ভোটগুরু পি.কে এর প্রেসক্রিপশন আদৌও কার্যকর হবে তৃণমূলের অন্দরে?

রাজনীতি

মোল্লা জসিমউদ্দিন, 


কাটমানির রেশ অব্যাহত বাংলার বুকে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম। সর্বত্রই উত্তাল বাংলা। এরেই মধ্যে গত সপ্তাহে তৃনমূলের বিশেষ বৈঠকে দলনেত্রীর ঘোষণা – ‘কাটমানি নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ আনা যাবেনা’। আবার পঞ্চায়েত মন্ত্রী কাটমানি প্রসঙ্গে বলেছেন – ‘তথ্য প্রমাণ  দিয়ে পুলিশ প্রশাসন কে অভিযোগ করুন ‘। কাটমানি অর্থাৎ দলের নামে তোলাবাজি টি হয়েছে বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পে, তাই স্বচ্ছতা আনতে এই দাওয়াই । মূলত ঘর, শৌচাগার, বিভিন্ন ঋণপ্রদানে  সরকারি ভতুর্কি দেওয়া প্রকল্প গুলিতে কাটমানি আমদানির ঘটনা গুলি বেশি ঘটেছে। দলনেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন কাটমানি নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ আনা যাবেনা কিংবা পঞ্চায়েত মন্ত্রী যখন তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া কাটমানির অভিযোগ নয় বলে জানাচ্ছেন তখন বিভিন্ন ভাবে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি কাটমানি কান্ডে ইতি টানতে চাইছে শাসকদল?  কেননা সরকারি প্রকল্পগুলির বেশিরভাগ উপভোক্তা হচ্ছে গরীব মানুষ। তাদের কে যখন পঞ্চায়েত স্তরে ইন্দিরা আবাস / গীতাঞ্জলি প্রকল্প / প্রধানমন্ত্রী আবাস / বাংলা আবাস যোজনার ঘর দেওয়া হয়েছে। তখন দলীয় ঘুষ অর্থাৎ কাটমানিতে তো কোন লিখিত বায়নামা হয়নি?  যে এই প্রকল্পটি পেতে এত টাকা লাগবে, তার অগ্রিম এত দেওয়া হলো কিংবা বাকিটা অমুক সময়ের মধ্যে দেওয়া হবে?  যা হয়েছে তার সবটাই মৌখিক পরম্পরায়। ঘরের ১ লক্ষ ২০ হাজার পেতে গেলে ৩০ হাজার লাগবে এটিই গ্রামবাংলার সহজ অংক এই প্রকল্প পেতে । চারটি কিস্তিতে উপভোক্তারা এই সরকারি অনুদান টি পান। তাই কাটমানির কমিশন ঠিকঠাক না পেলে ব্লক অফিসে পঞ্চায়েত সমিতির পদাধিকারীরা মুখ্যত পূর্ত বিভাগের কর্মাধ্যক্ষ তা আটকে দেন বলে অভিযোগ । তাই বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কাটমানি নিয়ে গরীব মানুষদের ‘জনরোষ’ ক্রমশ উদ্ধমূখী। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর মিথ্যা অভিযোগ আনা যাবেনা কিংবা পঞ্চায়েত মন্ত্রীর তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ গ্রাহ্য নয়, বার্তা গুলি কাটমানি নিয়ে তৃনমূলের  ইতি টানার একপর্যায়ের  প্রয়াস বলা যায়। এখন প্রশ্ন গত লোকসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত  পরাজয়ের কারণ খুজতে এবং আগামী  বিধানসভার ভোটে হারানো সাফল্য আনতে তৃনমূল নেত্রী যে ‘ভোটগুরু’ পি.কে অর্থাৎ প্রশান্ত কিশোরের দারস্থ হয়েছেন। সেখানে পি.কে এর প্রেসক্রিপশনে যেসব ‘দাওয়াই’ রয়েছে তার মধ্যে কাটমানি অন্যতম। দিন পনেরো – কুড়িতে সারা রাজ্যজুড়ে কাটমানি ইস্যুতে বুথস্তরের কয়েকজন চুনোপুঁটি ছাড়া রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি শাসকদল। যেখানে কাটমানি আদায়ে বুথ কমিটির নেতাদের ভূমিকা গুরত্বপূর্ণ হলেও কাটমানির সিংহভাগ অর্থ ব্লক কমিটি থেকে জেলা কমিটি ভায়া হয়ে রাজ্য নেতাদের একাংশের পকেটে ঢুকেছে বলে অভিযোগ। এখন শয়ে শয়ে বুথ কমিটির লোকেরা ‘বলির পাঁঠা’ হয়েছেন বলে দলের বড় অংশের অভিমত। কার্যত তাদের কে ‘ ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে’র সামনে ফেলে দেওয়া হয়েছে দলের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে। বাড়ী ভাঙচুর, মুচলেকা আদায় সহ মারধর পর্যন্ত খেতে হচ্ছে কাটমানি আদায়কারী নেতাদের কে।   যদিও রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে, সম্প্রতি লোকসভা নির্বাচনে ১৮ টি আসনে বিজেপির জয়ে তৃনমূলের বুথ কমিটির ভূমিকা গুরত্বপূর্ণ। কেননা স্থানীয়স্তরে বুথে ভোট পরিচালনা এরাই করে থাকে।   তাই দলীয় মীরজাফরদের শায়েস্তা করতে কাটমানি দাওয়াই প্রয়োগ করে ভোটে অন্তর্ঘাতের বদলা নিলেন দলনেত্রী। এইবিধ নানান মত কাটমানি নিয়ে থাকলেও মূল লক্ষ পূরণে তৃণমূল অনেকটাই ব্যর্থ বলে বিরোধীদের দাবি। তারা লোকসভা নির্বাচনের পর রাজ্যব্যাপী কমন ইস্যুতে আন্দ্রোলন করার জ্বলন্ত হাতিয়ার পেয়েছে। চারদিকে যেভাবে কাটমানি কে সামনে রেখে বিজেপি স্থানীয়স্তরে রাজনৈতিক মাটি শক্ত করতে চাইছে, সেখানে বিক্ষুব্ধ তৃনমূলীদের পর্দার আড়ালে নয় সম্মুখসমরে পেয়ে যাচ্ছে গেরুয়া শিবির। তাই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কাটমানি নিয়ে ইতি টানার চেস্টা করলেও তা হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দিন কে দিন। পি.কে এর প্রেসক্রিপশনে কাটমানির পাশাপাশি আটজন দলীয় নেতা – মন্ত্রীদের কালো তালিকায় রাখতে বলা হয়েছে আগামী বিধানসভার ভোট অবধি। সেখানে দেখা যাচ্ছে দলের বিদ্রোহী নেতাদের প্রতি ব্যবস্থাগ্রহণের হুমকি ছাড়া কার্যক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি। বিগত বাম জমানায় কখনো সিঙ্গুর আবার কখনওবা নন্দীগ্রাম নিয়ে বিমান বসু – বিনয় কোঙ্গার – লক্ষ্মণ শেঠরা কু মন্তব্যে বিরোধীদের অপদস্ত করতো। যার পরিণতি স্বরুপ ২০১১ এর বিধানসভায় ক্ষমতা হারায় বামেরা। যখন বামফ্রন্ট নিজেদের ভূল বুঝলো, তখন সব কিছু শেষ।যদি আচার আচরণে সরকারি পদক্ষেপে মেপে চলত। তাহলে হয়তো এতটা রাজনৈতিক পরাজয় ঘটত না একদা ক্ষমতার অলিন্দে থাকা  বামেদের। এইরুপ পরিস্থিতিতে জাতীয় স্তরের ভোটগুরু প্রশান্ত কিশোরের প্রেসক্রিপশন না মানলে আদৌও তৃণমূল তাদের ক্ষয় রুখতে পারবে?  সে নিয়েও উঠেছে বিস্তর প্রশ্নচিহ্ন। দক্ষিণবঙ্গের শাসকদলের এক রাজ্য নেতা। যিনি পুলিশ কে বোমা মারার নিদান থেকে বিরোধীশুন্য ভোট করতে সিদ্ধহস্ত। তাঁকে কালো তালিকায় রাখার অনুরোধ রেখেছেন ভোটগুরু। এইরুপ খবর সংবাদমাধ্যম সুত্রে। সেখানে ব্যবস্থাগ্রহণের কোন ইংগিত দেননি তৃনমূল নেত্রী। অপরদিকে পুলিশি নির্ভরশীলতা কমাতে দলীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন দলনেত্রী। বাস্তবিক ক্ষেত্রে সেই নির্দেশ কার্যকর কোথাও হয়নি বলা যায়। মঙ্গলকোট থানায় সকাল নটা বাজলেই এক উপপ্রধান তার দলবল নিয়ে প্রতিদিন ঢুকে যান থানার মধ্যে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি ওসির কোয়াটারে থাকেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ। যদিও পুলিশের তরফে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বেলা এগারো বাজলে ব্লক তৃণমূল সভাপতি কে দেখা যায় সরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে থানায় ঢুকতে। পঞ্চায়েত সমিতির দুই জগাইমাধাই কর্মাধ্যক্ষ পুলিশের সব প্রোগ্রামে দেখা যায় পুলিশ আধিকারিকদের ডাইনেবাইয়ে।        পি.কে খ্যাত প্রশান্ত কিশোরের দাওয়াই আদৌও কি মানা সম্ভব তৃনমূলের কাছে?  আবার তৃনমূল নেত্রী যেসব নির্দেশ গুলি দিচ্ছেন ব্লক / জেলা কমিটির নেতাদের কে, সেগুলিও বাস্তবিক ক্ষেত্রে প্রতিফলন ঘটছেনা তৃণমূলের অন্দরে। প্রকাশ্যে বিরোধীদলে নাম না লেখা অবধি নেতা কর্মীদের উপর   কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে দোটানায় রয়েছে শাসক শিবির। দলীয় পরিকাঠামোয় যথাযথ নেতৃত্বে আমুল সংস্কার না আনলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল ভালো না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল রয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                              

Leave a Reply

Your email address will not be published.