অভাগীর চিঠি – মুনমুন মুখার্জি

সাহিত্য বার্তা

মুনমুন মুখার্জ্জী

স্নেহের বাবুসোনা,
জানি না এ নামে তুই নিজেকে চিনতে পারবি কিনা! তোর বাবা আর আমি ছাড়া কেউ তো এই নামে তোকে ডাকে নি কোনোদিন.. তিনি দুবছর হল অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন, আর আমিও এখন তোকে ডাকার সুযোগ পাই না। তুই তো আমার কাছে আসিস-ই না। একই বাড়িতে থেকে তুই এত দূরে সরে কি করে থাকিস আমি ভাবতে পারি না। আমি বার বার বার তোকে ফোন করে ডেকে পাঠাতাম বলে তুই ফোনটাও নিয়ে নিয়েছিস। দরজা বাইরে থেকে লাগানো থাকে, চিৎকার করে তোকে ডাকলেও তুই শুনতে পাস না, নাকি শুনতে পেলেও উত্তর দিস না কে জানে?
মনে আছে যখন ভাল ছিলাম সে দিনের কথা? তোর ছোটবেলার কথা না হয় বাদ দিলাম, তোর বিয়ের পর তোর বউ তো ঘরের কাজ, রান্নাবান্না কিছুই জানত না। তার উপর চাকরি করা মেয়ে, তার ভাল লাগা মন্দ লাগা, তোর ভাল লাগা মন্দ লাগা, তোর বাবার ভাল লাগা মন্দ লাগা অনুযায়ী কাজ করতে করতে নিজের ভাল মন্দ নিয়ে চিন্তা করার সময় পাই নি। এমন কি নিজের শরীরের দিকে তাকাতে পারিনি। তোর বাবা তাও প্রতি মাসে রুটিন চেক আপ করাতেন, তাঁর যাওয়ার পর থেকে সেটাও বন্ধ। তোকে কিছু বললে তুই নিজেই ডাক্তারী করেছিস, ওষুধের দোকানে বলে ওষুধ নিয়ে আসিস। সেটা কাজে লাগল, কি লাগল না কোনোদিন শুধাস নি। আমার খুব কষ্ট হলে কখনো খেয়েছি, কখনো অভিমান করে খাই নি। আমার কি হচ্ছে সেটা আমি ডাক্তারকে বলব তবে তো ডাক্তারবাবু ওষুধ দেবেন। তোকে বললেও শুনিস নি তাই বলাই ছেড়ে দিয়েছি। এখন তো নিজে নিজে হাঁটতেই পারি না। ডাক্তারের কথায় আমার পায়ের নার্ভ শুকিয়ে গেছে। আমাকে ধরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়ার তোদের সময় কোথায়? ডাক্তার বাবু বলেছিলেন হাঁটলে আর ফিজিও থেরাপি করলে ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোর বাবার রেখে যাওয়া টাকা তোর নামে করে দিয়েছিলাম, যাতে আমার রোগের চিকিৎসা করতে তোকে ভাবতে না হয়। তুই ঘরে ফিজিও থেরাপি শুরু করলেও মাস ছয়েক পর বন্ধ করে দিস। বলিস আমার টাকা শেষ হয়ে গেছে। আচ্ছা ছয় মাসের মধ্যে ছয় লাখ টাকা শেষ হয়ে যায়? কি জানি বাবু হতেও পারে।
আচ্ছা তুই আর বৌমা খুব ব্যস্ত থাকিস, কিন্তু তোর মেয়েটাও এখন আমার কাছে আসে না। তার দাদু দিদা তাকে আমার ঘরে আসতে বারণ করে। আমি শুনতে পাই তো। আমি না হয় হাঁটতে পারি না, বাকি সব কল কজ্বা তো ঠিক ঠাক কাজ করছে। সুগার প্রেসার কিছুই নেই। কই মাছের প্রাণ নিয়ে একা একাই পুরোনো আসবাব পত্রের মত ঘর জোড়া করে পরে আছি। অথচ আমার এই নাতনির জন্য আমি কি না করেছি। তোরা তো ঢুকতিস সেই সন্ধ্যা বেলায়, কখনো রাত্রি বেলায়।
জানিস তো তুই যে আয়া রেখেছিস না, আমাকে দেখা শোনা করার জন্য, সে আমার কথাই শোনে না। কিছু বলতে গেলে বলে “দাদাবাবু যা বলেছেন তাই তো করব”- এই যে তোরা ক’দিন ধরে ঘরে নেই, হয়ত কোথাও বেড়াতে গেছিস, সে কখন আসে জানিস? সকালে এসে কোনো রকমে চান-টান করিয়ে জলখাবার খাইয়ে চলে যায়। তারপর আসে সেই দুপুর আড়াইটে। সকালে আমাকে হাগিস পরিয়ে রেখে যায়– টয়লেট যেতে পারি না তাই। রাতে আসে আটটা নাগাদ। আগেও তাই করত। তবে তখন আমি পায়খানা পেলে দেওয়াল ধরে ধরে চলে যেতাম। এখন পারি না। আজ হয়ে গেছিল। পেট খারাপ তো তাই…। কেমন নিজেকে নোংরা নোংরা লাগছিল। তাই হাগিস খুলে বিছানার চাদর দিয়েই নিজেকে পরিষ্কার করে নিই। ও এসে কাজ বেড়ে গেছে দেখে যা নয় তাই বলল, সাথে এও বলল নাকি আমাকে তোরা সহ্য করতে পারিস না। আমি বেঁচে আছি বলে তোদের অনেক কাজ আটকে আছে। কেন বাবু, আমি তোদের কোন কাজে বাধা দিয়েছি বল?
আর ভাল লাগেনা বুঝলি– তাই ঠিক করলাম তোদের মুক্তি দিয়ে যাব। তুই যাবার আগে প্রতি বারের মত এক মাসের ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেছিস সেগুলো আমি সব খেয়ে নিয়ে তোকে চিঠি লিখতে বসেছি। কাজের মেয়ে আসবে সেই সন্ধ্যা বেলায়, আর তুই কাল সকালে। আমি শান্তিতে একটু ঘুমাই ততক্ষণ। তোরা ভাল থাকিস। তোদের অনেক উন্নতি হোক। তবে একটা শেষ ইচ্ছে পারিস তো পূরণ করিস। যদি আমার কিছু একটা হয়ে যায়, কোনো ঘাট শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করিস না। আমার আত্মা তাতে শান্তি পাবে না। বরং আমাকে একেবারে ভুলে যাস। তোর ভাল মা, ভাল বাবা রইলেন তো, তাঁদের দেখিস। তোদের মঙ্গল হবে।
ইতি – আশীর্বাদক তোর অভাগী মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.