রাধার নীরব কান্না – ছবি কর

সাহিত্য বার্তা

রাধার নীরব কান্না

ছবি কর

মথুরার রাজা কংসের রাজদরবার থেকে অক্রূর গোকুল গ্রামে এসেছেন কৃষ্ণ আর বলরামকে নিতে। অর্থ্যাৎ কৃষ্ণের এবার বাললীলা ও কৈশোর লীলা শেষ করে কর্মলীলার সূচনাকাল ।

কর্মজীবনে মনের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । বৃহৎ কর্তব্যের সামনে ব্যক্তিগত জীবন তুচ্ছ । কাল সকালেই মথুরার উদ্দ্যেশে যাত্রা করতে হবে । সামনে বিশাল কর্মযজ্ঞ । হয়তো আর কখনো গোকুলের মাঠ কিংবা বৃন্দাবনের গলিতে আসার সময় পাবেননা ।

কৃষ্ণের মন চঞ্চল হয়ে উঠলো ॥ রাতে বিছনায় ছটফট করতে লাগলো । কিছুতেই ঘুম আসছেনা । মনে পরছে গোপ বালকদের সাথে তার খেলা , দুষ্টুমিপনা । গোপ বালিকাদের সাথে সখ্যতা ..তাদের নির্ভেজাল প্রেম । সব ছেড়ে কর্তব্য কর্মের পথ বেছে নিতে হবে । কৃষ্ণের চোখে জল । কাঁদবে নাই বা কেন ?

তার প্রাণপ্রিয়া রাধিকাকে না দেখে কেমন করে কাটবে জীবন ? আর তার থেকেও বড় কষ্ট রাধিকা কিভাবে কানহা বিনা জীবন কাটাবে ? প্রেমে নিজের কষ্টের থেকেও প্রিয়তমার কষ্ট যে বেশি পীড়া দেয় । বারবার রাধার শ্রীমুখ মনে করছে আর ডুকরে কেঁদে উঠছে । প্রিয়তমার কষ্টে যে কোন প্রেমিকের প্রাণগলা কান্না আসে তা সে ভগবানই হোক বা সাধারণ মানুষ । বিছানা থেকে নেমে পড়েছে । পায়চারি করছে কৃষ্ণ । চঞ্চল হচ্ছে মন । আহা ! রাধা যখন জানতে পারবে তার প্রাণভ্রমর তার সঙ্গ ছেড়ে গেছে , কতই না রোদন করবে । রাধা কাঁদলে যে যমুনায় বান আসবে …পৃথিবী মাথা নাড়বে …সৃষ্টি ধ্বংস হবে ..জীবকূল ত্রাহি ত্রাহি করবে ।
তবে কি করবে কৃষ্ণ ? ? ? প্রেম বড়ো না কর্তব্য ! ! ! !

বলরাম ভাইয়ের যন্ত্রণা বুঝতে পারছে । বলরাম বুদ্ধি দিল । যাও , ভাই যাও ; এখন গভীর রাত । সবাই ঘুমে মগ্ন আমি পাহারায় আছি । তুমি শেষবারের মতো রাই কিশোরীর সাথে দেখা করে এসো ।

কৃষ্ণ আর এক মূহূর্ত্ব দেরি করেনি । বাঁশি হাতে ছুটছে । গায়ের উত্তরীয় খসে পরেছে । ব্যাকুল কৃষ্ণ ছুটতে ছুটতে তাদের প্রেমের সাক্ষী কদম্ব তলায় এসে বসলো । কৃষ্ণের বাঁশি রাধা ………..রাধা ……..রাধা ……রাধা…………করে ডাকছে । আজ বংশী শুধুই রাধা নাম ছাড়া কারো নাম ধরলোনা ।

কৃষ্ণ আর রাধিকার প্রাণ যে একসূত্রে বাঁধা । তাই কৃষ্ণের ব্যাকুলতা রাধার মনকেও চঞ্চল করে । ঘুম আসছেনা রাধার । ও কি ! এই নিশুতি রাতে কেন ডাকছে মধুর মুগ্ধ তানে । বাঁশির ডাকে পাগলীনি সে …..
আলুথালু বেশ
না বাঁধিল কেশ
ছুটছে কানুর পানে ।

হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলছে রাধা , ওগো প্রাণসখা
নিশুতি বিজনে
আমরা দুজনে
লোকলাজ কি নাই তব ।
কল্য সখীরা জিজ্ঞাসিবে
বলো ,তখন কি জবাব দেব ?
কৃষ্ণ হাত ধরে রাধাকে পাশে বসালো । রাধার মুখপানে চেয়ে রইলো । চাঁদও জ্যোৎস্না ছড়িয়ে খুশিতে হাসলো। বনলতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো । ফুলেরা সুগন্ধী ছড়িয়ে রঙ মাখলো । যমুনার জল কুলকুল ধ্বনিতে মৃদু সঙ্গীত গাইলো । স্বর্গ থেকে সমস্ত দেবদেবী এসে স্ত্রোত্রপাঠ করলো ।

আহা ! জগৎপালক আজ তারই শক্তিকে প্রেমনয়নে দেখছে । চিৎশক্তি আর পরাশক্তির মিলন । যুগযুগান্তর পিয়াসী যেন আজ একে অপরকে সম্পূর্ণ প্রেম ঢেলে দিচ্ছে । কারো মুখে কোন কথা নেই । অথচ সাশ্রুনয়নে একে অপরের সাথে নীরবভাষায় কতই না মধুর কথা বলছে ।

প্রেমাবেশে রাধিকার শরীর অবসন্ন হয়ে আসে । চোখ বুজে আসে । কানাই এবার যত্ন করে রাইকিশোরীকে তার কোলের উপর শুইয়ে দিল ।
ঘুমাও শ্রীরাধে আহ্লাদিনী
শান্তিতে ঘুমাও রাই বিনোদিনী ॥

কৃষ্ণকোলে পরম যতনে ঘুমায় শ্রী রাধা ।
মায়াবিনীর মায়ায় ভগবানও পড়ল বাঁধা ॥

বেশ কিছু সময় কাটলো ঘুমন্ত রাধার পানে চেয়ে চেয়ে কৃষ্ণের মন গলে চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো । কৃষ্ণের চোখের জলের ফোঁটা রাধার গালে পড়ল জেগে উঠলো রাধা ।
একি ঘনশ্যাম ! তোমার চোখে জল ।

চুম্বনে চুম্বনে অশ্রু তার রাধিকা নিল নিজের করে ।
রাধা আর কৃষ্ণ বাঁধা পড়ল একে অপরের বাহুডোরে ॥

 কৃষ্ণ বুঝছেন প্রভাত হতে আর বেশি সময় নেই । এবার সময় হয়েছে রাধাকে আসল কথাটা জানাবার । কিন্ত রাধার মুখপানে চেয়ে সত্য বলার ক্ষমতা ভগবানেরও হল না । কৃষ্ণের চোখে জল দেখে রাধার চোখেও জল এল । পরম যত্নে একে অপরের চোখ মোছালো । 

কৃষ্ণের এবার রাধাকে খুশি করার চেষ্টা ।
—রাধে !
— বলো সখা ।
আমার এই বাঁশি শুধুই তোমার নাম জানে । কৃষ্ণ যখন যেঅবস্থাতেই থাকুক রাধা তার অন্তরেই থাকবে । তোমায় আজ আমার প্রিয় এক বাঁশিখানা উপহার দিলাম । তুমি যখনই এই বাঁশিতে অধর থাকবে , দেখবে কৃষ্ণের অন্তরে শুধুই রাধা ।

প্রেমীর কাছ থেকে এর থেকে বড় উপহার আর কি হতে পারে । আনন্দে রাধা কেঁপে কেঁপে উঠছে । খুশিতে চোখ ছলছল । বাঁশি হাতে রাধা কৃষ্ণের বুকে মাথা রাখে ।
—-রাধে
—— বলো প্রিয়
উপহারের বদলে উপহার দিতে হয় । কি উপহার দেবে তুমি আমায় ?
শ্রীরাধা বললো ,
আমার যা কিছু সকলই তোমার ।
তুমি বিনে আর কিছু নেই আমার ॥
তুমি আছো জীবনে ,পূজনে,সাধনে ।
আজ্ঞা করো, শ্বাস ছেড়ে দিই চরণে ॥

—না না প্রিয়ে
— তবে কি দিতে পারি আমি ?
—- কথা । বচন । একটা কথা দাও রাধিকে ।
—- কি কথা প্রভু ?
শ্রীরাধার দুচোখে চুম্বন করে শ্রীকৃষ্ণ বললো , কথা দাও রাধে ….কথা দাও ! যে চোখে তুমি আমায় দেখেছো সে চোখ দিয়ে কখনো জল ফেলবেনা। তুমি আমার দুর্বলতা নও , আমার শক্তি হও ।

সরলমনে রাধা কথা দিল , তার বুক ফাটলেও চোখ থেকে আর কোনদিন জল পড়বেনা ।

কৃষ্ণ শান্তি পেল । শান্তি ! শান্তি ! শান্তি ! ওম মধু: ! আমায় শান্তি দিলে তুমি । এবার যাও রাধে , প্রভাত হতে আর বেশি দেরি নেই ।

বাঁশি হাতে রাধা ফিরে গেল ।

কালো যমুনার জলে ডুব দিয়ে পুবাকাশ রঙ্গিন করে সূর্য উঠছে । পাখিদের কলকাতানি , গোপ রাখালেরা গরু নিয়ে মাঠে যায় ।

 ওই কে যায় ?রাজরথে চড়ে, সোনার ছত্র মাথে
  শ্রীকৃষ্ণ আর বলরাম চলেছে অক্রূরের সাথে ॥ 

কাঁদছে নন্দরাজ , কাঁদছে যশোদা , কাঁদছে যত গোপ নরনারী । ললিতা , বিশাখা রাধার অষ্টসখী যত রাধাকে খবর দিল ।
আয় সখী আয় , আয় ছুটে আয়
আমাদের কানহা কংস কারাগারে যায় ॥

রাধা ছুটে এসে দেখে কৃষ্ণের ডিঙ্গা যমুনার জলে ধীরে ধীরে মিশে যায় । ভূপতিত হয়ে কাঁদছে গোপ সখারা , মূর্ছা যাচ্ছে গোপসখীরা । কেঁদে আকুল ব্রজবাসীগন । ফুলেলা বিবর্ণ হল । পাখিরা ঐক্যতান বন্ধ করলো । গরুবাছুর শোকে মুহ্যমান হল ।
শুধু কাঁদছে না রাধা। কাঁদো রাধা কাঁদো …আমাদের কানাই যে আমাদের ছেড়ে যায় । বুক ফাটলেও যে চোখ ফাটবেনা ।
( কানহা তুমি বড় নিষ্ঠুর ….কান্নার অধিকারটুকুও নিয়ে গেলে )

রাধা কি কেঁদেছিল …তার চোখে তো মরু , বিন্দুজলও আসেনি । রাধার অন্তর পূর্ণ প্রেমে ।

জমিদার কন্যা রাধারানী আজ পাগলীনি ।
মলিনবেশে পথে পথে ঘোরে বিরহী যোগীনি ॥

প্রেমের সার্থকতা মিলনে নয় ; বিরহে প্রেম পবিত্র হয় । রাধাসুন্দরী আর কোনদিন কেশদামে চিরুনি দেয়নি ; কারন সব কালো রূপের মধ্যে সে কৃষ্ণ কেই দেখে । পাছে কৃষ্ণ ব্যথা পান তাই কোনদিন চুল বাঁধেনি । রাধা আর কোনদিন চোখের পলক ফেলেনি পাছে এক পলের জন্যও কৃষ্ণ তার সমুখ থেকে সরে যান । প্রেমী রাধা যোগীনি তপস্যীণী হল । প্রেম পূজা , তপস্যা , সাধনা হল ।

রাধার প্রেমকে যুগযুগ ধরে মর্যাদা দিতে ভগবান কৃষ্ণও স্বীকার করলেন রাধা নাম না নিলে কৃষ্ণকে পাবেনা কেউ । তাই কৃষ্ণ রাধা নয় ; আগে রাধা তারপর কৃষ্ণ ..রাধাকৃষ্ণ ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published.