আত্মদর্পণ – সুমিতা মুখোপাধ্যায়

সাহিত্য বার্তা

আত্মদর্পণ – সুমিতা মুখোপাধ্যায়

সময় প্রায় হয়ই না,আত্মদর্পণে ডুব দিতে,আগের দিতে রাতের বেলায় আমার মনের গ্রীনরুমে ঢুকলাম।বেশ অন্ধকার, কোনো এক ফাঁক থেকে একটু আলোর আভা আসছে,আমি সেই দিকেই উৎসুক হয়ে গেলাম।আসলে আমার মনের গ্রীনরুমে অনেক কালো আঁধারে কালো কালো স্মৃতি কে বাক্সবন্দি করে রেখেছি,খুব সজাগ থাকি যাতে সেখানে আলো না পৌঁছায়।হয়তো ভয় হয়,আলোর উৎসে কিলবিল করে আমার মনের আঁধারে লুকানো ঘটনাগুলি যদি আলোর স্রোতে বেরিয়ে আসে,তাহলে আমার আবার খুব কষ্ট হবে।তাই হঠাৎ একটু চুঁইয়ে পরা আলোয় আমার বুকটা ধক্ করে উঠলো।
গেলাম,একটা সূক্ষ্ম ছিদ্র হয়েছে মনের গভীরে,সেইখান থেকেই আলো।আমি চেষ্টা করলাম,ছিদ্রটাকে বন্ধ করতে,কিন্তু পারলাম না,আরো বৃহৎ আকার ধারণ করলো,যেন আমাতে আমি নেই,কেউ আমাকে চালনা করছেন,কিছুটা স্তম্ভিত হলাম।একটু বসলাম।তারপর মাথায় এলো,আরে মনের দর্পণে ধুলো গুলো পরিস্কার করি,আলোটা কাজে লাগলো।বেশ করে ঝেড়ে আলোর দিকে আয়না টাকে রেখে আমি বসলাম উল্টো দিকে।আয়নায় আলোটা প্রতিফলিত হয়ে আমার মুখে,আমি স্পষ্ট দেখতে পারছি নিজেকে, প্রথমে আমি চিনতে পারিনি,একটু ভয় পেয়েছিলাম,একার মুখ,কোনো দর্পণ অশরীরির নয় তো! কপালে কাটা দাগটা আমায় চেনালো,হুম এটাই আমি।একদম,গোটা মুখে আমার ডানহাতের আঙুল গুলি ছুঁইয়ে চলেছি।অনুভব করছি স্পর্শের,তবে কোনো তবে অনুভূতিরা খেলা করছে না।অবাক কাণ্ড! কতো দিন এই আত্মদর্পণে মুখ রাখিনি,আজ রাখলাম।
এক এক করে দর্পণ কে প্রশ্ন করতে লাগলাম…দর্পণ মাঝে মাঝেই খিল খিল করে হেসে উঠলো,আমার আবার অভিমানও হচ্ছিলো,কিন্তু কী করবো? উপায় না দেখে বললাম,দেখো আমার সময় বেশী নেই,তুমি আমাকে সঠিক উত্তর দাও দেখি…….
প্রথমেই আমার প্রশ্ন,আমি এতো কুৎসিত কেনো? কারণ বলবে? দর্পণের উত্তর,তুমি নিজেকে যেমন দেখতে চাইবে,তেমনই তো দেখবে না কী!
মানে? আমি কতো সুন্দর সাজি,কতো মাথা ঘামিয়ে নিজেকে সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করি,আর তুমি বলছো এইরকম!!!
দর্পণ আর হাসলো না,বললো আসলে কী জানো,মনের গভীরে তুমি অনেক কিছু ইচ্ছা কে খুন করে রেখে দিয়েছো,তাই তোমার সর্বদা ভয় হয়।আর সেই ভয় থেকেই এখানে তুমি ভয়ার্ত মূর্তি দেখছো। আমি বললাম হুম,তাই হয়তো….
আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন,আচ্ছা দর্পণ বলো তো আমি মাঝে মাঝে খুব রেগে যাই,কেনো??
দর্পণের উত্তর…আরে রেগে যাও,রাগের বহিঃপ্রকাশ তুমি তেমন করো না,ঢোক গিলে অন্তর মহলে স্থাপন করো,এখন সেগুলো তোমার ভিতরে কঠিন পাষাণের মতো বুকে চেপে আছে,একটু একটু করে ভাঙো বুঝলে,ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আস্তে আস্তে বার করে দাও।পারবে? আমি সাহায্য করবো।আমি বললাম তা কেমন? দর্পণ বললো রোজ একটু সময় করে এই ঘরে এসো।তাহলেই সব বলে দেবো।আমি বেশ বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লাম।বেশ তাই হবে।
এবার আমার প্রশ্ন, আচ্ছা আমি বড়ো অভিমানী কেনো? খুব কষ্ট পাই,যেন….খুব কাছের মানুষদের কাছ থেকে,আমি ভাবতেও পারি না।
এবার দর্পণ বললো,আরে ঐ যে বললে না, ভাবতেও পারো না,ওখানেই গণ্ডগোল!! হুম,জীবনে নিজের কর্তব্য করবে,কিন্তু কারোর প্রতি কোনো আশারাখবে না।আশা করলেই মরেছো।অভিমান করবে,তার ওপর যে অভিমান কী, সেটা বুঝবে।না হলে রাতের পর রাত নিজের মাথার বালিশ ভিজিয়ে কী হবে? তবে হবে,যদি কেউ তোমার অভিমানের সমঝদার হয়,সে তোমাকে আদরে সোহাগে সব অভিমান ভুলিয়ে দেবে।বুঝলে বুদ্ধু মেয়ে,বলেই যেন দর্পন আমার নাকটা একটু টিপে দিয়ে মাথাটা নাড়িয়ে দিলো।আমি তখন বেশ হেসে উঠলাম।
পরের প্রশ্ন দর্পন,আমি সব মানুষ কে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে ফেলি জানো,খুব আপন ভাবতে শুরু করি,কারোর দোষ কী খুঁজে বারকরার চেষ্টাও করি না। সবার মধ্যে ভালোদিকগুলো বোঝার চেষ্টা করি,কিন্তু কিছু সময় অতিবাহিত হলে বেশ কিছু মানুষের কাছ থেকে আমি উপলব্ধি করি,আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে আমাকে ব্যবহার করলো,খুব কষ্ট লাগে জানো,খুব কষ্ট।
দর্পণ আবার বললো,ঐ তো,একই কথা,প্রত্যাশা তোমার বেশী,তুমি মনে করো,সবাই তোমার মতো হবে,আসলে তো কেউ কারোর মতো নয় গো।আজকের পর থেকে কঠিন কাজ মানুষ চেনার পদ্ধতির পাঠ শুরু করবো,তবে তোমাকে কথা দিতে হবে,রোজ সময় করে এই মহলে তোমাকে আসতে হবে। না হলে কিন্তু তুমি তোমার কষ্টের বোঝা আরো বাড়িয়ে একেবারে মাটিতে মিশে যাবে।ভেবে দেখো।
জানো দর্পণ,এখন আমার এমন হয়েছে যে কিছুই ভালো লাগে না,কেনো গো?
দর্পণতল এবার একটু উঠলো,আমি বেশ বুঝলাম,হুম ঠিক তাই,এবার আবার আমার মুখ দেখা যাচ্ছে……..
আশ্চর্য! আশ্চর্য! আমার মুখটা অনেকটা স্বচ্ছ,শান্ত,স্নিগ্ধ লাগছে,কাটা দাগ থাকলেও,দাগটারও সৌন্দর্য আছে বুঝলাম।
আমি একটু অভিভূত হয়ে দুই হাত গালে মাথায় স্পর্শ করলাম,আনন্দের শিহরণ জেগে উঠলো,মনে হলো এই আলোআঁধারি আমার একান্ত অন্তরমহলে নূপুরধ্বনি এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সুর,তাল,লয় নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে,আস্তে আস্তে আলোর রশ্মিটা বাড়ছে,গোপন সিন্ধুকের চাবির গোছা নাচছে,সিন্ধুক খানির ডালা খুলতে বলছে যেন, এমন সময়,আত্মদর্পণ খুব আবেগের স্বরে বলে উঠলো…” ভালোবাসি ভালোবাসি তোমায়” আরে আগে নিজেকে একটু ভালোবাসো,তবে তুমি সবাই কে ভালোবাসতে পারবে,আর সমস্ত মনখারাপি রা ভালোবাসার পদতলে নত হবে।
ভয় পেয়ো না,এগিয়ে চলো নিজের মতো,সমাজে তোমার কর্তব্য সঠিক ভাবে পালন করো,সব উধাও,তুমি তখন অনন্যা।
মনভরে গেলো,প্রাণ জুড়িয়ে গেলো দর্পণ,আমি সত্যি আসবো তোমার কাছে,আমার বিবেকের দর্পণ,তোমাকে অনেক ভালোবাসা।
ঠিক তখনই সেই ধূলিমাখা ঘরেই,বেশ একটু বেশী আলোকিত ঘরেই আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আনন্দের শিহরণে নেচে উঠলো…আর গলা ছেড়ে গাইলাম…” হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে,ময়ুরের মতো নাচে রে…”

আমার
আমাদের প্রত্যেকেরই আমাদের অন্তরমহলে প্রবেশ করে আত্মদর্পণে কথা বলতেই হবে।তাহলে আমরা এই নাগরিক যন্ত্র সভ্যতার যুগে ইঁদুর দৌড়ে প্রথম না হয়ে,শান্তির স্বস্তির শ্বাস গ্রহণ করতে পারবো।নিজে ভালোথাকবো,অন্যকেও ভালো রাখতে পারবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.