যতটা কাছে,ততটা দূরে – তূর্য মুখার্জি

সাহিত্য বার্তা

“যতটা আমরা কাছে এসেছি,ততটা আমরা দূরে সরে গেছি”

তূর্য মুখার্জি

সময়টা ছিল গত শতকের শেষ দুই দশক তখনও মানুষ মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতেন চিঠির মাধ্যমে।এক আত্মীয় অপর আত্মীয়ের জন্যে চিন্তা করতেন।ভাবতেন উভয়ে উভয়ের কথা।কেউ কোথাও গেলে সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পর চিঠি লিখে জানাতেন।সব কিছুর খবরাখবরই মূলত আদান প্রদান হতো চিঠির মাধ্যমে।মানুষ একে অপরের কথা ভাবতেন,দূরে থাকলেও চিন্তা করতেন একে অপরকে চিঠি লিখে খবর নিতেন।সে চিঠি কখনো ঠিকানায় পৌঁছে গেছে কখনো পোস্ট অফিসের ডাকবাক্স বন্দী হয়ে পড়ে থেকেছে।তবুও আশায় বাঁচতো চিঠি হয়তো পেয়ে গেছে আজকাল করে চিঠির উত্তর আসবে।সবাই নিশ্চয় ভালই আছে।যদি কেউ কাউকে আগের চিঠিতে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে থাকে তাহলে একে অপরের প্রতি দুশ্চিন্তা নিয়ে চিঠি লিখতেন।অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের একটা মানসিক টান ছিল তখন।

তারপর ধীরে ধীরে ল্যান্ডফোনের বুথের আগমন ঘটতে থাকলো।গ্রামে গঞ্জে শহরে একটা আধটা ফোনের বুথ গড়ে উঠল। তথাকথিত একটু যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা একে অপরকে ফোন করে খবর নিতেন।যদি খবর নেওয়া হয় তবে দেখা যাবে একজন অপরজনকে ফোন করলে দুজনের একজন যদি সেই সময় বুথে উপস্থিত না থাকে তবে বুথ মালিক বলতেন কিছু বলতে হবে আপনি আমাকে বলুন আমি বলে দেবো।অর্থাৎ বুথ মালিকেরা ও অনেকটা সহৃদয় ছিলেন।

ধীরে ধীরে যুগ পরিবর্তনের হাত ধরে বাজারে এসে গেল মোবাইল।বাড়তে থাকলো মোবাইলের ব্যাপকতা।গ্রাম গঞ্জে থাকা ফোনের বুথ কমতে কমতে বিলুপ্ত হল।হ্যাঁ বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ মানুষের কাছাকাছি এল।কিন্তু অভ্যন্তরীণ দিক থেকে আমরা একে অপরের থেকে অনেক দূরে সরে গেছি।আজ না আছে মানসিক টানাপোড়েন না আছে সম্পর্কের দৃঢ়তা।সুযোগ সুবিধা গড়ে উঠেছে,আমরাও হয়ে যাচ্ছি অলস।

ঘণ্টার পর ঘন্টা আমরা ফোন নিয়ে বসে আছি কিন্তু কে কাকে কটা ফোন করি?কোন দরকার ছাড়া?বেশি ফোন করলে একে অপরের প্রতি বিরক্ত হয়(প্রেমিক-প্রেমিকা,মা-মাসি,মা-মেয়ে ছাড়া) ।সেকালে মানুষ একটা চিঠির অপেক্ষায় বসে থাকতো এই বুঝি খবর আসবে।খবর পাঠাবে। যত আমরা কাছে এসেছি ততটা আমরা দূরে সরে গেছি।
ফেসবুক বা what’s app এর মাধ্যমে আমরা যতটা পারি আজ কাজ চালিয়ে নিচ্ছি।টেকনোলজি উন্নত হয়েছে এতে সুবিধাও অনেক হয়েছে।সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই।একজায়গায় থেকে অন্য জায়গার মানুষকে দেখতে পাচ্ছি ভিডিও কল করে।এটা গত শতকের মানুষদের কাছে একটা অসম্ভব বিষয়।কিন্তু করছি কতবার ভিডিও কল?আজ যখন আমাদের কাছে সুযোগ এসেছে তখন আমরা সেটাকে যথাযথ ব্যবহার করছি কি আদৌ?সারাদিনে সোশাল মিডিয়ায় থাকছি ৫-৬ ঘণ্টা কিন্তু সারাদিনে আত্মীয়দের ৫-৬ মিনিটও ফোন করছি না, অথচ জিও আনলিমিটেড কল করার সুযোগ দিচ্ছে।সময় এসেছে একটু আলাদা ভাবে ভাবার।সময় এসেছে স্রোতের বিপরীতে হাঁটার।সময় এসেছে আত্মীয় ও পরিবারের মানুষদের এক সূত্রে বাঁধার। নাহলে কাছাকাছি আমরা আসলেও পাশাপাশি কোনদিনই আসতে পারবো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.