খুশিতে এঁকে চলে বনাই। রং-তুলি ধরতে শেখার পর মাটির ছোট ছোট ‘সরা’ বা হাঁড়ির উপর ফুটে ওঠে তার শিল্পকর্ম। তার দক্ষতা দেখে গ্রামের অনেক পুজো বা বিবাহ মণ্ডপ সাজাতে ডাক পড়ে বনাই এর।
সদা হাস্যময়ী শান্ত স্বভাবের বনাই এর নৃত্য শিল্পী হিসেবেও যথেষ্ট পরিচিতি আছে। পাড়ার বা স্কুল-কলেজের যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তার একটা আলাদা ভূমিকা থাকতই।
বি.এড সম্পূর্ণ করে আপাতত চাকরি না পাওয়া গৃহশিক্ষিকা বনাই এর বড় ইচ্ছে কারুশিল্প যেন বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত হোক কারুশিল্পের প্রদর্শনী যেখানে তার মত শিল্পীরা নিজেদের সৃষ্টি সবার সামনে তুলে ধরতে পারবে। টিভি চ্যানেলগুলি তার মত শিল্পীদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করুক রিয়েলিটি শো।
বনাই এর কাছে আঁকা শেখে গুসকরার সৌরাশিস ব্যানার্জ্জী। সেতো তার ‘দিদি’র মিষ্টি ব্যবহারে মুগ্ধ। ছোট থেকে দেখে আসা দুর্গাপুরের অরিন্দম বাবুতো বনাই এর ব্যবহার ও প্রতিভায় মুগ্ধ। তিনি বললেন – একটু সুযোগ পেলে এরাই হয়তো একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।সরকার অন্তত একবার এদের কথা ভাবুক।সুযোগ করে দিক তাদের প্রতিভার ডালি তুলে ধরার।
আর পাঁচজন মায়ের মত নারায়ণী দেবী প্রথমে কারুশিল্পের প্রতি মেয়ের আগ্রহ মেনে নিতে পারেননি। তিনিও চেয়েছিলেন মেয়ে ভাল করে পড়াশোনা করুক। কিন্তু কারুশিল্পের পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি মেয়ের আগ্রহ দেখে তিনি আর কিছু বলেননি। পরে তিনিই মেয়ের বড় উৎসাহদাত্রী হয়ে ওঠেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.