হলদিয়ার সিধু জ্যাঠা কে চিনুন

ক্রীড়া সংস্কৃতি

হলদিয়ার সিধু জ্যাঠা

আরিফ ইকবাল খান
হলদিয়া অনেকেই তাকে হলদিয়ার সিধু জ্যাঠা বলেন । একেবারেই ফটোগ্রাফিক মেমোরি । ফেলুদার বাবার বন্ধু সিধু জ্যাঠা সিদ্দেশ্বর বসুর পেপার কাটিং এর নেশা ছিলো । ফেলুদা হামেশাই তাঁর কাছে নানা সমস্যা নিয়ে যেতেন । সোনার কেল্লা , কৈলাসের কেলেংকারি , গোরস্থানে সাবধান কিংবা হালফিলের ডাবল ফেলুদাতেও সিধু জ্যাঠাকে দেখা গেছে । গুগলবাবার সময়ে সিধু জ্যাঠা কতটা প্রাসঙ্গিক এই প্রসঙ্গ উঠলেও হলদিয়ার সিধু জ্যাঠা কিন্তু বেফিকির । এসব নিয়ে তাঁর কোন ভাবনা নেই । হলদিয়ার বারসুন্দরা গ্রামে ছবির মত পরিবেশে তাঁর বাড়ি । হলদিয়া বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মীর প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল গ্রামের মধ্যেই তাঁর বাড়ি করবেন । বিরাট এলাকা জুড়ে একতলা বাড়ির চারপাশেই রয়েছে অসংখ্য গাছ । লম্বা লম্বা শাল – সেগুন – আম – অর্জুন গাছের ছায়ায় দূর থেকে বাড়িটা দেখাই যায়না । বাড়ি জুড়েই তাঁর পেপার কাটিং আর শারদ সংখ্যার আর্কাইভ । বলা ভালো বিভিন্ন পত্র পত্রিকার আর্কাইভ বানিয়েছেন নিজের বাড়িতে । ১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার সমস্ত রবিবাসরীয় তাঁর সংগ্রহে রয়েছে । রয়েছে দেশ এর সমস্ত শারদ সংখ্যা । আনন্দবাজার দেশ ছাড়াও নবকল্লোল , উল্টোরথ , প্রসাদ , সন্দেশ , শুকতারা্‌ আনন্দমেলার শারদ সংখ্যার প্রায় সবকটি সংখ্যা আগলে রেখেছেন তিনি । সিধু জ্যাঠার মত একবার বললেই হোল সঙ্গে তিনি বের করে আনবেন তাঁর সংগ্রহ। শুধু কি চাই বলতে হবে । সমস্ত কিছুই যত্নে করে রাখা । বাড়ি ভর্তি তাঁর বইয়ের লাইব্রেরী । পরম মমতায় তিনি এসব সংগ্রহ কবি – সাহিত্যিকদের দেখান । তাঁর আক্ষেপ, আগে নানা মানুষ লেখার সুত্র গবেষনার কাজে আসতেন । ইদানিং তেমন কেউ আসেনা । তবু কুছ পরোয়া নেই । নিজেই সারাদিন উলটে পালতে দেখেন তাঁর এই সংগ্রহশালা ।তাঁর সংগ্রহশালায় কি রয়েছে ? ১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত দেশ , আনন্দবাজার পত্রিকা , নবকল্লোল , প্রসাদ সহ একাধিক শারদসংখ্যা যত্নে বাঁধিয়ে রেখেছেন তিনি ।১৯৫০ সালের বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা রয়েছে তাঁর সংগ্রহে । ১৯৫৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার শারদসংখ্যায় প্রকাশিত তারাশঙ্কর বন্দ্যপাধ্যায়ের সপ্তপদী উপন্যাসটিও রয়েছে তাঁর সংগ্রহে ।নন্দলালবাবু জানান , যেখানেই পুরনো বইয়ের সন্ধান পেতাম চলে যেতাম । এভাবেই বহু দুষ্প্রাপ্য সংখ্যা সংগ্রহ করেছি । আনন্দবাজার পত্রিকার দাম যখন দশ পয়সা তখন থেকেই তিনি সংগ্রহ করতেন । হলদিয়ায় এই কাগজ এসে পৌঁছত প্রায় সন্ধ্যার সময় । পোস্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হত । নন্দলালবাবুর সংগ্রহে রয়েছে আনন্দবাজারের রবিবাসর , বার্ষিক ও শারদীয় আনন্দবাজার , দেশ পত্রিকার সাপ্তাহিক ও বিশেষ সংখ্যা , শারদীয় ও পাক্ষিক আনন্দমেলা , শারদীয় আনন্দলোক , প্রতিক্ষণ , শিলাদিত্য , কৃত্তিবাসের মত বিরল সব কিছু পরম মমতায় রেখেছেন নন্দলালবাবু ।নন্দলাল বাবু বাণিজ্যর স্নাতক , দুবছর কলকাতায় গভঃমেন্ট আর্ট কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি । কিন্তু এখন সবকিছুই এই পত্রিকাগুলি । শুধু যক্ষের ধনের মত আগলে রাখা নন , তিনি গড় গড় করে বলে দিতে পারেন কোন সংখ্যায় কি গল্প রয়েছে । নন্দলালবাবু বলেন , বাসুদেব মালাকারের গল্প – জলঙ্গী , সুনীল গাঙ্গুলির – বৃত্তের বাইরে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের – ট্যাংকি সাপ , ইন্দ্রাণী লস্করের -বপন ,মানব চক্রবর্তীর- যে আছে সেতো আছে পেছনেই এরকম অসাধারন গল্প তাঁর স্মৃতি কোঠায় এখনও উজ্জ্বল । স্ত্রী নমিতা দাস এবং কন্যা লোপামুদ্রা বাবার এই কাজে সহযোগিতা করেন । স্ত্রী নমিতা জানান , মানুষটি পড়তে খুব ভালোবাসেন ।সন্তানের স্নেহে এসব তিনি আগলে রাখেন । হলদিয়া বন্দরের উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান নন্দলাল জানান , আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়গুলির নানা সময়ে বিবর্তন হয়েছে । নতুনদের লেখা পড়ে অনেকসময় বিস্মিত হই । সত্যি কথা বলতে কি বাংলা সাহিত্যের উত্তরনের ইতিহাস আমার কাছে ধরা আছে এটা ভাবলেই খুব আনন্দ হয় ।অনেকেই মাঝে মাঝে আসেন এই সংগ্রহশালা দেখতে । হলদিয়ার গবেষক ও লেখক মধুপ রায় জানান , গ্রন্থাগার থেকে মানুষ যখন বিমুখ হয়েছে সেখানে এই ধরনের মানুষ সত্যি বিরল । অনেকেই তাকে আড়ালে আবডালে বলেন হলদিয়ার সিধু জ্যাঠা । নন্দলালবাবু বলেন, জানিনা আমার পরে এই সংগ্রহশালার কি অবস্থা হবে ভেবে কুল কিনারা পাইনা । হলদিয়ার সিধু জ্যাঠার কপালে শীতের বিকেলেও চিন্তার ঘাম ।


সিধু জ্যাঠার ফোন নম্বর 9046651678

Leave a Reply

Your email address will not be published.