রাজনীতি

আব্বাস সিদ্দিকীর উপর আক্রমণ ও বাঙালি মুসলিম প্রসঙ্গে – ইসমাইল দরবেশ

আব্বাস সিদ্দিকীর উপর আক্রমণ ও বাঙালি মুসলমান প্রসঙ্গে

ইসমাইল দরবেশ

আব্বাস সিদ্দিকীর উপরে চড়াও হয়ে একটি দলের সমর্থকরা তাকে হেনস্তা করেছে, তার গাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনেকটা সত্য, তা ভিডিওতে প্রমাণ। ভাঙচুরের তেমন প্রমাণ না থাকলেও তার উপরে গালাগালি ও হম্বিতম্বি স্পষ্ট। কেন, তার প্রতি এই হেনস্থা? এই আক্রমণকে অনেকেই নিন্দা জানিয়েছে। আমিও জানাচ্ছি নিন্দা।
দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ ফুরফুরার বিতর্কিত এই তরুণ আব্বাস সিদ্দিকীকে আমি ওয়াচ করছি। না, তার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোনও মন্তব্য করিনি কখনও। না করার গভীর একটি কারণ আছে। প্রথমত; এই বিষয়ে মন্তব্য করাটা খুব জরুরি বলে মনে করছিলাম না। দ্বিতীয়ত; মন্তব্য এই কারণেই অনেকে করেন না, যে হয়তো তাদের কোনও প্রতিমন্তব্যে নতুন করে ফেতনা তৈরি হবে। সমাজের জন্য তা হিতকর নাও হতে পারে। তার চেয়ে চুপচাপ থাকাই শ্রেয়। আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম।
কিন্তু কয়েকটি কথা না বলেও থাকা যায় না। বিশেষত আমি নিজেও এই সমাজের একটি অংশ। একটি বিষয় খেয়াল করুন, আব্বাস সিদ্দিকী, তার নানান ধর্মীয় মন্তব্যে যখন একটি বড় শ্রেণীর কাছে নিন্দিত হচ্ছিলেন, তখনও কিন্তু তার উপর সরাসরি চড়াও হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। ঘটলো কখন, যখন তিনি রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করছিলেন, ঠিক তখন। মানে, ঘটনা আর যাই হোক, ধর্মীয় নয়। এটা নির্ভেজাল রাজনৈতিক। বাঙালি মুসলিমদের মজহাব-সহিষ্ণুতার উদাহরণও বটে।
আব্বাস সিদ্দিকী ফুরফুরার পীর পরিবারের ছেলে। দাদা হুজুর আবুবকর সিদ্দিকী রহঃ এর চতুর্থ প্রজন্ম। ছোট হুজুরের নাতি। অল্প বয়স্ক। তার মধ্যে একটি তারুণ্যের শক্তি কাজ করে। নবী-রসুল ব্যতীত প্রতিটি মানুষ দোষ ও গুণের সমন্বয়ে গঠিত। আমি লক্ষ্য করেছি আব্বাস সিদ্দিকীর মধ্যেও স্বাভাবিক ভাবেই সেটা কাজ করেছে। কিন্তু এই দোষ ও গুন কখনোই ফিফটি-ফিফটি হয় না স্কেল ধরে। আর এটি চিরস্থায়ী কোনও বিষয় নয়। সময়ের সাপেক্ষে এগুলি পরিবর্তন হতে থাকে। অবশ্যই যে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়। এখনকার আব্বাস সিদ্দিকী বোধহয় অনেকটা সাবলীল এবং হিসেবি — বক্তব্য শুনে তাই মনে হয়েছে।
আব্বাস সিদ্দিকী বেশ চর্চিত নাম। তার বেশ কিছু ধর্মীয় বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছিল। যে বিতর্ক অনেক সময় কওমের বিচ্ছিন্নতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছে, এটা যেমন সত্য; তেমনি আবার এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু থেকে একটি শ্রেণীর কাছে তার বিপুল জনপ্রিয়তাও তৈরি হয়েছে। তার এই অবিশ্বাস্য উত্থানের পিছনে কতকগুলি কারণ আমি লক্ষ্য করেছি —

এক — স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান তরুণদের হতাশাব্যঞ্জক একটি ইতিহাস রয়েছে। শিক্ষা-চাকুরিতে দীর্ঘ বঞ্চনায় দু’তিন পুরুষ ধরে বেশির ভাগ মানুষ কায়িক পরিশ্রমের উপর জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

দুই — অর্ধশিক্ষিত হওয়ার কারণে নিজেদের বিবেক-বিচারে অসহায়ত্ব কাজ করেছে মানসিকভাবে। মুক্তচিন্তার প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়েছে। এক প্রজন্ম নয়, কমপক্ষে তিন চার প্রজন্ম যদি লেখাপড়া থেকে দূরে থাকে তাদের বিবেচনা শক্তি কমবেই। এই লেখপড়া না হওয়ার অন্যতম কারণ বোধহয় অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী না হওয়া।। ফলে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেঠেল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে তারা। ব্যাঙ্গ করে ‘তেনারা’ অবশ্য বলেন ‘লুঙ্গি বাহিনী’। রাজনৈতিক লেঠেল হওয়ার বিনিময়ে খুন হয়েছে, জেল হয়েছে, পারিবারিক বন্ধন ভেঙেছে — কিন্তু আর্থ-সামাজিক অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি।

তিন — দীর্ঘ বাম শাসনে মুসলিম সমাজ দাঙ্গা আতঙ্কের মধ্যে না থাকার কারণে, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হওয়ার কারণে, ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে — কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছিল হয়তো। ফলে খুব সামান্য একটি অংশ সামান্য শিক্ষার মুখ দেখেছে। যৎকিঞ্চিত শিক্ষাগত মান তৈরি হতেই তারা উপলব্ধি করেছে যে তাদের প্রতি ক্রমাগত বঞ্চনা চলছে। মজার বিষয় হলো, সেই শাসনের বিরুদ্ধেই তারা গেলো, যাদের শাসনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল — এমন অভিমানের কথা প্রবীন বামপন্থীদের কাছে শোনা যায়। বুঝলো, বা বোঝানো হলো যে তাদের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার আসলে কেউ নেই। নেতা নেই, সংগঠন নেই। যেহেতু অল্পশিক্ষিত মানুষ তারা, তাদের বক্তব্যটি উচ্চশিক্ষিত তথাকথিত মুসলিম নেতাদের কাছে তুলে ধরতেই পারেনি কখনও। অথবা নেতারাও বধির হয়ে গিয়েছিল।

চার — বাম শাসনের অবসান ঘটার পর রাজ্যে যে পরিবর্তনের সরকার এলো, তাতে পূর্ণ সমর্থন জানালো বাঙালি মুসলমানদের সিংহভাগ। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল এলো না। সেই গ্রাম্য রাজনীতির নোংরামি, কাঁকড়াবৃত্তি। কবরস্থানের প্রাচীর, ইমাম ভাতা আর মুসলিম পোশাক দেখিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা করলো, অচিরেই তা ধরা পড়তে শুরু করলো মুসলমানদের কাছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো শাসক দলকে মুসলিম তোষণকারী দল হিসেবে দাগিয়ে দিতে থাকলো।
কেন্দ্রে সাম্প্রদায়িক বিজেপি দলের শাসন। বিজেপি সেই সুযোগে মুসলিম তোষণের অপপ্রচারটি এতটাই তুঙ্গে তুলে ধরলো যে ঈদের ছুটি ঘোষণা করলেও হিন্দু সমাজের কাছে বার্তা যায় মমতা ব্যানার্জি নাকি মুসলিম তোষণ করছে। সে নাকি মমতাজ বেগম হয়ে গেছে। এটাই আসলে রাজনীতি। শাসক দল তখন উপায়ান্তর না দেখে পাল্টা শুরু করলো হিন্দু তোষণ। কিন্তু তদ্দিন অধিকাংশ হিন্দু জনমানসে জায়গা করে ফেলেছে অন্য একটি উপলব্ধি। চেতনে হোক, অবচেতনে হোক তারা ভাবতে শুরু করেছে হিন্দুদের নিজস্ব দল বিজেপি। যে বা যারা বিজেপির বিরোধিতা করলো, সে আসলে হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করলো। এক ঝটকায় বাম সমর্থকদের অধিকাংশ হিন্দু লোকই রাম সমর্থক হয়ে রাজ্যে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এলো বিজেপি।
মুসলমানরা আরও বেশি হয়ে উঠলো অসহায় এবং কোনঠাসা। অনুভব করতে লাগলো তাদেরকে নাকি ‘জুজু’র ভয় দেখিয়ে শাসকদল আসলে সমর্থন ধরে রাখতে চাইছে। বড্ড অসহায় হয়ে ওঠা আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে ফেলা মুসলিম তরুণদের একটি অংশ নিজস্ব আশ্রয় চাইছে। জুজুর ভয়ে হুজুর নির্ভর হয়ে উঠতে থাকলো ক্রমশই। মনে হলো — হুজুর বিনা গীত নাই। কারণ, চোখের সামনে আর কোনও নেতা নেই। কিন্তু এমন একটি যাঁতাকলে পড়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি। শাসকদলকে সহ্য হচ্ছে না, বিজেপিকে সমর্থন করার প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে বিকল্প? আপাতত কোনও বিকল্প না থাকায় — অগত্যা আব্বাস সিদ্দিকীর গরম বক্তব্যে সমর্থন জ্ঞাপন করছে কিছু কিছু তরুণ। তাদেরমনে হলো, ইনিই বোধহয় ‘ইট কা জবাব পাত্থর’ সে দিতে পারবেন। এই সংখ্যাটি কিন্তু সামগ্রিক সংখ্যার কাছে খুবই নগণ্য। কিন্তু এদের তরুণ-শক্তিকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করাটাও একটি বোকামি।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি বেশ কয়েকবার হয়েছে। আত্মরক্ষা মূলক বা অস্তিত্বরক্ষা মূলক সংগ্রাম যেমন হয়েছে, আবার এমন পরিস্থিতিও দেখা গেছে যে একটি বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাস হিস্ট্রিয়া গোছের কিছু ধারণা চেপে বসে গেছে। 1947 সালে স্বাধীনতারতার আগমুহূর্ত পর্যন্ত জনমানসে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল — সেটা হলো ‘স্বাধীনতা’ চাই। কেবল স্বাধীনতাই দিতে পারে সব সমস্যার সমাধান। প্রায় দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের অন্য কোনও ভালো-মন্দ দিকের প্রতি খেয়াল ছিল না তেমন। লক্ষ্য তখন একটিই — তা হলো স্বাধীনতা অর্জন। সে ছিল পজেটিভ দিক। ঠিক তেমনই আবেগ যদিও তা নেগেটিভ, আরএসএস বা বিজেপির কথিত পরিকল্পনা– ‘হিন্দুরাষ্ট্রদর্শন’। এক জাতি, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক দেশ। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে রাজনীতির সাথে ধর্মকে মিশিয়ে এমন একটি পানীয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে সেই পানীয় পান করে মত্ত হয়ে উঠেছে সংখ্যাগুরুদেরও একটি বড় অংশ। হিটলারি কায়দায় মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করানো হয়েছে মুসলমানদেরকে। বিদেশি ইংরেজদের জন্য যতটা সহজ ছিল, ততটা সহজ নয় ভূমিপুত্র মুসলমানদের শেষ করা, বিলক্ষণ জানেন রাজনীতিবিদেরা। ফলে নানান পাঁয়তারা করতে হচ্ছে তাদের। ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে কৌশলে মুসলিম মুক্ত ভারত নির্মাণ করতে আইন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়েছে বহুবার। বিচার ব্যবস্থাকেও। ধর্মনিরপক্ষেতা, গণতন্ত্র এসব তুচ্ছ হয়ে উঠছে দিন দিন। সব শেষে হয়তো কোনওদিন সামরিক বাহিনীকেও কাজে লাগাতে পারে। একটি আতঙ্কের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম সমাজে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে অনাস্থা আর অবিশ্বাসের বাতাবরণ।
এই অবস্থায় মুসলমানদের করণীয় কি? তারা কীভাবে আত্মরক্ষা করবে? তারা কোন খড়কুটো ধরে চলমান সভ্যতার নদীতে ভাসবে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এখনও সিংহভাগ মুসলিম জনতা মমতা ব্যানার্জির উপরেই আস্থা রেখেছেন। অহেতুক নয় এই ভরসা। তাদের মনে হয়েছে, কেবলমাত্র মমতা ব্যানার্জির সম্প্রীতিধর্মী মন ঠেকাতে পারবে বিজেপিকে। তারা চায় না মুসলিম ভোট অন্য কোনও খাতে যাক। কারণ, তাদের কাছে স্পষ্ট যে ভোট বিভাজন মানেই বিজেপির ফায়দা। এই প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর অনেকের কাছে সঠিক মনে হয়নি। হয়নি বলেই আব্বাস সিদ্দিকীদের উত্থান সহজ হয়েছে।
আব্বাস সিদ্দিকী চাইলে একটি সংগঠনের জন্ম দিতে পারেন। যে সংগঠন সুদূরপ্রসারী ভাবনার প্রতিফলন ঘটাবে। প্রচারের ঢক্কানিনাদ নয়, বুদ্ধিদীপ্ত ইতিহাস সচেতন শিক্ষিত কওমদরদী তরুণদের নিয়ে সেই সংগঠন শুরু করতে পারে লাগাতার সুশীল সংগ্রাম। সর্ব স্তরে থাকবে গ্রহণযোগ্যতা। তার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আব্বাস সিদ্দিকীকে নিজের মুখে লাগাম দেওয়া। কারণ, সবাই জানে বন্দুকের গুলি আর মুখের বুলি বেরিয়ে গেলে আর ফেরে না। আর সেটার সবচেয়ে মোক্ষম সময় বোধহয় এটাই। আর যাই হোক, তাকে অন্য একটি বাটখারার সাথে তুলনা করার যুক্তি আছে?
আজ আব্বাস সিদ্দিকীর উপরে আক্রমণ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে পথ অবরোধ, বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। এটা খুবই স্বাভাবিক, তাদের নেতার উপরে আক্রমণ হলে ক্ষোভ হতেই পারে। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে হচ্ছে যে এই আন্দোলন – বিক্ষোভ নিপুন হাতে পরিচালনা না করতে পারলে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এই সুযোগে নেপোয় দই মেরে দেবে না তার কি গ্যারান্টি আছে?

একরামূল হক শেখ-এর মন্তব্য, খুব ভাল না হলেও ভাল পর্যালোচনা অবশ্যই। প্রথমত পশ্চিমবঙ্গ খুব কঠিন ও জটিল ভূমি। এভূমিতে সামান্য দাগ কাটাও অতো সহজ নয়। নিজের খানদানকে ব্যবহার করে এবং সস্তা বিজয়ের খোয়াব দেখিয়ে আবেগী যুবাদের ভিড় করানো সহজ নয়, মানি। কিন্তু এঁদের মানসিক, শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক চেতনা দিয়ে বিপ্লব তো দুরের কথা প্রতিবিপ্লবও হবে না। নিজের আইডেন্টিটি সুনিশ্চিত করে একেবারে দীর্ঘ মেয়াদী ক্রিয়াশীল সামাজিক আন্দোলন ছাড়া অন্য সব পথেরই ফলাফল শুধু শুন্য নয়, জান-মাল-সমাজের ক্রম লয়ও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *