ক্রীড়া সংস্কৃতি

শান্তিনিকেতনে বাইশে শ্রাবণ

খায়রুল আনাম,

বেজে চলেছে সকরুণ অশ্রুভরা সুর
শান্তিনিকেতনে অনাড়ম্বরভাবে পালিত রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবস
       
ঠিক যে ভাবে ২৫ শে বৈশাখ শান্তিনিকেতনে পালিত হয়েছিলো রবীন্দ্র জন্মোৎসব, ঠিক সে ভাবেই  ২২ শে শ্রাবণ শান্তিনিকেতনে অনাড়ম্বরভাবেই পালিত হলো রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবস। করোনা আবহে বন্ধ রয়েছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েরর সমস্ত বিভাগ এবং শান্তিনিকেতনের সমস্ত দ্রষ্টব্য স্থান। তাই এক কথায় এখন নিস্তব্ধ শান্তিনিকেতনে নিস্তব্ধতার সাথেই কেটে গেলে রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসটিও।    এদিন অবশ্য চিরাচরিত প্রথা মেনে  শান্তিনিকেতনে ভোরের বৈতালিকের মধ্যে দিয়ে  দিনটির সূচনা হয়। সকালে বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী গুটি কয়েক আধিকারিককে সঙ্গে নিয়ে উপাসনা গৃহে এসে বৈদিক মন্ত্রপাঠ ও সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে কবিকে স্মরণ করেন। পরে  রবীন্দ্রভবনে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত চেয়ারে ফুল দিয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানেই হয় বৃক্ষরোপণ।  এদিন রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে  শান্তিনিকেতনে উপাসনা গৃহের বাইরে  দাঁড়িয়ে বেশকিছু মানুষ কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।     অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে দেখতে ১৯৪১ সালের ১৬ জুলাই  কয়েকজন  ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন  ডা. বিধানচন্দ্র রায়। তিনি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন, দেখুন, আমরা আজ এসেছি  আপনাকে বলতে যে, আপনার এখন শরীরটা আগের চেয়ে  একটু ভালো আছে,  কাজেই অপারেশনটা  করিয়ে ফেলা ভালো। তাতে আপনার এই যে জ্বর  আর খাবারে অরুচি এবং  অন্যান্য উপসর্গ সব চলে যাবে। আপনি আবার বেশ সুস্থবোধ করবেন। প্রত্যুত্তরে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে বলেন,  কেন ?    আমি তো আজকাল আগের চেয়ে  বেশ আছি। আস্তে আস্তে তাইতেই তো শরীরে জোর পাব।  ডা. বিধানচন্দ্র রায় কবিকে বললেন,   শুধু তো খাওয়া নয়–আরও তো নানারকম উপসর্গ আছে। এ তো কিছু শক্ত  অপারেশন নয়, ওটা করিয়ে ফেলাই ভালো। তাতে দেখবেন আপনার  শরীরের সব কষ্ট, গ্লানি  এখন যা অনুভব করছেন চলে যাবে। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের এই কথায় সায় দেন সঙ্গে থাকা ডা. ইন্দুমাধব বসু। আর কোনও কথা না বলে সেখানে নিশ্চুপভাবে বসেছিলেন  সেকালের বিখ্যাত শল্যচিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ তাঁরই কথা ছিল কবির  অস্ত্রোপচার করার। ডা. বিধানচন্দ্র রায় তাঁর দিকে চেয়ে বলেছিলেন– কী ?   কবে অপারেশন করবে ?        তারপর কবিকে শান্তিনিকেতন থেকে বোলপুর রেল স্টেশন হয়ে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বিশেষ সেলুন কোচের ব্যবস্থা করে।  সেখানেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেই কবির চিকিৎসা এবং অপারেশনের ব্যবস্থা হয়।  চিকিৎসকরা ছাড়াও ঠাকুরবাড়ির অন্যান্যদের সাথে বাইরে ছিলেন  প্রশান্তচন্দ্র  মহলনবিশ,   রানি চন্দ। দুপুর ১১ টা ২০ মিনিট থেকে  ১১ টা ৪৫ মিনিট, ২৫ মিনিটের অপারেশন হয় ক্লোরোফর্ম দিয়ে কবিকে অজ্ঞান না করেই।  আর ১৯৪১-এর ৭ আগস্ট, বাইশে শ্রাবণ, বৃহস্পতিবার সকালে ডা.  ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে শেষ বারের মতো  জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথকে দেখতে আসেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়।  আর সে দিন সেই ধন্বন্তরী চিকিৎসকও অসহায়ভাবে মন্থর পায়ে নিঃশব্দে  রণক্ষেত্রে সব্যসাচীর মতো কাঁধ থেকে গাণ্ডীব নামিয়ে দিয়ে  দীর্ঘদেহের মানুষটি চলে যাওয়ার সাথে সাথেই বেজে গেল রবীন্দ্র-তিরোধানের  অশ্রুভরা সকরুণ সুর। ২২ শে শ্রাবণ সেই সকরুণ সুর আজও বেজে চলেছে শান্তিনিকেতনে ।।  
 ছবি- উপাসনা গৃহের বাইরে থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *