জীবন এক রঙ্গমঞ্চ

সাহিত্য বার্তা

সুমিতা মুখোপাধ্যায়

 

‘যারা বলে-
” নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প”- তারা সব গাধা- গাধা।তারা সব মিথ্যে কথা- বাজে কথা বলে।অভিনেতা মানে একটা চাকর- একটা জোকার,একটা ক্লাউন।লোকেরা সারাদিন খেটেখুটে এলে তাদের আনন্দ দেওয়াই হল নাটক ওয়ালাদের একমাত্র কর্তব্য। মানে এককথায়- একটা ভাঁড় কি মোসায়েবের যা কাজ তাই।আর সেই দিনই বুঝলুম পাবলিকের আসল চরিত্রটা কী!তারপর থেকে ওসব ফাঁকা হাততালিতে, খবরের কাগজের প্রশংসায়,মেডেল,সার্টিফিকেটে,’ নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প ‘- এসব বাজে কথায় আমি বিশ্বাস করি না।পাবলিক মহোদয় আলবত হাততালি দেবেন- খুব প্রশংসা করবেন- সব ঠিক-কিন্তু যেই তুমি স্টেজ থেকে নামলে_ তুমি তাদের কেউ না- তুমি থিয়েটারওয়ালা- একটা নকলনবীশ_ একটা অস্পৃশ্য ভাঁড়,_ তা বলে কি তাঁরা তোমার সঙ্গে আলাপ করবেন না,চা সিগারেট খাওয়াবেন না? তা খাওয়াবেন।অনেক কথা বলবেন,আলাপ_ আলোচনা করবেন,হাসবেন,নমস্কার করবেন- তা নইলে বাইরে জাহির করবেন কী করে?” ও অমুক আর্টিস্ট! হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওকে আমি চিনি,ওর সঙ্গে আমার খুব খাতির,উনি তো সেদিন অবধি আমার ঘরে…..” সব ঠিক।কিন্তু কোনো সামাজিক সম্মান তুমি পাবে না।…….জানো,তোমার ওই পাবলিক,মানে থিয়েটারের টিকিট- কেনা খদ্দেরদের আমি, কাউকে বিশ্বাস করি না।……” নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প!” এই পবিত্রতার নামাবলিটা সেদিন হঠাৎই ফাঁস হয়ে গেলো আমার সামনে…….””

#

এটি একটি অভিনেতার অভিনয় জীবনের করুণ ট্র্যাজেডি।
আমরা আমাদের জীবনে সবাই সব চরিত্রে অভিনয় করে চলেছি।জীবন এক রঙ্গমঞ্চ। কুশীলব আমরা,দর্শক সমাজের মানুষ রা।
আমরা শিশু থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একেক চরিত্রে অভিনয় করে চলেছি।আসছে বিভিন্ন সম্পর্কের জটাজাল। দৃশ্যপট বদলাচ্ছে এখানে সময়।সময়ের সাথে সাথে আমাদের চরিত্রও পাল্টাচ্ছে।শিশু অবুঝ…..ছোটোবেলা,মেয়েবেলা,বিবাহিতা,মা শাশুড়ী, বার্ধক্যে জরাগ্রস্ত অবস্থা…তারপর মৃত্যু।
জীবন রঙ্গমঞ্চে যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছি,কাজ করছি,ভালো মন্দ সমালোচনা কুড়োচ্ছি,কখনও আনন্দে বুক ফুলে উঠছে….তখন পুরোপুরি বিস্মৃত হই ভবিষ্যত।কঠিন,কঠোর বাস্তব মৃত্যু ভাবনাও তখন ছুঁতে পারে না।বেশ তা যাক।হাততালি কুড়লাম, অনেক মেকি ভালোবাসা পেলাম,আরো কতো কী!!!! কিন্তু শেষে সেই গভীর ট্র্যাজেডি।
তুমি আগে কী ছিলে,কী অবদান কেউ মানবে না,বর্তমান কী সেটাই গ্রাহ্য হবে।একজন ছাত্র-ছাত্রী, একজন শিক্ষক, একজন কর্তব্য পরায়ণ পিতা,বা মাতা,রাজনীতি বিদ্,বৈজ্ঞানিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনে এই ঘোর বিয়োগান্তক কাহিনি ঘোরা ফেরা করবে।এইটুকুই……ঐ হাততালি।ব্যাস।তারপর যাকে তাই।
এক একবার ভাবতে বসলে অবাক লাগে….সারাদিন কী কী করলাম,কাদের জন্য করলাম,কেনো করলাম,কী কী করলাম….ইত্যাদি।সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এটা।
সারা দিনে কতো মানুষের ভুল সংশোধন,নিজের আমিত্বের অহংকার, ঝগড়া,মারামারি…..প্রতিবাদ,লড়াই…জেতা….সবই তখন বোগাস লাগে।
মানুষের চলন দেখলেই নাকী বোঝা যায়…সে কেমন।অর্থাৎ তার চলন কালে মাথার অবস্থান দেখে বোঝা যায়।সেই ব্যক্তি কতোটা দৃঢ়চেতা,কতোটা আত্মবিশ্বাসী।
আরে বেশীর ভাগ মানুষই এখন মাথা নীচু করে হাঁটি,চোখের ওপর চোখ রেখে কথা বলতেও পারি না!!! কী অবস্থা…।তাহলে সময়ের সাথে, সম্পর্কের সাথে তাল মেলাতে মাথা হেঁট।বোঝো কান্ড!!!! তা যাক,পরিবর্তন আমাদেরও হচ্ছে…..অনেকে ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ভাঁড়ে পরিনত হচ্ছি।এখানে ভাঁড় কে ছোটো করা নয়,অর্থাৎ আমরা আমাদের পরিচয় হারাচ্ছি।
জীবন রঙ্গমঞ্চে অভিনয়,বড়ো জটিল,আসলে সংলাপও আগে থেকে লেখা থাকে না,প্রমটারও নেই!!! নিজেকেই নিজে চালনা করতে হয়।বুক পেতে সব ভালো- মন্দ কে আগলে রাখতে হয়।
তবে এটা বলে শেষ করি….এ জীবন বড়োই জ্বালাময়,কেউ পায়,কেউ পায় না।লক্ষ্য বিভিন্ন, পৌঁছানোর পদ্ধতিও বিভিন্ন।তবুও চলা থামালে হবে না।চলতে হবে….জীবন রঙ্গমঞ্চে অভিনয় চালিয়ে যেতে হবে।কেউ বেশী সাবাস নেবে,তো কেউ কম।কিন্তু সকলের একই করুন ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে জীবনে।
যতক্ষণ ক্ষমতা,ততক্ষণ কদর।এটা মানতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.