হাইকোর্ট সংবাদ

আজ সব পক্ষকে লিখিত বক্তব্য জানাতে হবে, স্থগিত ভোট পরবর্তী হিংসা মামলার রায়

 আজই সব পক্ষকে লিখিত বক্তব্য জানাতে হবে, স্থগিত ভোট পরবর্তী হিংসা মামলার রায়

মোল্লা জসিমউদ্দিন টিপু,


আজ অর্থাৎ বুধবারের মধ্যেই ভোট পরবর্তী হিংসা মামলায় সব পক্ষ কে লিখিত বক্তব্য জানাতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। পাশাপাশি এই হাইপ্রোফাইল মামলাটির রায়দান স্থগিত রেখেছে আদালত। মঙ্গলবার ছিল এই মামলার শুনানি পর্বে শেষদিন।ওই দিন রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি সওয়াল-জবাবে জানান – ‘ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট টি ত্রুটিযুক্ত।কমিশনের দুই তিন সদস্যের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এর অভিযোগ রয়েছে। এরফলে রিপোর্ট ঘিরে সন্দেহ থাকাটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছে, কমিটির একজন সদস্য পক্ষপাতদুষ্ট হলে, পুরো প্রক্রিয়া টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া ২৯ এপ্রিল এবং ২ মে এর ঘটনা গুলির সময় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের উপর’। এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের আইনজীবী সৌমেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সওয়াল-জবাবে জানান – ‘ ১৯৭৯ টি অভিযোগের মধ্যে ৮৬৪ টি তারিখ নেই ৫২ টি খুনের মধ্যে ৮ টি তে তারিখ নেই। আবার ৭২ টি ধর্ষণের অভিযোগের মধ্যে ৯ টিতে তারিখ নেই। রাজ্য পুলিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২৬৮ টি মামলা রুজু করেছে। পাশাপাশি ৪ টি ঘটনা ২ মে থেকে ৫ মে এর মধ্যে। তখন রাজ্যের হাতে আইনশৃঙ্খলা ছিল না’। এই সওয়াল শুনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডাল তখন প্রত্যুত্তরে জানান – ‘ প্রথমদিন আপনি বলছিলেন একটিও ঘটনা ঘটেনি।তাহলে এখন আপনার অবস্থান বদল হয়েছে ‘। মামলাকারীদের অন্যতম আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সওয়াল-জবাবে জানান – ‘ হিংসার ঘটনা বিতর্কিত নয়।যা বিতর্ক কমিটির সদস্যদের একাংশ কে নিয়ে।হিংসার ঘটনা ঘটেছে এটাই সত্য’।কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে মঙ্গলবার উঠেছিল ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিযুক্ত অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্ট সংক্রান্ত শুনানি। এর আগে এই কমিটির ৯৫১ পাতার রিপোর্ট খতিয়ে দেখতে রাজ্য কে ৩১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ২ আগস্ট পর্যন্ত শেষ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল হাইকোর্ট। যদিও শুনানির প্রথম পর্বে রাজ্যের অতিরিক্ত সময় চাওয়ার আবেদন টি একপ্রকার খারিজ করে দিয়েছিল বৃহত্তর বেঞ্চ। তবে পরে তা মেনে নেয় আদালত।এর আগের শুনানি তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিযুক্ত কমিটির আইনজীবী সুবীর স্যানাল আদালতে জানান – ‘ চুড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করার পর রাজনৈতিক অশান্তি নিয়ে নানান অভিযোগ এসেছে, তাই সাপ্লিমেন্টারি রিপোর্ট পেশ করার অনুমতি চায়’। আদালত অবশ্য কোন অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেয়নি এই সাপ্লিমেন্টারী রিপোর্ট পেশ করার জন্য। গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দ্বারা নিযুক্ত  কমিটির  পূর্নাঙ্গ রিপোর্ট কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্য সরকার জবাবী হলফনামা জমা দেয়। সেখানে রাজ্যসরকার  জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দ্বারা নিযুক্ত কমিটির সদস্যদের সরাসরি রাজনৈতিক দল বিজেপি  এবং কেন্দ্রীয় সরকারের যোগসূত্র উল্লেখ করে হলফনামা জমা দিয়েছে। এই কমিটির রিপোর্ট কে অতিরঞ্জিত, মনগড়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি রাজ্যের।এই কমিটির পেছনে রাজ্যের প্রায় ৮ লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়েছে। শুধু ৭ সদস্যর কমিটির পেছনে নয়, এঁদের সাথে থাকা ব্যক্তিবর্গদের থাকা খাওয়ার বিল মিটিয়েছে রাজ্য। কমিটির ‘শাসকের আইন চলে,আইনের শাসন নেই’ মন্তব্যর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাজ্য।১৯৯৩ সালের মানবাধিকার আইনের ১৪(৫) নং ধারায় এই ধরনের কমিটি আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে রিপোর্ট জমা দেবে।তারপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজন বুঝে কোন তদন্তের সুপারিশ করতে পারে।তবে এক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে না জানিয়ে সরাসরি সিবিআই তদন্তর সুপারিশ করতে পারেনা কমিটি। এই এক্তিয়ারের প্রশ্ন রেখেছে রাজ্য জবাবী হলফনামায়। ৫০ টির বেশি কমিটির কাছে নথিভুক্ত অভিযোগের কোন সারবত্তা নেই বাস্তবিক ক্ষেত্রে বলে দাবি রাজ্যের।বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় কংগ্রেস, সিপিএম, আইএসএফ রাজনৈতিক দল গুলির কর্মী সমর্থকদের বাড়ি কেন যায়নি ৭ সদস্যর এই কমিটি?  এই প্রশ্নও তুলেছে রাজ্য। ৭ সদস্যর কমিটির মধ্যে ৩ জন সরাসরি  রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যুক্ত, তার তথ্য প্রমাণ দিয়ে হলফনামায় জানিয়েছে রাজ্য।রাজীব জৈন যিনি এই কমিটির অন্যতম সদস্য, তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আইবির ডিরেক্টর ছিলেন। তার আগে নরেন্দ্র মোদীর গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন আমেদাবাদে আইবির ডিরেক্টর ছিলেন। দলীয় আনুগত্য থাকাকালীন ৬ মাস মেয়াদ বেড়েছিল এই গোয়েন্দা কর্তার বলে দাবি রাজ্যের।এই কমিটির আরেক সদস্য আতিফ রশিদ যিনি বিজেপির আইটি সেলের পদাধিকারী। বিজেপির টুইটার হ্যান্ডেল করেন তিনি।এইরকম বেশ কয়েকজন কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিক সত্তা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিভিন্ন যোগাযোগ তুলে ধরে হলফনামা টি জমা দিয়েছে রাজ্য।। গত সপ্তাহে  কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে চলেছিল ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে মামলার শুনানি। ওইদিন তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি শুনানিতে জানিয়েছিলেন – ‘ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ত্রুটিপূর্ণ এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। প্রকাশিত ওই রিপোর্টে বিধানসভার ফলাফল প্রকাশের আগেকার ঘটনাগুলির উল্লেখ রয়েছে। সেসময় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের। বিধানসভার ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্য পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা নিয়ে’।ওইদিন হাইকোর্টের তরফে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দাখিল রিপোর্ট কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হলফনামা পেশের জন্য রাজ্য কে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়। ওইদিন আদালত শোকজ  প্রাপ্ত  ডিসি রশিদ মুনির লিখিত বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলাকারীদের আইনজীবী মহেশ জেঠমালানি অভিযোগ সূরে আদালত কে জানিয়েছিলেন  – ‘ ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা নিয়ে আক্রান্তরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে এলেও, তাদের কে রাজ্য পুলিশ অভিযোগ প্রত্যাহারের চাপ দিচ্ছে’। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে   কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পূর্নাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করেছিল। প্রায় দু সপ্তাহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আক্রান্ত দের সাথে কথা বলেছে তারা।কলকাতা হাইকোর্টের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রিপোর্টে সুপারিশ রেখেছে যে, ‘ভোট পরবর্তী হিংসা ঘটনাগুলিতে সিবিআই তদন্ত প্রয়োজন। রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে কোন সহযোগিতা মেলেনি।রাজ্যের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, পূর্নাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অনেক মানুষ খুন, ধর্ষণ ও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে অন্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়বে।যা দেশের গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দিতে পারে’। সেইসাথে অন্য রাজ্যে এই মামলা গুলি স্থানান্তরিত করা এবং স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম গঠন করার সুপারিশ করা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে। এছাড়াও ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিশেষ আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা গুলি দ্রুত নিস্পত্তি করার আবেদন জানানো হয়েছে।এর আগে হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চে সাত দফার অন্তবর্তী নির্দেশ জারি করেছে আদালত। যা রাজ্যের কাছে মোটেই সুখকর নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মুখবন্ধ খামে রিপোর্ট দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। রাজ্য কে নজিরবিহীনভাবে তীব্র ভৎসনা করেছিল আদালত। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষে জানানো হয়েছিল, তারা আদালতের নির্দেশে রাজ্যের ১৬৮ টি জায়গায় পরিদর্শনে গিয়েছিল। তবে যাদবপুরে গেলে তাদের আক্রান্ত করা হয়। রাজ্য কোনভাবেই সহযোগিতা করেনি।পুলিশ ছিল নিস্ক্রিয়। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশের সংশ্লিষ্ট ডিসি রশিদ মুনির খান কে শোকজ করা হয়েছিল আদালত অবমাননার জন্য।যা ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে এই পুলিশ অফিসার কে লিখিতভাবে জানাতে হয়েছিল। আগেই আদালত জানিয়েছিল – রাজ্যের  কোন অসহযোগিতা এলে,তা আদালত অবমাননার মধ্যে পড়বে। যে সাত দফার অন্তবর্তী নির্দেশ জারি হয়েছে সেগুলি হলো, ১/  প্রত্যেক অভিযোগের ভিক্তিতে এফআইআর করতে হবে। সমস্ত ঘটনার দ্রুত তদন্ত শুরু করতে হবে। ২/ ভোট পরবর্তী হিংসায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার। ৩/ মৃত বিজেপি কর্মী অভিজিৎ সরকারের মৃতদেহ কলকাতার কম্যান্ডো হাসপাতালে রাখতে হবে। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত হবে দেহের।৪/ যাদবপুরে কেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিদের হামলার মুখে পড়তে হলো, ডিএম /এসপি  কে কেন শোকজ করা হবেনা, তা জানাতে হবে রাজ্য কে।৫/ ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসায় আহতদের রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে রাজ্য কে। ৬/ যে যে অভিযোগ বিভিন্ন কমিটি বা আহতদের লোকজন করছে তা ১৬৪ নং ধারা মতে পুলিশ কে নথিভুক্ত করতে হবে। সমস্ত অভিযোগ গুলি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে জানাতে হবে। ৭/ রাজ্যের কাছে যা তথ্য আছে তা মুখ্যসচিবের দায়িত্বে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।এরেই মধ্যেই চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে পূর্নাঙ্গ রিপোর্ট পেশে ভোট পরবর্তী হিংসা ঘটনাগুলিতে সিবিআই তদন্তর সুপারিশ জানিয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দাখিল রিপোর্ট কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার আবেদন জানায় রাজ্য।তাতে আদালত ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে জবাবি রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। যা সোমবার আদালতে রাজ্য পাল্টা হলফনামা জমা দেয়।জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিযুক্ত অনুসন্ধান কমিটির ৯৫১ পাতার রিপোর্ট খতিয়ে দেখতে ৩১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ২ আগস্ট পর্যন্ত শেষ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ।আজ অর্থাৎ বুধবার সব পক্ষ কে লিখিত বক্তব্য জানাতে হবে। রায়দান স্থগিত রেখেছে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *