টেটের জট অব্যাহত, মেধা তালিকা প্রকাশে অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ বহাল কলকাতা হাইকোর্টের

প্রশাসন

টেটের জট অব্যাহত, মেধা তালিকা প্রকাশে অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ বহাল হাইকোর্টে

মোল্লা জসিমউদ্দিন


জট কেটেও কাটছেনা টেট মামলায়। হলফনামা জমা তারপর জবাবী হলফনামা দাখিলের নির্দেশের মধ্যেই এই মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মৌসুমি ভট্টাচার্যের এজলাসে বহু চর্চিত টেট পরীক্ষায় নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাটি উঠে। সেখানে স্কুল সার্ভিস কমিশনের হলফনামার জবাবী হলফনামা চাওয়া হয়েছে মামলাকারীদের কাছে। ১৪ আগস্ট এর মধ্যে এই হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। ১৬ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ। টেট পরীক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মেধা তালিকা প্রকাশে অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে আদালত। জানা যায়, গত শুনানিতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাছে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। নিদিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর গত ৮ আগস্ট স্কুল সার্ভিস কমিশন কর্তৃপক্ষ হলফনামা জমা দেয়। সেখানে অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনেককেই প্রশিক্ষিত বলে দাবি করা হয়েছে। ফর্ম ফিলাপে আবেদনকারীরা এই ভূল টি নাকি করেছিল।অর্থাৎ এতদিন যারা অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন, তাদের অনেকেই ফর্ম ফিলাপে প্রশিক্ষিত হয়েও অপ্রশিক্ষিত হিসাবে ফর্ম ফিলাপ করেছেন! ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশ না করার সপক্ষে স্কুল সার্ভিস কমিশন কর্তৃপক্ষ তালিকা প্রকাশে প্রভাবিত হওয়ার যুক্তি দেখায়। টেট পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণদের প্রথম পর্যায়ে গত ৬ জুলাই এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৪ থেকে ২৬ জুলাই টানা তিনদিন পাঁচ হাজারের মত আবেদনকারীর শিক্ষাগত নথিপত্র ভেরিভিকেশন হয়।আদালত সুত্রে জানা গেছে, আগামী ১৪ আগস্ট এবং ১৬ আগস্ট টেট পরীক্ষার্থীদের বাকিদের নথিপত্র ভেরিভিকেশন হবে। সেইসাথে মামলাকারী আবেদনকারীদের নথিপত্র ভেরিভিকেশন হবে ২০ আগস্ট থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত। উল্লেখ্য,     ২০১৫ সালে ১৬ আগস্ট রাজ্যব্যাপী টেট পরীক্ষা হয়েছিল শিক্ষক নিয়োগের জন্য। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির (আপার প্রাইমারি)  বিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার আশায় কয়েক লক্ষ শিক্ষিত বেকার এই পরীক্ষায় বসেছিল। সেখানে প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থী হিসাবে ১ লক্ষ ২০ হাজার এবং অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থী হিসাবে ১ লক্ষ ৮ হাজার সর্বমোট ২ লক্ষ ২৮ হাজার পরীক্ষার্থী  উত্তীর্ণ হয়। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। ছন্দপতন ঘটলো প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের না ডেকে অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের স্কুল সার্ভিস কমিশন ডাকে যখন । প্রথমে ভেরিভিকেশন এরপর   ইন্টারভিউ তালিকা  প্রকাশের পর থেকেই বারবার আইনী জটিলতা আসে এই টেট পরীক্ষায় নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে। কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়। প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থী যাদের ভেরিফিকেশনের নোটিশ আসেনি তারা মামলায় জানায় – ২০১৬ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের  এনসিটিই নিয়ম অনুসারে এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়া চালাচ্ছে না। এমনকি এসএসসির নিজস্ব ৮ নং এবং ৯ নং ধারা অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করছেনা। যেখানে শুন্যপদ তালিকা প্রকাশ, ভেরিভিকেশন করা, মেধাতালিকা প্রকাশ, ইন্টারভিউ চালু করা বিষয় গুলি এড়িয়ে যাচ্ছে স্কুল সার্ভিস কমিশন কর্তৃপক্ষ। এই নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের ১৭ নং কোর্টে বিচারপতি মৌসুমি ভট্টাচার্যের এজলাসে চলেছে সওয়াল জবাব। ইতিমধ্যেই মামলাকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অভিষেক মুখার্জি, বাপ্পা মন্ডলের আইনজীবী রুচিরা চট্টপাধ্যায়, এবং ভিষক ভট্টাচার্য তিন তিনটি হলফনামা জমা দিয়েছেন আদালতে। যার প্রতুত্তরে অবশ্য স্কুল সার্ভিস কমিশন মাত্র ১ টি হলফনামা পেশ করেছে বলে প্রকাশ ।  মামলাকারীদের দাবি ছিল – আড়াই লক্ষ এর মত পরীক্ষার্থীদের টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা হল, তাহলে শুন্যপদ তালিকায় সংখ্যা কত? যারা উত্তীর্ণ হয়েছে বিশেষত অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের একাডেমিক রেজাল্ট এবং টেট পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বার কেন লুকানো হচ্ছে?  কেনই বা প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের ইন্টারভিউতে না ডেকে অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের ডাকা হচ্ছে?  কেননা কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিতদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারপরে অপ্রশিক্ষিতরা আসবে তালিকা ধরে। এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, প্রায় পাঁচশো প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন করেনি তারা, ভেরিফিকেশন শেষ করার আগেই ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশ করে দেয় এসএসসি। যদিও ওই পাঁচশো প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশনের নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট ৩ আগস্টের মধ্যে ।   আবার মামলায় উঠে আসে,  ২০১৬ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আবেদনকারী ফর্মে  পরীক্ষার্থীদের ছবি, প্রাপ্ত নাম্বার দেওয়ার কলাম থাকলেও পরে এসএসসি এই কলামটি ফর্ম থেকে তুলে দেয়। গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যাপক আর্থিক কেলেংকারীর আভাস পাচ্ছে ওয়াকিবহাল মহল। কেননা স্বচ্ছ নিয়োগ  হোক, তা একপক্ষ বরাবরই চাইছে না তা মামলার গতিপ্রকৃতি দেখে বোঝা যাচ্ছে । মামলার লালফিতেয় দীর্ঘমেয়াদী সময় কাটুক তা হয়তো চাইছেন একাংশ সরকারি আধিকারিক। যাতে দুর্নীতিতে অভিযোগের আঙুল উঠা থেকে বাঁচা যায়। এইরূপ নানান প্রশ্নচিহ্ন দেখা যাচ্ছে এই টেট নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে বলে অভিযোগ ।  গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মৌসুমি ভট্টাচার্যের এজলাসে মামলায় এসএসসি কর্তৃপক্ষ ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিয়োগ সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ দিতে বলা হয়েছিল,তা ৮ আগস্ট স্কুল সার্ভিস কমিশন কর্তৃপক্ষ হলফনামা জমা দেয় কলকাতা হাইকোর্টে । মূলত শুন্যপদ কত, প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে একাডেমিক রেজাল্ট, টেটের প্রাপ্ত নাম্বার প্রভৃতি বিষয়ে। রাজ্য রাজনীতি মহলেও নজর এই মামলার দিকে। শাসকদলের অনেক নেতার আত্মীয়স্বজন শিক্ষাগত যোগ্যতা সেভাবে না হয়েও অগ্রাধিকার পেয়েছে এই টেট পরীক্ষায়। প্রায় চার বছর ধরে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার জট কেটেও যেন কাটছে না।                                                                                                                                                                                                             

Leave a Reply

Your email address will not be published.