মুক্তি – মুনমুন মুখার্জি

সাহিত্য বার্তা

মুক্তি
মুনমুন মুখার্জি

আকাশে উড়তে উড়তে অনেক উঁচুতে উঠে গেল পেককাটি। মনের আনন্দে পুরো আকাশ উড়তে থাকে সে। একের পর এক হাত বদল হতে হতে সে ক্লান্ত। অনেকজন তাকে এত ভালবাসা দিতে চেয়েছে যে, ভালবাসার উপর তার বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। শুধু মনে পরছে সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে যে তাকে আর চাঁদিয়ালকে পরম মমতায় গড়ে তুলেছিল। এত সুন্দর করেছিল যে ছেলের বাবা তাদেরকে ছেলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেয়। ঘর থেকে নিয়ে আসার আগে ছোট্ট ছেলেটার কান্নায় তাদের চোখেও জল এনে দিয়েছিল।
হাত বদল হয়ে আজ আর একটা বাচ্চার কাছে ঠাঁই হয়েছে। সে সুতোয় মাঞ্জা দিয়ে পেটকাটিকে সেই সুতো দিয়ে বেঁধেছে। আজ তাকে লড়াইয়ের আকাশে নামানো হয়েছে। একবার নীচে তাকিয়ে দেখল বাচ্চাটাকে বড়রা নানা রকম নির্দেশ দিচ্ছে যাতে নিজের ঘুড়ি না কাটিয়েও অন্যের ঘুড়ি কাটা যায়, সাথে কিছু সঙ্গী সাথী আছে যারা ভোকাট্টা হলে দৌড়ে গিয়ে ধরতে পারে।
আশে পাশে কিছু ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে। সে আরও উঁচুতে উঠে থাকে। হটাৎ দেখতে পায় চাঁদিয়ালকে, বিষন্ন মুখে এদিক ওদিক উড়ছে। পেককাটি এগিয়ে যেতেই তাকে দেখতে পায়। অনেক দিন পরে দুই বন্ধুর দেখা হওয়ায় দুজনের কি আনন্দ। দুজনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। অনেক গল্প করে।
কিন্তু বিধি বাম। তারা কখন যে সুতোর জালে জড়িয়ে গেছে বুঝতে পারে নি। তাদের দুই মালিকের মধ্যে লেগে গেছে জেতার লড়াই। অন্যের ঘুড়িকে কাটতে তারা বদ্ধ পরিকর। ছোটদের হাত থেকে লাটাই এখন বড়দের হাতে। কখনো ডিল দিচ্ছে কখনো টান! ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে দুই বন্ধু ভয় পেয়ে গেল। আবার ছাড়াছাড়ি হবার আতঙ্কে দুজনের মুখ শুকিয়ে যায়। দুজনে দুজনকে শক্ত করে ধরে প্রতিজ্ঞা করে মরতে হয় একসাথে মরবে। দুজনে মিলে যুক্তি করে, নীচে থেকে যখন ডিল দেবে ওরা আরও উঁচুতে উঠে যাবে, আর যখন টানবে ওরা একে অপরের থেকে দূরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে — যাতে দুজনেই সুতো ছিঁড়ে মুক্ত হতে পারে। যেমন ভাবা অমনি কাজ। উঁচুতে উঠতে উঠতে দুজনে দুজনকে শক্ত করেট পেঁচিয়ে নেয়, তারপর প্রাণপণে টান দেয়। শেষ পর্যন্ত তাদের চেষ্টা সফল হয়। দুজনেই সুতোর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উড়তে থাকে অজানা ঠিকানার উদ্দেশ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.