এখানে জগদ্ধাত্রী পুজো গিন্নি মা নামে পরিচিত

ক্রীড়া সংস্কৃতি

জ্যোতিপ্রকাশ মুখার্জি


রংবাহারি আলোর খেলা এবং প্রচারের সমস্ত সার্চ লাইট যখন চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর উপর তখন চন্দননগর থেকে সামান্য দূরে রানাঘাটের ঘটক বাড়ির জগদ্ধাত্রী
“গিন্নি মা”এর পুজো হচ্ছে খুবই সাধারণ পরিবেশে। এখানে জগদ্ধাত্রী “গিন্নি মা” নামেই পরিচিত। এখানে নাই কোনো রঙিন আলোর খেলা।প্রচারের আলো না থাকলেও ঘটক বাড়ির পারিবারিক পুজো প্রায় চারশো বছর ধরে চলে আসছে । অবশ্য পুজো প্রথম শুরু হয় ব্রহ্মশাসন গ্রামে।তারপর ঘটক পরিবার এই পুজো রানাঘাটে নিয়ে আসেন।
ঘটক পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে প্রায় ছয় পুরুষ আগে একদিন বাড়ির গৃহকর্তা ভোরবেলায় চূর্ণী নদীতে স্নান করতে যাওয়ার সময় বাড়ির উঠোনে অপরূপ সুন্দরী একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েকে খেলা করতে দেখেন। কিন্তু স্নান করে ফিরে এসে তিনি ঐ মেয়েটিকে আর দেখতে পান নি। ওইদিনই রাতের বেলায় মা জগদ্ধাত্রীর স্বপ্নাদেশ হয় এবং তখন থেকেই ঘটক বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন
হয় । স্বপ্নে জগদ্ধাত্রী দেবীর বাহন হিসেবে একটি ঘোড়ার রূপ দেখা যায়,তাই দেবীর বাহন হিসেবে ঘোড়া রেখে দেওয়া হয়। আরও জানা গেল একই পরিবারের সদস্যরা দেবীর মূর্তি তৈরি, দেবীকে শোলার সাজে সাজান, ঢাকি, বলিদান সবই বংশ পরম্পরায় করে চলেছে।
প্রথমদিকে জগদ্ধাত্রীর বীজ মন্ত্রে যারা দীক্ষিত তারাই পুজো করতেন। সাধকদের দ্বারা পূজিত হতেন গিন্নি মার পুজোর প্রচার সেভাবে হয় নাই । রাজ্যের সর্বত্র জগদ্ধাত্রী দেবীর কুমারী পুজো পুরুষ পুরোহিতরা করলেও ঘটক বাড়ির এই কুমারী পুজো করেন বাড়ির মহিলারা। সারা ভারতবর্ষে মাত্র পাঁচটি জায়গায় মহিলারা কুমারী পুজো করেন।এখানকার পুজোর আরেকটি অভিনবত্ব হলো ধুনো জ্বালানো।পুজোয় পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক মহিলারা তিনটি মাটির সরার মধ্যে একটি মাথায় এবং বাকি দুটি দুই হাতের রেখে ধুনো জ্বালিয়ে পা জোর করে বসে থাকেন।সবশেষে বাচ্চারা এসে তাদের কোলে এসে বসে এবং তাদের আশীর্বাদ নেয়। ঘটক বংশের পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও এই পুজোর রীতিমত অংশ নেন।পারিবারিক পুজো হলেও মায়ের এই পুজোয় আশেপাশে পরিবারগুলোও অংশগ্রহণ করে। কর্মসূত্রে ঘটক বাড়ির বিভিন্ন সদস্য গ্রামের বাইরে থাকলেও পুজোর সময় সবাই গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে। ৮ থেকে ৮০ প্রায় ৫০ জন সদস্য মেতে ওঠে বাঁধনহারা পুজোর আনন্দে।
পরিবারের অন্যতম প্রবীণ সদস্য প্রশান্ত বাবু বললেন – তাদের পুজোয় আলোর রোশনাই বা প্রচারের আলো না থাকলেও আছে আন্তরিকতা। পুজো হয়ে ওঠে তাদের পরিবারের বাৎসরিক মিলনক্ষেত্র। মনে হয় বাড়ির “গিন্নি মা” যেন সবাইকে বাড়িতে টেনে আনছেন। তবে তার আপশোস আর্থিক কারণে তাদের বহু প্রাচীন এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরটি তারা সংস্কার করতে পারছেন না। যদি সরকার বা কোনো সহৃদয় ব্যক্তি মন্দিরটি সংস্কারের ব্যবস্হা করেন তাহলে এটি রানাঘাটের একটা ঐতিহ্য হয়ে উঠতে পারে।
ঘটক পরিবারের মেয়ে এবং কলকাতার মুখার্জ্জী পরিবারের বধূ জয়শ্রী দেবী বললেন – বয়সজনিত কারণে বাপের বাড়ি যাওয়া না হলেও “গিন্নি মা” -র পুজোতে বাপের বাড়ি যেতে ভুল হয় না। কারণ এতো শুধু পুজো নয় আমাদের পুনর্মিলন ক্ষেত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.