সাহিত্য বার্তা

একটি প্রেমের অণুগল্প – শুচিস্মিতা ধর

একটি প্রেমের অনুগল্প,

শুচিস্মিতা ধর,

“সীন টা কে বুঝে নাও ভালো করে..একটা পুকুর, তার পাড়ে একটা সিঁদুর মাখা পাথর, ঐ গ্রাম সাইডের উটকো দেবতা গোছের.. সেই পুকুর টার থেকে স্নান সেরে এসে, পাথর টার সামনে তুমি দুই হাত জোড় করে ডুকরে ডুকরে কাঁদছ .. ভেজা শাড়ী, ওকে? ইনার্স পরার দরকার নেই..বি-লাইনের কার্ভ টা হালকা বোঝা যাবে। ঠিক আছে?

ডান দিক থেকে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল নেবো, তোমার মুখের আর বুকের এই সাইড টা দেখা যাবে, ওকে? আলুথালু বেশ, পুরোনো, ছেঁড়া শাড়ী, মলিন , মানে, ইয়ে, সাদা থান একটু ময়লা হয়ে গেলে…”

“বুঝেছি…”

“গুড….তুমি বিধবা…স্বামী গতবছর কলেরায় গেছে, কেমন?… তোমার একমাত্র সন্তান, একটাই ছেলে.. তার গত পরশু থেকে সাংঘাতিক জ্বর, ওকে? তুমি জানো ও হয়তো আর বাঁচবে না, কি বললাম বোঝা গেলো?”

“হুম…?”

“আরে, হোয়াই আর ইয়ু সো লস্ট? হোয়ট আর উই ডুইঙ হিয়ার? কাজের সময় কাজ টুকু ছাড়া আর সব কিছুই চলে মাথায় দেখছি!”

“ন-না… বলো, সরি ..”

“বলছি , তোমার স্বামী গত হয়েছেন, সেটা এক বছর হতে যায়, তুমি পুত্র সন্তানের মা, ছেলে টার খুব অসুখ, ডাক্তার ডাকার সংস্থান নেই তোমার… জমি জিরেৎ নেই, ঘরে চাল আনার পয়সা নেই… লোকের বাড়ি তে ঠিকে কাজ করো, সেই বাড়ী গুলোর থেকেও তেমন সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না…. বুঝলে? আরে কি হলো, নীচের দিকে কি দেখছো? হ্যাঁ? আমি একটা সীন বোঝাচ্ছি, মুভি টা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ পাঠাবো, প্লীজ পে আটেনশন ড্যামেড…”

“শুলে হবে?”

“কিহ…?”

“না, সরি ফর ইন্টারাপশন, ইয়ু ক্যারি অন প্লীজ!”

“কি বললে কথাটা …?”

“ ছাড়ো না, কি বলছিলে বলো .. স্বামী নেই, ছেলে টা টপকাবার টাইম হয়ে এসেছে, এই তো?”

“এই তোমার অনুভূতি? ‘টপকাবার টাইম?’ সিরিয়াসলি?.. এই অনুভূতি, ক্যারেকটার এর প্রতি এইরকম জোলো, চালু, চটুল মনোভাব নিয়ে তুমি থিয়েটার করতে ?… আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই, অ্যাওয়ার্ড গুলো বাগালে কি ভাবে? জাজের সাথে শুয়ে?..”

“সীন টা বোঝাচ্ছিলে, প্লীজ সেটাই বলো …”

“ নিজের বাচ্চার তো মুখ দেখতে হলো না এই জীবনে, সে জন্য মা আর কোনোভাবেই হওয়া গেলো না… তাই না?”

“সীন টার কথা কি বলছিলে যেন…”

“ফরগেট ইট, দ্য মোমেন্ট ইস গন…”

“আরে, আচ্ছা, সত্যিই দুঃখিত .. আর মাঝখানে কিছু বলবো না, কি বলছিলে বলো, আমি পুকুরে স্নান সেরে ছেলের প্রাণ ভিক্ষা করতে গেছি, তাই তো…?”

“হ্যাঁ, কিন্তু সেই মনোভাব টা কি ফুটিয়ে তুলতে পারবে আদৌ? মা যখন জানতে পারেন এক মাত্র বাপ মরা ছেলে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেয়ার সময় হয়েছে, তখনকার যে আর্তি টা … সেটা অন স্ক্রীন এক্সপ্রেস করতে পারবে কি? মনে তো হচ্ছে না, অদিতি .. এটা আমার খুব খুব ইম্পরট্যান্ট প্রোজেক্ট, প্লীজ আন্ডারস্ট্যান্ড, তোমার দ্বারা না হলে, উই উইল লুক ফর সামওয়ান এলস..”

“পারবো, চিন্তা কোরো না…”

“ডুকরে কান্না, ওকে? প্রাণফাটা কান্না… যেরম …যেরম পরশু রাতে ড্রিংক করে বুক চাপড়াচ্ছিলে…কি ভেবে কাঁদছিলে তখন ? সরি , জিজ্ঞেস করা হয়নি..”

“ফরগেট ইট… দ্য মোমেন্ট ইস গন..”

“(একটু নরম হয়ে) না… দিস টাইম , আয়াম সরি… কেন কাঁদছিলে যেন? প্রিয়ার ঘুম ভেঙে গেছিলো, তাই আমি ফোন কেটে দিয়েছিলাম …কেন কাঁদছিলে বলো?”

“শট রেডি কি? যাবো আমি?..”

“এড়িয়ে যাচ্ছ ? না কি যত থিয়েটার-নাটক-যাত্রা-পালাগান সব রাতেই পায়? তখন বিবাহিত প্রেমিকের শান্তি উজাড় করে দেয়ার জন্য তাকে তার বিয়ে করা বৌ এর সামনে ফোন করে পর্যুদস্ত করে দিতে হয়? শালা, বাজারে মেয়েছেলে আর কাকে বলে…? নির্ঘাত সেই রাতে টাকা কড়ি পাও নি পার্টির থেকে..তাই কপাল চাপড়াচ্ছিলে, তাই না?”

“ মুকুল এসেছিল..!”

“কি? কে এসেছিল?”

“মুকুল…. আমাদের ছেলে…”

“মানে?”

“বুঝতে কষ্ট হচ্ছে?আরে মুকুল গো, জারজ সন্তান আমাদের….. অসাবধানতার বশে, তোমার মেয়ে পটানো প্রেমের নাটকের ফলে পৃথিবীতে চলে আসা আমাদের সেই ভুলের ফসলটা… যার তিন বছর বয়েসে সাংঘাতিক জ্বর হয়েছিল, ডাক্তারদের মোটা টাকা খাইয়ে যাকে সেই সুযোগে পৃথিবী থেকেই মুছে ফেলেছিলে তুমি? মনে আছে? সে এসেছিল পরশু রাতে….বলে দিয়ে গেছে যে সন্তান কে বাঁচাতে হলে, যদি আর কোথাও থেকে কোনো ব্যবস্থা না করতে পারা যায়, তাহলে টাকা জোগাড় করতে মা কে শুতে হয়…

যেমন, ডাক্তার কে ঘুষ খাওয়ানোর টাকা গুলো তুমি আমায় প্রোডিউসারের সাথে শুইয়ে রোজগার করিয়েছিলে, আমি জানতাম এগুলো আমাদের ছেলে টাকে বাঁচানোর জন্য, তাই রাজী হতাম…মুকুল পরশু বলে গেলো ঐ টাকা গুলো ওকে মারার জন্য জোগাড় করছিলে… তাই তোমায় ফোন করেছিলাম, সত্যিটা জানার আশায়।

ও হ্যাঁ, আরো একটা কথা বলে গেছে মুকুল, প্রিয়া দি, মানে তোমার ওয়াইফের গর্ভে আসছে সে, গর্ভের ভ্রূণ টির মধ্যে প্রবেশ করেছে ওরই আত্মা…

তোমার বর্তমান আর্থিক অবস্থা জানি, প্রিয়াদির সিজারিয়ান টা করাবার টাকা না থাকলে জানিয়ো, আমি আরও একবার তৈরি আছি, প্রোডিউসার বাবু বোধহয় সাউদার্ন এভিনিউ তে থাকেন, না?”

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *