রাজনীতি

ভারতীয় রাস্ট্রদর্শন – কম্যুনিজম – সুবিধাবাদ

ভারতীয় রাষ্ট্রদর্শন–কম্যুনিজম–সুবিধাবাদ

স্নেহাশিস চক্রবর্তী

( ১ )

ভারতবর্ষের ইতিহাসবোধের মধ্যে গ্রন্থিত হয়ে আছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা, আর হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ভিত্তিই এটা । ধর্মকে শুধুমাত্র এককথায় ‘আফিম’ বলে উড়িয়ে দিয়ে যারা ভারতবর্ষে রাজনীতির শিকড় প্রোথিত করতে চেয়েছেন তারা সমূলে উৎপাটিত হয়েছেন কয়েক দশকের মধ্যেই, প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক সব সময়কালেই বুঝিবা এটাই অদৃষ্টের লিখন । হয় জাতপাত-ধর্মকে মেনে নিয়ে টিকে থাকো, নচেৎ ‘অসীম’- এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করাই বুঝিবা শ্রেয়তর ।

চলুন, বিষয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি । সমগ্র বিশ্বেই ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটির সাথে যতই কার্ল মার্ক্স বা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের নাম জড়িয়ে থাকুক না কেন, এই ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটির আক্ষরিক রূপদান সম্ভবত প্রথম করেছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, এ কথা মনে হয় মেনে নিতে কেউই দ্বিধান্বিত হবেন না । লেনিন বলেছিলেন, ”আমরা মার্ক্সের তত্ত্বকে পরিসমাপ্ত ও স্পর্শাতীত কিছু একটা বলে দেখি না । উল্টে আমরা বরং মনে করি যে তা একটা বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করেছে।” লেনিনের সৃজনমূলক সাফল্যের দ্যোতক ছিল এমন বার্তা, তৎকালীন জার সাম্রাজ্যের মানুষদের কাছে, যা রুশ বিপ্লবকে অবশ্যই ত্বরান্বিত করেছিল, নিঃসংশয়ভাবেই এ কথা বলা যায় । এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই একটা কথা মনে রাখতে হবে, কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কিন্তু মনে করতেন, একগুচ্ছ উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত না হলে একে ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন । আমরা রাশিয়া ছাড়া চীন, কিউবা বা ভিয়েতনাম বাদ রাখলে সমগ্র বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নিদর্শন কিন্তু মাইক্রোস্কোপেও খুঁজে পাই না । রাশিয়াতে কিন্তু লেনিনই হঠাৎ করে এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন এমন মনে করার কারণ নেই একদমই । কারণ রাশিয়ার রাজা বা সম্রাটরা বা ‘জার’-রা প্রায় ২০০ বছর ধরেই ( বলশেভিক আন্দোলনের পূর্বে অবশ্যই ) নারদানিক বা জনগণের বন্ধুদের দ্বারা পরিচালিত কৃষক আন্দোলন ও শ্রেণী শত্রুদের ক্ষতম করে দেওয়ার প্রয়াস জারি রেখেছিলেন। তাই বলা যেতে পারে লেনিন একটা পটভূমি পেয়েছিলেন যা ত্বরান্বিত করেছিল ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ( ১৮৫৩ – ১৮৫৬ ) জারেদের হারের ইতিহাস ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ( ২৮শে জুলাই ১৯১৪ থেকে ১১ ই নভেম্বর ১৯১৮ ) সার্বিয়াকে সাহায্য করতে গিয়ে জার্মানির হাতে সামরিক নাস্তানাবুদ ও দেশের ভিতর বলশেভিকদের প্রবল পরাক্রম ও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাশিয়া জার্মানির কাছে পরাজয় বরণ করে রণে ভঙ্গ দেওয়া । যদিও পরবর্তীতে আমেরিকা জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধে নেমে জার্মানিকে পরাজয়ের দ্বারে হাজির করে, যেটি আর জার সম্রাটদের দেখা সম্ভব হয়নি । আসলে লেনিনের চরম সময়ে ( ১৯১৭ ) চরম ধাক্কা দেওয়া ছাড়া উপায়ান্তরও ছিল না। লেনিনকে তার নিজস্ব এই সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্যে প্রায় কুড়ি-তিরিশ বছর ধরে তৈরি হতে হয়েছে ও ১৫ বছর ধরে প্রচার করে যেতে হয়েছে ‘হোয়াট ইস টু বি ডান’ ( ১৯০২ সালে প্রকাশিত ) পুস্তকের মাধ্যমে বলশেভিক আন্দোলনকে সাফল্য এনে দিতে । রাশিয়ায় শুরু হল এই আধুনিক যুগে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকারের পথচলা – লক্ষ্য শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্যবাদের চূড়ান্ত রূপে পৌঁছানো । এই বিষয়ে আর অধিক আলোচনা করলাম না, আমাদের বিষয় যেহেতু ভারতীয় রাষ্ট্রদর্শনে এসে উপস্থিত হওয়া, চলুন সরাসরি আমরা ঢুকে পড়ি ভারতবর্ষে । 

( ২ )
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষে যথেষ্ট মজবুত এক আসনে অধিষ্ঠিত যখন, তখন ক্রমশ ভারতে সমাজতান্ত্রিক চেতনার মানুষদের আবির্ভাব হতে শুরু করে । যদিও ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ( ১৯০৩ ) –কে রূপদান করতে গিয়ে ব্রিটিশরাজ প্রথম ধাক্কা খান ভারতবাসীদের সার্বিক আন্দোলনে এবং ১৯১২ সালে ঢোক গিলে বঙ্গভঙ্গ আইনকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। আর ভারতে এই সময় ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজ রাজশক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনকে পরিচালনার ভার ক্রমশ হাতে তুলে নিয়েছেন, শুরুর সময় থেকে ( ১৮৮৫ ) এই ১৯১৫ বা ১৯১৭ সাল অবধি কিন্তু ভারতীয় এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন ভারত রাষ্ট্রের বাঙালি চিন্তাবিদরাই । ঠিক এমন সময় ১৯২০ সালে রাশিয়ার তাসখন্ডে গড়ে তুললেন ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি বা সি পি আই ( ১৯২০ সালের কম্যুনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় অধিবেশনের পরে ), যে কমিটিতে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয়রাই প্রধানত পরিচালন ভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন, উদাহরণ- সস্ত্রীক এম এন রায়, সস্ত্রীক অবনী মুখার্জী প্রমুখ । এরপর কার্যত ভারতবর্ষে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের চেষ্টায় বাংলা থেকে মুজাফফর আহমেদ, মুম্বাই থেকে এস এ ডাঙ্গে, মাদ্রাজ থেকে চেত্তিয়ার প্রমুখের নেতৃত্বে অধিবেশনের মাধ্যমে ( ৫০০ ‘র মতো অংশগ্রহণকারী সদস্য হাজির ছিলেন এই অধিবেশনে ব্রিটিশ রাজশক্তির তেমনই অনুমান ছিল ) ১৯২৫ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর কানপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি বা সি পি আই । ১৯২০ থেকে ১৯২৪ ভারতে কম্যুনিস্ট আন্দোলন একেবারে নিষিদ্ধ ছিল এবং বেশ কিছু মামলাতে ব্রিটিশ রাজশক্তি চেয়েছিলেন সাম্যবাদীদের সমাজতান্ত্রিক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করে কম্যুনিস্ট আন্দোলনকে ভারত থেকে চিরবিদায় জানাতে, উদাহরণ- পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা, কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা ইত্যাদি । ঠিক এই কারণেই গড়ে ওঠার আগেই ভারতে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের নেতাদের আত্মগোপন করতে হয় বহুলাংশে । দলীয় কার্যকলাপ চালাতে গিয়ে মতানৈক্য এসেছে বারবার, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতোই কম্যুনিস্ট পার্টির ভিতরেও নরমপন্থী-চরমপন্থী বিরোধ দানা বেঁধেছিল শুরুর সময় থেকেই, এটি কতটা আদর্শবাদকে ভিত্তি করে তা কিন্তু কেউ উত্তর দিতে পারবেন না, বরঞ্চ উল্টোদিক থেকে এটি ব্যক্তিত্বের লড়াই হিসেবেও দেখা যেতে পারে ।

কম্যুনিজমের মতাদর্শ – সমাজের মানুষের শ্রেণীই একমাত্র বিপ্লবের মূল ভিত্তি । শ্রেণীসংগ্রামের মাধ্যমে শ্রেণীচেতনা বৃদ্ধিই একমাত্র কাঙ্ক্ষিত ও সমাজকাঠামোর পরিবর্তন সাধন একমাত্র সম্ভব এই শ্রেণী-সংগ্রামেই । এখানেই মনে হয় ভারতীয় চেতনায় ‘কম্যুনিজম’ শব্দটির সবথেকে বড়ো বাঁধা । কারণ আমরা আগেই বলেছি ভারতবর্ষে সমাজের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা, আর হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ভিত্তিই ভারতবর্ষে এটা । তাই ধর্মকে উড়িয়ে দিয়ে ভারতবর্ষে ‘কম্যুনিজম’-এর সাফল্য কতখানি আসতে পারে, এই বিষয়টা মনে হয় ভারতীয় কম্যুনিস্ট নায়করা ভেবে দেখার সময়ই পাননি । যদিও বর্তমান সময়কালে ভারতীয়দের মধ্যেই কম্যুনিস্ট সমাজকে নিয়ে আলোচনা চলে যে, ভারতীয় কম্যুনিস্টরা বোঝেন সবটাই কিন্তু সেটা বেশ খানিকটা দেরিতে, আর এই দেরির ফসল হিসেবে ভারতে হারিয়ে গিয়েছে সত্যিকারের কম্যুনিস্ট চেতনাসমৃদ্ধ অনেক অনেক মানুষ, যারা মূল্যায়িত হতে পারতেন, কিন্তু ঐ হঠকারী ‘দেরি’ শব্দটির কারণে সেটি চির অবরুদ্ধই থেকেছে, হারিয়ে গিয়েছে বিভিন্ন প্রজন্মের বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক মানুষের মুখ । আসলে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা ভাবতেন, “আগে বিপ্লব সংগঠিত হোক, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে” । অর্থাৎ ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোত্রের এই আচরণ এই কারণেই সারা ভারতে কখনোই দানা বেঁধে উঠতে পারেনি ।  সমাজের মূল স্রোতেও থাকব, উল্টোদিকে শ্রেণীসংগ্রামও জারি থাকবে – এ হেন ধারণা, ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু কি ? পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিজেদের দেশীয় শিল্পকেও আন্দোলনের নামে ধরাশায়ী করেছে বাম আন্দোলনের ধারা, অন্তত ভারতবর্ষের নিরিখে – এ কথা আজকে কিন্তু দুই বা তিন প্রজন্ম আগের কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সমর্থকরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন, কারণ আজকে এই দুই বা তিন প্রজন্ম পরে না আছে বিদেশী বিনিয়োগ, না আর টিকে আছে কোনো দেশীয় শিল্প, যা নতুন প্রজন্মের অন্ন সংস্থান করতে পারত ।

আসলে বুঝেও না বোঝা, ভারতীয় কম্যুনিস্টদের জন্মলগ্ন থেকেই রয়ে গিয়েছে । ভারতীয় কম্যুনিস্ট দলের অন্দরেই একটি দ্বিতীয় সত্তা বা প্যারালাল স্রোত বা শক্তি কিন্তু প্রথম থেকেই চলেছে দুর্নিবার গতিতে । ভারতীয় রাজনীতির ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ দুই মানবসন্তান নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্বন্ধে কম্যুনিস্টদের মূল্যায়নের ভিত যে কতখানি দুর্বল ছিল আজ তা প্রকাশ্যে এসেছে, যখন দেখি – নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন বা তার অবদান সম্বন্ধে এই ভারতীয় কম্যুনিস্টরাই এখন কত সময় ও স্তোকবাক্য দিয়ে চলেছেন । আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য – জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন করে যেন বুর্জোয়া কবি হিসেবে মূল্যায়িত হন ভারতীয় কম্যুনিস্টদের কাছে, অথচ আজ ঘড়ির কাটা উল্টোপথে এসে কম্যুনিস্টরাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালন করেন রবীন্দ্র-কবিতা পাঠ করতে করতে, শ্রেণীসংগ্রামের নায়ককে কি আমরা হারিয়ে ফেলি না ? আসলে সুভাষচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে ভারতের স্বাধীনতা এনে সমাজতন্ত্রের পথে দীর্ঘ পথ হাঁটতে, কিন্তু একমাত্র ভারতীয় কম্যুনিস্টদের কাছেই তিনি অবমূল্যায়িত ও ব্রাত্য, শুধু তাই নয়, ‘সাম্রাজ্যবাদী জাপানের দালাল’ ও ‘তোজোর কুকুর’ ইত্যাদি অশ্লীল বাক্য প্রয়োগে নেতাজীর চরিত্রহনন করতেও বাঁধেনি ভারতীয় কম্যুনিস্টদের । আর ১৯৩৪ সালে রবীন্দ্র-উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’ জবাব হিসেবে রয়ে গেল ভারতীয় কম্যুনিস্টদের জন্য তোলা, কি করে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা একে অপরকে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার কারণে হত্যা করতেও পিছপা নন তার প্রমাণ হিসেবে ।

পরাধীন ভারতবর্ষে ভারতীয় কম্যুনিস্টদের আমরা যেমন দুটি রূপকে দেখছি, একই ভাবে স্বাধীন ভারতে বিশেষ করে ১৯৬২ সালে আমরা কম্যুনিস্টদেরকে দেখেছি দুটি দোলায় দুলতে, একদিকে দেশপ্রেম অপরদিকে আন্তর্জাতিক স্তরে চীনের ভারত আক্রমণ । কিছুটা চরমপন্থী ( পরবর্তীর মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি বা সি পি এম, মাওপন্থী ) কম্যুনিস্টরা ভারতীয় সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ শ্লোগানে মুখরিত করেছিল, এ কথা সত্য । অথচ আজকে যারা নতুন প্রজন্ম তাদেরকে বোঝানো হয়, অমন শ্লোগান তুলেছিল মাওপন্থী ভারতীয় কম্যুনিস্টরা, কিন্তু আদতে দলের অভ্যন্তরে বিভাজন রেখা স্পষ্ট থাকলেও ভারতীয় কম্যুনিস্ট দল কিন্তু বিভক্ত হয় ১৯৬৪ সালে, তাই তর্কাতীতভাবেই নতুন প্রজন্মের নতুন ভাবনার দ্যোতক হয়ে এসেছে কিছুটা অবিশ্বাস । কারণ স্বাধীনতার পরে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পাশে থাকলেও, দলের বিভক্তিকরণের পরে কিন্তু ভারতের জাতীয় কংগ্রেসকেই প্রধান শ্রেণীশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে অন্তত মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি । আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধতা করতে গিয়ে কখন যে তারা কংগ্রেসের চেয়েও অতি দক্ষিণপন্থী দল বি জে পি ‘র হাতই শক্ত করে বসল, সেটা আজকের দিনে হারে হারে টের পাচ্ছে মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্টরা । স্বাধীনতার ৭০ বছরের ইতিহাসে প্রায় পঞ্চাশ বছর যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল মূল শ্রেণীশত্রু – আজ সেই কংগ্রেসের হাত ধরেই কিন্তু বি জে পি-কে প্রথম শ্রেণীশত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ভারতীয় কম্যুনিস্টদের ( বিশেষ করে মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টিকে ) টিকে থাকার লড়াইতে থাকতে হচ্ছে । জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে টিকে থাকতে গিয়ে কম্যুনিস্ট মতাদর্শ থেকে সরে এসে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আশ্রয়ের তলায় এখন রাষ্ট্রক্ষমতার অলিন্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে ভারতীয় কম্যুনিস্টদের সকল ধারাই । পপ্যুলিস্ট রাজনীতির অলিন্দে এখন ভারতীয় কম্যুনিস্টরা আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছেন, কোন কম্যুনিস্ট নেতার কয়তলা বাড়ি আর তিনি ব্যক্তিগতভাবে কতটা অর্থনৈতিক সক্ষম, নেতৃত্বে পৌঁছানোর এটাই এখন সহজতম পথ । ভোটপন্থী ( পপুলিস্ট রাজনীতি ) বাম নেতা আর ডান নেতার মধ্যে এখন প্রভেদ খুঁজে বার করা খুবই শক্ত কাজ । হয়তো বর্তমানের বি জে পি’র উত্থান কখনো অবদমিত হয়ে আবার কোনো দক্ষিণপন্থী ( ধরুন কংগ্রেস বা তেমন কিছু ) ভারত শাসনে হাজির হলে একদিকে থাকবে সরকারে যাওয়ার এক প্রবল ইচ্ছা, আর সেটি বাস্তবায়িত না হলেই প্রয়োজনে অতি দক্ষিণপন্থী বি জে পি’র সাথে ভোটরফা করে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা বাঁচার চেষ্টা করবেন । কি মর্মন্তুদ এক ইতিহাসের সাক্ষী হতে হতে আমরা চলেছি ভারতীয় কম্যুনিস্ট ইতিহাসের ধারাকে দেখলে । নন্দীগ্রাম–মরিচঝাপি’র মতো কান্ড যে এই কম্যুনিস্টদের দ্বারা আবার সংঘটিত হবে না, সেই অবিশ্বাসের চোরাস্রোতে ভারতীয় কম্যুনিস্ট আন্দোলন আজ দিশেহারা । আপোষকামী মার্ক্সবাদীরা দলের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই ফিরিয়ে এনেছিলেন চোর বদনাম করার পরেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো মানুষকে জ্যোতি বসুর উত্তরসূরি হিসেবে। আসলে পপুলিস্ট রাজনীতির অলিন্দে নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ভোটসর্বস্ব রাজনীতির অলিন্দেই দীপ্যমান থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন আজকের ভারতীয় কম্যুনিস্ট নেতা নেত্রীরা ।  বিশ্ব রাজনীতিতেই ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া কম্যুনিস্টরা আদপেই আর মাথা তুলে দাঁড়াতে কত প্রজন্ম পরে পারবেন এটিই এখন মুখ্য সংশয় । তাই বুঝি নবারুন ভট্টাচার্য বলেছেন – “১৯৮৯ এর পর থেকে বিশ্বে যা ঘটে গেছে তার সঙ্গে তাল রেখে, আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি তালকানা লেখক ও সেইসঙ্গে ভিতু বক্সারে পরিণত হয়েছি। এই অবস্থানটা সুখকর নয়।”

( ৩ )

হাজার বছরের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে এটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে উজ্জ্বলভাবেই দেখা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ, শংকরাচার্য, শ্রীচৈতন্য ভারতীয় শিক্ষিত অশিক্ষিত সকল মানুষের মধ্যেই বিরাজ করেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবেই। এইধারাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন গত ১২০০ বছরের মধ্যে অন্তত দুইবার, প্রথমবার – নবম শতকে শঙ্করাচার্য আসেন, যিনি প্রচার করেন, আত্মাই হল ব্রহ্ম । এই ব্রহ্ম নির্গুণ এবং আনন্দময় । কিন্তু ব্রহ্ম আবার পারমার্থিক দৃষ্টিতে ব্রহ্ম হলেও ব‍্যবহারিক দৃষ্টিতে ঈশ্বর বলে প্রতিভাত হয় । অবিদ‍্যা ব্রহ্মের শক্তিবিশেষ, যার ফলে জীব নিজেকে ব্রহ্মের থেকে ভিন্ন মনে করে । প্রকৃতপক্ষে , জীবাত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন । শংকরাচার্য বলেন, “সঠিক বিদ‍্যা না থাকার ফলে মানুষ ব্রহ্মকে বুঝতে পারে না'' । দ্বিতীয়বার পঞ্চদশ শতকে ভারতীয় সত্তাকে যখন চরমভাবে ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতির চরম অবস্থায় উপনীত হয় তখন শ্রীচৈতন্য আবির্ভূত হয়ে হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করেছেন বলা যেতে পারে ।


এই যেখানে ভারতের সামাজিক অবস্থান, সেখানে ‘ধর্ম মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ’ বলে দেগে দিয়ে ভারতীয় সত্তাকে পরিচালিত করতে গিয়ে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন গত একশ বছরে বারবার। তাই বলে বামপন্থার আদর্শকে মানেন না – এ কথা কিন্তু ভারতীয় জনসত্তা কখনো বলেননি, বললে হয়তো আজও লক্ষ লক্ষ ভারতীয় লাল পতাকা বহন করে বেড়াতেন না । কিন্তু ক্রমশ পপ্যুলিস্ট রাজনীতির ধ্বজা ধরতে গিয়ে এই মানুষগুলির চোখে বারবার ভারতীয় কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দ হার মেনেছেন নিজেদের অজ্ঞতাপ্রসূত কারণেই । রাশিয়াতে যেখানে প্রজা বিদ্রোহের নিরন্তর উদাহরণ আছে ভারতীয় সমাজে এমন উদাহরণ হাতে গোনা । তাই এইখানে ভারতীয় পপ্যুলিস্ট কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দরা আরো সরে গেলেন মানুষের মন থেকে যখন দেখা যায় যে কম্যুনিস্ট নেতা পাড়ায় পূজার নেতৃত্ব দেন বা পৌত্তলিক মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে করজোড়ে দেব বা দেবীর আশীর্বাদ ভিক্ষা করেন, যাগযজ্ঞের আয়োজনেও তারা আছেন, মৃত্যুজনিত অশৌচ পালনেও তারা আছেন, মৃত্যুজনিত পারলৌকিক শ্রাদ্ধাদির মধ্যেও তাদের অবস্থান বড়োই প্রকট করে ভারতীয় কম্যুনিস্টদের আদর্শহীনতার চরিত্রকে অথবা কখনোই ভারতের মতো একটি ধর্মীয় অনুশাসনে আশ্রিত দেশের মানুষকে কম্যুনিজমে আনা সম্ভবপর নেই জেনেও সুবিধাবাদকে আশ্রয় করে কথায় কথায় রাশিয়া, চীন-এর উদাহরণ টেনে ভারতীয় জাতিসত্তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন ।

আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ধুয়ো তুলে আজকের ভারতীয় কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দ নিজেদের আখের গোছাতেই অনেক বেশি ব্যস্ত । সংসদীয় পদ্ধতির মাধ্যমে পদপ্রাপ্তির পরে নামে বেনামে ব্যক্তিগত-পুঁজির সন্ধানেই অনেক বেশি রত ভারতীয় কম্যুনিস্টরা । ‘কম মন্দ’ কিন্তু মন্দ – সেখানেই আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজেদের প্রায় নিভে যাওয়া প্রদীপের টিমটিমে আলোকে জ্বালিয়ে রাখতে। অপেক্ষা শুধু সময়ের, ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ অথবা ‘একনায়কতন্ত্রীর সব হারানো’ হয়তো এর কোনো এক দর্শনের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ আমরা। সত্য দর্শন অবশ্যই ইতিহাসের নতুন উৎস হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *