অন্য পুজো – মুনমুন মুখার্জি

সাহিত্য বার্তা

মুনমুন মুখার্জি

রাত প্রায় সারে আটটা। হাওড়া থেকে কোল্ডফিল্ডে ফিরলাম আসানসোল। রবিবার তাও স্টেশনে খুব ভীড়। পাশের প্লাটফর্মে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও বাইরে দু’এক জন ছাড়া বিশেষ কেউ নেই। ভীড় এড়ানোর জন্য ও পাশ দিয়েই হাঁটা শুরু করলাম। কাছে যেতেই বুঝলাম ট্রেন মিলিটারীতে বোঝাই।
মহালয়া সবে পার হল, এর মধ্যেই ডাক পড়েছে তাই প্রায় সবার মুখ শুকনো। কেউ জানলা দিয়ে হতাশ হয়ে প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউবা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, যতটুকু সম্ভব বাংলার মাটিতে থাকা যায় এই আর কি — এগিয়ে যেতে যেতে দেখলাম এক জায়গায় একটি কম বয়সী ছেলে তার বাবা মার সাথে কথা বলতে বলতে বার বার ট্রেনে উঠতে গিয়েও নেমে আসছে। একবার মা তো একবার বাবা তাকে ডেকে বলছেন “এই শোন না এটা করবি, ওই কথাটা সব সময় খেয়াল রাখবি” ইত্যাদি নানা কথা।
কয়েকটি কামরা যেতেই লক্ষ্য হল একটা বছর ত্রিশের একটা ছেলে এক দৃষ্টিতে প্লাটফর্মের উপরের সিঁড়িতে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সেখানে একটা কম বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। শুধু তাকিয়ে আছে। মেয়েটিকে দেখে মনে হল হয়ত নতুন বিয়ে হয়েছে। হয়ত বিয়ের পর এটাই প্রথম পুজো। হয়ত পুজোতে পরবে বলে যে শাড়ি কিনেছিল সেটাই পরে এসেছে। হ্যাঁ সবটাই হয়ত, কারণ চোখ দেখে এর চেয়ে বেশি বুঝতে পারা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বেজে উঠেছে। ক্ষোভে হোক বা অভিমানেই হোক দুজনেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
ঠিক তখনই একটা বাচ্চার গলা শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাটা মায়ের কোল থেকে চেঁচিয়ে বলছে “তাড়াতাড়ি ফির…..বে, একসাথে ঠাকুর দেখতে যাব….। তুমি না থাকলে মা নিয়ে যায় না…। শুধু ঘরে বসে কাঁদে।” ট্রেন তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। বাচ্চাটার বাবা জোরে জোরে চিৎকার করে বলছে, “সাবধানে থাকবে… কাউকে জ্বালাতন কোরো না… মায়ের খেয়াল রাখবে… আমি কালি পুজোয় তোমার জন্য অনেক পটকা কিনে আনব…
ট্রেন এগিয়ে গেল কোনো অজানা ঠিকানায়। যারা অপেক্ষায় থাকল তাদের চোখ স্বপ্ন দেখে কবে আসবে সেই দিন, যেদিন আবার একসাথে দুর্গাপুজোর ছুটি ঠিক ছুটির মত কাটাবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published.