ক্রীড়া সংস্কৃতি

একদা বীরভূমের রাজধানী রাজনগরের দুর্গাপূজার ইতিকথা

খায়রুল আনাম ,

 করোনা  কেড়ে  নিলো  প্রথম পুজোর  আনন্দ
         
অতিমারি করোনার কারণে আমাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনে যে ছেদ পড়েছে, তা আবারও কবে স্বাভাবিক জীবন-ছন্দে ফিরে আসবে  তার কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না চিকিৎসা বিজ্ঞান।  এই করোনার কারণে আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক নানান আচার-অনুষ্ঠানেও এখন আর স্বাভাবিকতা বজায় নেই। তবে, এবারই প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেও, তা থেকে পিছিয়ে আসতে হলো বীরভূমের  খয়রাশোলের কড়িধ্যা গ্রামের ভক্তপ্রাণ মানুষজনদের।         বীরভূমের খয়রাশোল এক সময় ছিলো এখানকার রাজনগরের রাজাদের অধীনে। রাজনগর প্রাচীনকালে ছিলো বীরভূমের রাজধানী। এখানকার রাজ পরিবারের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের ছিলো গভীর সম্পর্ক।   মুর্শিদকুলি খানের সময় থেকেই  রাজনগর অঞ্চলের স্থাপত্য  যথেষ্ট গৌরবের অধিকারী ছিলো।  ১৭৫৬ সালে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজুদ্দৌলা বেনিয়া ইংরেজদের আগ্রাসী মনোভাবের জন্য তাঁদের  শায়েস্তা করতে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। সেই সময় কলকাতায় নবাব সিরাজুদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজদের যে যুদ্ধ হয় তাতে, রাজনগরের রাজা  আলিনাকি খান নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে সাহায্য করার জন্য রাজনগর থেকে পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তিবাহিনী সৌনিকদের পাঠান। সেই যুদ্ধে  নবাবের  কাছে পরাজিত হয় ইংরেজ বাহিনী। রাজনগরের রাজা তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে রাজপুতদের  তাঁর সেনাবাহিনীতে স্থান দেন এবং তাঁদের অনেক উচ্চপদেও বসান। এখানকার বনাঞ্চলের  বিশাল ভূ-খণ্ড জুড়ে তখন ডাকাতদের যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। তাঁরা অতর্কিতে লোকালয়ে হানা দিয়ে লুঠ করে নিয়ে যেত নানান সম্পদ।  রাজনগরের রাজা সেইসব বনাঞ্চল  এলাকায় রাজপুতদের বসবাসের অধিকার এবং ভূ-সম্পত্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ডাকাতদের আস্তানাগুলি  বিনষ্ট করে দেন। প্রজারাও অনেক নিরাপদ বোধ করে। ডাকাতদের ভয়ে ভীত হয়ে এখানাকার অনেক গ্রাম জনমানবশূন্য  হয়ে গেলেও এখানকার  মানকরে যে দুর্গামন্দির ছিলো তা রয়ে গিয়েছে। প্রতি বছর আশপাশের গ্রামের মানুষ  সেখানে পুজোর ব্যবস্থাও  করেন।         এই রকম একটি  জঙ্গলঘেরা জনপদহীন এলাকায়  এখানকার একটি জলধারাকে অবলম্বন করে গড়ে  ওঠা  গ্রাম খয়রাশোলের কড়িধ্যা। যেখানকার মানুষদের প্রধান জীবিকাই হলো কৃষিকাজ।  প্রবাহিত এই জলধারা এলাকার কৃষিক্ষেত্রকে ঊর্বর করে রাখার ফলে এখানকার মানুষকে জীবিকার জন্য খুব  একটা উদ্বিগ্ন হতে হয় না।  এখানকার জলধারার বিপরীতে মানকরে দুর্গাপুজোর প্রচলন থাকলেও ১৫০ টি পরিবারের বসবাসের  কড়িধ্যায়  দুর্গাপুজোর কোনও প্রচলন নেই। তবে, গ্রামে দুর্গাপুজোর প্রচলন না থাকলেও কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর  প্রচলন রয়েছে। তাই, গ্রামের মানুষ  ঠিক করেন যে,  গ্রামের মানুষের  আর্থিক সহায়তায় কড়িধ্যা গ্রামে মন্দির নির্মাণ করে সাড়ম্বরে এবার  থেকে দুর্গাপুজোর প্রচলন  করা হবে। সেই মতো প্রস্তুতি নিয়ে দুর্গা মন্দির তৈরীর কাজে হাতও দেওয়া হয়। কিন্তু করোনার জন্য দীর্ঘদিন মন্দিরের নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায়, মন্দির নির্মাণের কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে।  তাই, কড়িধ্যাবাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, এবার  রীতি মেনে  কেবলমাত্র লক্ষ্মীপুজোই হবে গ্রামে। আগামী বছর  মহা সমারোহের মধ্য দিয়ে কড়িধ্যা গ্রামের নতুন মন্দিরে অধিষ্ঠান হবে দেবী দুর্গার ।।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *