রাখি বন্ধন

সাহিত্য বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিপজ্জনক রূপ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন কবি। শুধু কল্পজগতেই নয় বাস্তবের মাটীতেও বিচরণ করতেন তিনি। এই রাখী বন্ধন উৎসবে তাই তিনি মসজিদ অভিযান করেন প্রীতি ও ভালবাসার রাখী নিয়ে।

সে দিনের রাখী বন্ধন –

……রবিকাকা একদিন বললেন, রাখিবন্ধন উৎসব করতে হবে আমাদের, সবার হাতে রাখি পরাতে হবে। ক্ষেত্রমোহন কথকঠাকুর
খুব খুশি ও উৎসাহী হয়ে উঠলেন, বললেন, এ আমি পাঁজিতে তুলে দেব, এই রাখিবন্ধন উৎসব পাঁজিতে থেকে যাবে। ঠিক হল, সকালবেলা সবাই গঙ্গায় স্নান করে সবার হাতে রাখি পরাবে। রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়। রওনা হলুম সবাই গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে, রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাত থেকে আরম্ভ করে ফুটপাথ অবধি লোক দাঁড়িয়ে গেছে….. মেয়েরা খই ছড়াচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম, যেন একটা শোভাযাত্রা।
দিনুও ছিল সঙ্গে, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল…
…..’বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল
…… পুণ্য হউক, পূণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান। ‘
এই গানটি সেই সময়েই তৈরি হয়েছিল। ঘাটে সকাল থেকে লোকে লোকারণ্য, রবিকাকাকে দেখার জন্য আমাদের চারিদিকে ভিড় জমে গেল। স্নান সারা হল…. সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল একগাদা রাখি,
সবাই এ ওর হাতে রাখি পরালুম। হাতের কাছে ছেলেমেয়ে যাকে পাওয়া যাচ্ছে, কেউ বাদ পড়ছে না, সবাইকে রাখি পরানো হচ্ছে।
গঙ্গার ঘাটে সে এক ব্যাপার। পাথুরেঘাট দিয়ে আসছি, দেখি বীরু মল্লিকের আস্তাবলে কতকগুলি সহিস ঘোড়া মলছে…. হঠাৎ রবিকাকা ধাঁ করে বেঁকে গিয়ে ওদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন। ভাবলুম, রবিকাকারা করলেন কী, ওরা যে মুসলমান…. এইবারে একটা মারপিট হবে। মারপিট আর হবে কী। রাখি পরিয়ে আবার কোলাকুলি, সহিসগুলি তো হতভম্ব কান্ড দেখে। আসছি, হঠাৎ রবিকাকার খেয়াল হল চিৎপুরের বড়ো মসজিদে গিয়ে সবাইকে রাখি পরাবেন। হুকুম হল … চল সব। এইবার বেগতিক….. আমি ভাবলুম, মসজিদের ভিতরে গিয়ে মুসলমানদের রাখি পরালে একটা রক্তারক্তি ব্যাপার না হয়ে যায়। তার উপর রবিকাকার খেয়াল, কোথা দিয়ে কোথায় যাবেন আর আমাকে হাঁটিয়ে মারবেন। আমি করলুম কী, আর উচ্চবাচ্য না করে যেই-না আমাদের গলির মোড়ে মিছিল পৌঁছানো, আমি সট্ করে একেবারে নিজের হাতার মধ্যে প্রবেশ করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। রবিকাকার খেয়াল নেই…. সোজা এগিয়ে চললেন মসজিদের দিকে, সঙ্গে ছিল দিনু, সুরেন, আরও ডাকাবুকো লোক।
এদিকে দীপুদাকে বাড়িতে এসে এই খবর দিলুম, বললুম, কী কাণ্ড হয় দেখো। দীপুদা বললেন, এই রে দীনুও গেছে, দারোয়ান দারোয়ান, যা শিগগির, দেখ্ কি হল…… বলে মহা চেঁচামেচি লাগিয়ে দিলেন। আমরা সব বসে ভাবছি….. একঘন্টা কি দেড়ঘন্টা
বাদে রবিকাকারা সবাই ফিরে এলেন। আমরা সুরেনকে দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, কী কী হল সব তোমাদের ? সুরেন যেমন কেটে কেটে কথা বলে, বললে,
কী আর হবে, গেলুম মসজিদের ভিতর, মৌলবি-মওলানা যাদের পেলুম হাতে রাখি পরিয়ে দিলুম। আমি বললুম, আর মারামারি ?
সুরেন বলল, মারামারি কেন হবে…. ওরা একটু হাসল মাত্র।… “
( ‘ঘরোয়া’, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

Leave a Reply

Your email address will not be published.