পঞ্চায়েতে ‘ব্রাত’ সিদ্দিকুল্লাহ গুরত্ব পাচ্ছেন লোকসভার প্রাক্কালে

রাজনীতি

মোল্লা জসিমউদ্দিন,

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে মঙ্গলকোট বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী কে একপ্রকার রাজনৈতিক সন্ন্যাস দেওয়া হয়েছিল। সেসময় পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পঞ্চায়েতে আসনরফায় রুস্ট হয়ে সিদ্দিকুল্লাহ সরকারি গাড়ী – নিরাপত্তারক্ষী ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনকি রাজ্য মন্ত্রীসভার মাসিক পর্যালোচনা বৈঠকে গড়হাজির ছিলেন। পূর্ব বর্ধমান জেলা পুলিশের বিরুদ্ধে সিদ্দিকুল্লাহের সংগঠন জমিয়ত উলেমা হিন্দ স্মারকলিপি পর্যন্ত দেয়। বাংলায় অনুগামীদের বিশেষত মঙ্গলকোটের অনুগামীদের প্রবল চাপ ছিল ইস্তফা দেওয়ার। অনেকেই লালবাতির ক্ষমতালোভী বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। পরিস্থিতি বদল ঘটছে বাংলার রাজনীতির বলয়ে। মঙ্গলকোটের যে ব্লক অফিসে সভা করতে পারতেন না, সেই সিদ্দিকুল্লাহ চলতি মাসে জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করছেন। যে কাটোয়া মহকুমাশাসক অফিসে পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র (দ্বিতীয় পর্যায়ে) তুলতে গিয়ে মাথা ফেটেছে ভাইপোর। সেই মহকুমাশাসক অফিসের চেম্বারে জেলা গ্রন্থাগার মেলার প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক সারছেন সিদ্দিকুল্লাহ। স্থানীয় পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় মঙ্গলকোটের আটঘড়ায় দলের একাংশ কালোপতাকা দেখিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ করেছিল সিদ্দিকুল্লাহ কে। এই ঘটনায় তৎকালীন পুলিশসুপারের বিরুদ্ধে তাঁর অফিসেই স্মারকলিপি দিয়েছিল সিদ্দিকুল্লাহের জমিয়ত উলেমা হিন্দ। বর্তমান পুলিশসুপার কে নিয়ে চলতি সপ্তাহে ২৭ তম বইমেলার উদ্বোধনীতে হাজির সিদ্দিকুল্লাহ। পুলিশ প্রশাসনের এহেন পটপরিবর্তন কেন সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী কে নিয়ে? প্রশ্ন উঠাটা স্বাভাবিক। পুলিশ ও প্রশাসনের দুই আধিকারিক নাম গোপন রাখার শর্তে জানান – “উপরওয়ালাদের যেরকম নির্দেশ থাকে, সেইরকম অবস্থান আমাদের নিতে হয় । ” তাহলে কি গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে পুরোপুরি উপেক্ষা করার অলিখিত নির্দেশিকা ছিল? এই প্রশ্ন অবশ্য তাঁরা এড়িয়ে গেছেন। যে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী কে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে মঙ্গলকোটে শুন্য করে রাখা হয়েছিল। সেই সিদ্দিকুল্লাহের ‘কদর’ কেন বাড়ছে। তৃনমূলের এক রাজ্য নেতা জানান – “মঙ্গলকোটের স্থানীয় রাজনীতিতে কোন ফাক্টর নন সিদ্দিকুল্লাহ, তবে লোকসভায় বঙ্গ মুসলিমদের ভোটব্যাংকে তাঁর প্রভাব অটুট “। উল্লেখ্য আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে সংখ্যালঘু ত্রিশভাগ ভোট নিয়ে জোড়াফুল বনাম পদ্মফুলে চলছে অঙ্ক কষাকষি। ইতিমধ্যেই কলকাতা পুরসভার ‘প্রথম’ মুসলিম মেয়র হিসাবে ফিরহাদ হাকিম কে প্রজেক্ট করে সংখ্যালঘুদের পাশে থাকার বার্তা দিতে চাইছে তৃনমূল। অপরদিকে বিদ্রোহী কবি কাঁজি নজরুল ইসলাম কে নিয়ে প্রচারে আসতে হোমওয়ার্ক করে রেখেছে বিজেপি। ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে বাংলার মুসলিম সমাজ কাকে বেছে নেবে, তা নিয়ে নিশ্চিত নয় দুপক্ষই। গত ৪ ডিসেম্বর কলকাতায় লাখো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনদের নিয়ে সমাবেশ ঘটিয়ে তাঁর নিজস্ব সাংগঠনিক ক্ষমতার অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছেন জমিয়তের সিদ্দিকুল্লাহ। গত বছর তিন মন্ত্রী এলেও এবারে কারও দর্শন মেলেনি জমিয়ত উলেমা হিন্দের মঞ্চে। তাই তৃনমূল লোক ভরিয়েছে, এই বার্তা ঠিক নয় তা বুঝিয়েছেন সিদ্দিকুল্লাহ। আবার ৬ ডিসেম্বর তৃনমূল নেত্রী কে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসানো স্বপ্ন নিয়ে বেশকিছু সংখ্যালঘু সংগঠন মিছিল করেছিল। সেখানে অবশ্য জনাসমাগম ঘটেনি।রাজনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, রাজ্যের বেশিরভাগ লোকসভা আসনে মুসলিম ভোট বড় ফাক্টর। যেভাবে তৃনমূল বনাম বিজেপির মুখোমুখি লড়াই হতে চলেছে। সেখানে তৃনমূলের রাজ্যভিক্তিক মুসলিম ধর্মীয় গুরুর খুবই প্রয়োজন। তৃনমূলের যারা মুসলিম রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন তাদের মুসলিম সমাজে রাজ্যস্তরের জনভিক্তি নেই। আবার যারা বাম দল ছেড়ে রেজ্জাক মোল্লা, আবু আয়েষ মন্ডল দের এসেছেন জোড়াফুল শিবিরে।তাদের নিয়েও লাভের তুলনায় লোকসানের হিসাব কষছেন অনেকেই। ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে গত ৪ ডিসেম্বর কলকাতায় একক শক্তিতে মহাসমাবেশ ঘটিয়ে চনমনিয়ে জমিয়ত উলেমা হিন্দের নেতা সিদ্দিকুল্লাহ। আসাম রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাংসদ শতাব্দী রায়ের সাথে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী কে দেখা গেছে। মঙ্গলকোট বিধায়ক কে বরাবর এড়িয়ে চলা পূর্ব বর্ধমানের জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে ঘন ঘন সভা দেখা যাচ্ছে সিদ্দিকুল্লাহের সাথে। এমনকি আসন্ন জেলা গ্রন্থাগার মেলায় মঙ্গলকোটে পানীয় জলের ট্যাংক সহ অনান্য পরিষেবা প্রদানে এগিয়ে আসছে সিদ্দিকুল্লাহর দুচোখের বিষ অনুব্রত অনুগামী মঙ্গলকোট পঞ্চায়েত সমিতি কে। তাই বলায় যায় গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্রাত সিদ্দিকুল্লাহ কে ক্রমশ গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন লোকসভার প্রাক্কালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.