ক্রীড়া সংস্কৃতি

খাজিম আহমেদ এর আধ ডজন প্রবন্ধ প্রসঙ্গে

খাজিম আহমেদ-এর আধ ডজন প্রবন্ধ প্রসঙ্গে

ফারুক আহমেদ

কলকাতা কেন্দ্রিক পশ্চিমবাঙলা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা আর দৈনিক সংবাদপত্র পাঠ আমার প্রাত্যহিক অভ্যাসের মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে বিশেষ এক ‘সাংস্কৃতিক আনন্দ’ অনুভব করি।

প্রায় তিনদশক ধরে ‘কলম’ পত্রিকার নানান পর্যায় পেরিয়ে জনাব আহমদ হাসান ইমরান দেশ-বিভাগ পরবর্তী পশ্চিমবাঙলায় প্রথম মুসলমান ভাবানুষঙ্গ নির্ভর একটি যথার্থ দৈনিক সংবাদ পত্র ‘পুবের কলম’ প্রকাশ করে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে একটি বড়মাপের কুর্নিশ পেশ করা হচ্ছে। একজন সফল সম্পাদকের দায়িত্ব হচ্ছে, দেশ-দশ আর জাতির মঙ্গলের জন্য সঠিক দিশার হদিশ দেওয়া। এমন জরুরী বিষয় সার্থক হয়ে ওঠে তখনই যখন তিনি একটি শক্তিশালী লেখক গোষ্ঠীর পত্তন করে দেন। ঠিক যেমন মওলানা আকরাম খাঁ, তাঁর জহুরি দৃষ্টিভঙ্গির মারফত, জাতির সামনে হাজির করেছিলেন জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দিন আর আবুল মনসুর আহমেদকে। জনাব নাসিরুদ্দিন (সওগাত) এবং মওলানা মুজিবুর রহমান (দ্য মুসলমান)ও একটি শিক্ষিত বৌদ্ধিক শ্রেণী সৃষ্টিতে তাঁদের জীবনপাত করেন। ইতিহাস তাদের এই অবদানকে ‘কলজের কুর্শি’তে স্থিত করে রেখেছে। একটি ‘কঠোরভাবে একেশ্বরবাদী’ উপেক্ষিত জাতিসত্তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁরা ‘জেহাদি’ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

বিভাগ-পরবর্তী পশ্চিমবাঙলায়, জনাব আহমদ হাসান ইমরান নির্যাতিত একটি ‘কওমের’ সামনে সটান দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, খাজিম আহমেদ নামক একজন ইতিহাসবেত্তা আর অনন্যসাধারণ প্রাবন্ধিককে, যিনি ‘মাসিক কলম’ এর বিশেষ সংখ্যাগুলিতে যে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ নির্মাণ করেছেন তা সংখ্যা-লঘিষ্ঠতা জনিত অস্বস্তিকাতরতায় আচ্ছন্ন বাঙালি মুসলমানদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ‘সাপ্তাহিক কলম’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলিতে প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহে খাজিম আহমেদ বিশাল অখন্ড বাঙালি সমাজের সামনে থেকে ‘অপরিচয়ের আড়াল’ দূর করে তাঁর স্বধর্মীদের চেতনায় ‘Sense of dignity’র বীজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তিনি অপ্রতিরোধ্য, তেজী, জেদী সৈনিকের মতো তাঁর ‘কলম’কে ‘তলোয়ার’- এ রূপান্তরিত করেছেন। ‘জুলুম’ আর উপেক্ষার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই। ‘ইনসাফ’এর প্রশ্নে প্রায় ৫৩ বছর তিনি লড়াই করছেন। ইসলাম আর মুসলমান সম্পর্কে বিশ্বের নানা প্রান্তে যে অনভিপ্রেত আর অবাঞ্ছিত ধারণা রয়েছে তা অপনোদনের জন্য অজস্র পত্রপত্রিকায় দুর্দমনীয় যুক্তির মারফত ফালাফালা করে দেখিয়েছেন।

অন্য দিকে বিভিন্ন সংখ্যায় ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ১ ডজন নানান বিষয়ে প্রবন্ধ তাঁকে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় করেছিল ওই সময়ে।

দৈনিক ‘পুবের কলম’ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পাঠক সজ্জনের দরবারে হাজির। হররোজ ‘পুবের কলম’ পাচ্ছি; হররোজ খাজিম আহমেদ গরহাজির। হতাশ হচ্ছি, বেদনায় ক্লিষ্ট হচ্ছি, বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হওয়া গেল, তিনি ‘ডেডলি ডিজিজে’-এ আক্রান্ত। মানুষটি তাঁর ব্যক্তিগত যুদ্ধজয় করে আবার দাঁড়িয়েছেন।

আহমদ হাসান ইমরান অসামান্য তৎপরতায় খাজিম আহমেদের বৌদ্ধিক জীবনকে শ্রদ্ধাভরে পুনরুজ্জীবিত করলেন। তাঁর প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, কেননা আমার প্রিয় লেখককে তিনি আবারও আলোর সামনে টেনে তুলেছেন। আমার বক্তব্যের সপক্ষে ‘নবুত’ পেশ করি, বিষযটি পরিষ্কার হবে।

খাজিম আহমেদ ‘ধর্মীয় সন্ত্রাস এবং মুসলমান’ (৪ জুন, ২০২০) শীর্ষক রচনায় প্রায় হাজার বছর ধরে লালিত একটি বদ্ধ ধারনার শিকড়কে সমূলে উৎপাটিত করেছেন। ইউরোপের খ্রিস্টিয় সন্ত্রাস আর ‘ভারতবর্ষীয়’ সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সন্ত্রাস যে মানব সভ্যতার ‘হন্তারক’ তা প্রমাণ করেছেন। ‘ইসলাম’কে নিষ্প্রভ করার কারসাজি ধোপে টেকেনি। লেখাটি পড়ে চমকে গেছি। আলোচনাটিতে জাস্টিস সৈয়দ আমির আলির মেধা ও মনন যেন খাজিম আহমেদের কলমে ফুটে উঠেছে। ‘দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’এর মর্মবস্তু স্মরণ করুন, বিষযটি অনুধাবন-যোগ্য হয়ে উঠবে।

‘কোথায় সেক্যুলারিজম’ (১৪ জুন, ২০২০) নামক আলোচনাটিতে খাজিম আহমেদ বিস্ফোরক হয়ে উঠলেন। বললেন, ১৯৯২-তে ঐতিহাসিক ‘ইন্দোসারাসেনিক’ স্থাপত্যের অন্যতম প্রতীক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে গেরুয়া শিবিরের সগর্জন উপস্থিতি তামাম দুনিয়া নজর করেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়ার মধ্যে বিশেষ একটি উদ্দেশ্য ক্রিয়াশীল ছিল– ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’-কে ধ্বংস করা। এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক জাতিসত্তার উপস্থিতিকে অস্বীকার করার সাম্প্রদায়িক হীনপ্রবনতা।‘

আর আপনি জনাব আহমদ হাসান ইমরান আলোচনাটির ‘ইলাসট্রেশন’-এর জন্য যে ছবি ব্যবহার করেছেন –শিহরিত হয়ে ওঠার সঙ্গত কারণ রয়েছে। ক্রন্দনরত অসহায় এক ‘আদম সন্তান’ হাত জোড় করে ‘জান ভিক্ষা’ চাইছেন, সামনে ফেট্টি বাঁধা এক যুবক, হাতে তার অত্যুচ্চ খোলা তলোয়ার। ভয়াবহ। প্রাবন্ধিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কোথায় সেক্যুলারিজম’! বস্তুত এই ভন্ডামির শেষ কোথায়?

১৮ জুন, ২০২০ প্রকাশিত এক অদ্ভুত আঁধার চারিদিক গ্রাস করেছে–অপ্রাপনীয় এক ‘Poetic Expression’। বহু মহাজন উচ্চারিত বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে ধ্বংস করে দিয়ে বর্তমান ‘ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠী’, প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, ‘একজাতি’ ‘একধর্ম’ ‘একভাষা’- কেন্দ্রিক ‘আইডিয়া’ যা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার কামনা করে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর দমনপীড়নের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা আর আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাজিম আহমেদ সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের ‘নকাব’ খুলে দিয়েছেন।

‘সাম্প্রদায়িকতাবাদের উৎস সন্ধানে’ (৪ জুলাই, ২০২০) শীর্ষক আলোচনায় খাজিম আহমেদ আধুনিক ভারতে সাম্প্রদায়িকতাবাদের উত্থানের ইতিহাস অতিসংক্ষেপে আলোচনা করেছেন, এ-বাবদে তিনি বরাত দিয়েছেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেকুলার ইতিহাসবেত্তা’ –অধ্যাপক বিপিনচন্দ্র-এর। জনাব আহমেদ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। মি: মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ-কে তিনি পেশ করেছেন দুর্দান্ত এক ‘প্রকাশ স্টাইল’-এ। যশোবন্তসিংহ ‘জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা’ নামক গ্রন্থে বলেছেন, কেতা দুরস্ত মহম্মদ আলি জিন্না’ ( পৃষ্ঠা : ৯, চিত্রসুটি)।

 ‘পুবের কলম’–পত্রিকায় ১২ জুলাই এবং ১৩ জুলাই দু' কিস্তিতে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জীবনদর্শন’ আর  ‘শিক্ষাদর্শন’– সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যসহকারে বিজ্ঞানাচার্যের ইসলাম প্রীতির প্রসঙ্গটি যথেষ্ট মর্যাদার সঙ্গে আলোচনা করেছেন জনাব খাজিম আহমেদ। দুর্দান্ত সাহসী একটি প্রশ্নও তুলেছেন। আচার্য রায় ব্রাক্ষ্ম ছিলেন।

হাল আমলে সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা তার ধর্ম বিশ্বাসের কারনেই কি তাঁকে উপেক্ষা করে আড়াল করে রেখেছেন। ব্রাহ্মন্যবাদী আর সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা বহু ‘অ্যায়রা- গ্যায়রা’ কে গুরুত্ববাহী ব্যাক্তিত্ব হিসাবে প্রতিভাত করার প্রয়াস বা ‘কোশেশ’–এ রয়েছে। অথচ ‘ভারতের কোনও বৃদ্ধঋষির নবীন মূর্তিই’- আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে অপাঙ্ক্তয় করে রেখেছে। প্রায় অনালোচিত একটি বিষয়কে খাজিম আহমেদ অত্যুজ্জ্বল করে তুলেছেন। তাঁর জন্য ‘শাহী মুবারক’। নিবন্ধের সঙ্গে জনাব ইমরান আচার্য রায়ের যে ছবিটি ছেপেছেন, ‘সুচতুর সংসারে যেন এক নির্লিপ্ত সন্যাসী’! খাজিম সাবাশী জানবেন। দেশ বিভাগ পরবর্তী পশ্চিমবাঙলার একটি উপেক্ষিত জাতিত্তার মর্যাদার অন্বেষক, খাজিম আহমেদের, ‘আধ ডজন’ অসাধারণ মূল্যবান ‘ডিসকোর্স’ প্রকাশের জন্য আপনাকে লাখোসালাম।

প্রবন্ধ চর্চায় তাঁর অনবদ্য শব্দ ব্যবহার বিষয়ে বিমুগ্ধ হই। “উদার আকাশ” প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে খাজিম আহমেদ-এর ঐতিহাসিক গ্রন্থ “পশ্চিমবাঙলার বাঙালি মুসলমান অন্তবিহীন সমস্যা” পাঠ করে পাঠক ইতিমধ্যেই সমৃদ্ধ হয়েছেন। প্রকাশিত হবে তাঁর আরও একটি মননশীল প্রবন্ধ সংকলন “বাঙালি মুসলমান : আপন ভুবনের সন্ধানে”। খাজিম আহমেদের প্রবন্ধ বারেবারে প্রত্যাশা করি। তাঁর দীর্ঘ সুস্থ জীবন কামনা করি।

ফারুকআহমেদ
গবেষক, ইতিহাস বিভাগ,
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *