প্রশাসন

পুরুলিয়ার এক অন্য বিদ্যালয়ের কাহিনি

এক অন্য বিদ্যালয়ের কাহিনী

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী,

           করোনা অতিমারির আঘাতে গত দেড় বছর ধরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত এলেমেলো। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের নয় গোটা বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ। কোথাও কোথাও অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাদানের কাজ চললেও অনেকেই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আর্থিক কারণে প্রয়োজনীয় স্মার্ট ফোন কেনার সামর্থ্য সবার নাই। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে প্রযুক্তিগত সমস্যা চরম। প্রথাগত শিক্ষার আনন্দ পাওয়ার স্বাদ পাওয়া থেকে শিক্ষক থেকে ছাত্র সমাজ -  সবাই বঞ্চিত। রোল কলের সময় দুষ্টুমি করা, শিক্ষকদের গুরুগম্ভীর গলা - সবই আজ অনুপস্থিত। তার মধ্যেও ব্যতিক্রম থেকে গেছে ওরা অর্থাৎ পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের উপর যাদুগোড়ার 'বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা নিকেতন'- এর ছাত্রছাত্রীরা। মূলতঃ দরিদ্র আদিবাসী অভিভাবকদের   সন্তানদের বুনিয়াদি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বেসরকারি আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে এবং অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের একটু শিক্ষালাভের আশায় এই বিদ্যালয়ে পাঠান। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের না আছে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো , না আছে গ্রাচ্যুইটি, পেনশন বা কোনোরকম সরকারি সাহায্য। অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ ওদের সম্বল। সেটাও এখন বন্ধ। নেই রাজ্যের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে ওরা অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের মনে জ্বালিয়ে চলেছে শিক্ষার আলো। গত দেড় বছর ধরে প্রচারের আলোর বাইরে থেকেও ওরা যে ভূমিকা পালন করে চলেছে সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। 

‌ ১৯৯৩ সালে মাত্র তিন জনকে নিয়ে শুরুটা করেছিল দুই অভিন্ন হৃদয় বাল্যবন্ধু রামনাথ মুর্মু ও বিনোদবিহারী মুর্মু। বাঘমুণ্ডি বিবেকানন্দ বিকাশ কেন্দ্রের ছাত্র হিসাবে ওদের দুই বন্ধুর শুধু শিক্ষার বিকাশ ঘটেনি, মনের বিকাশও ঘটে। নিজ সম্প্রদায়ের গরীব ঘরের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার ভাবনাটাও মাথার মধ্যে আসে। ভাবনাটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য দুমদুমিতে তিন জন ছাত্রকে নিয়েই শুরু হয়ে যায় বিদ্যালয়। মাত্র চারমাস সেখানে কাটিয়ে তারা চলে আসে অযোধ্যার যাদুগোড়ায়। সেখানেই অন্যদের সহযোগিতায় পাহাড়ের উপর চারপাশে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে এক চিলতে জমির উপর গড়ে ওঠে আজকের বিদ্যালয় – মাটির ঘর, টিনের ছাউনি। বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে যাদুগোড়া আদিবাসী গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র। ছাত্র সংখ্যা তিন থেকে ছয় হতে বেশি সময় লাগেনি। এখন তো সেটা বাড়তে বাড়তে পৌঁছে গেছে ১৮০ তে। যেখানে অধিকাংশ সরকারি বা নামীদামি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা সহজে তিন অঙ্ক স্পর্শ করতে পারেনা সেখানে সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মত। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ৭০ জন আবাসিক। অভিভাবকরা দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রমজীবী। স্বাভাবিক দারিদ্র্যতার কারণে বাড়তি আয়ের আশায় ছেলেমেয়েরাও অভিভাবকদের সঙ্গে চলে যেতে চায় মাঠে। কিন্তু তাদের দু’চোখে স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে হবে, মানুষ করতে হবে। তাইতো শত কষ্টের মধ্যেও বাড়তি খরচ করে তারা ছেলেমেয়েদের রেখে দেয় হোস্টেলে। দীর্ঘদিন ধরেই এই পরম্পরা চলে আসছে। সম্ভবত এটাই বিশ্বের একমাত্র বিদ্যালয় যার ছাত্রছাত্রীরা এই বিদ্যালয়ের ভবিষ্যতের শিক্ষক। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পর অনেকেই এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের একটা আলাদা টান, আলাদা মমত্ববোধ থেকে গেছে এবং বেতন নয় শিক্ষাদান করাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। এই বিদ্যালয়ে যেসব ছাত্রছাত্রী কর্মসূত্রে অন্যত্র নিযুক্ত সুযোগ পেলে তারাও তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ে ছুটে আসে এবং শিক্ষাদানও করে। যেমন বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিনোদবিহারী মুর্মু মুর্শিদাবাদের একটি ব্লকের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের উচ্চপদে আসীন হলেও নিজের স্বপ্নের বিদ্যালয়ের উন্নতি সম্বন্ধে প্রিয় বন্ধু রামনাথের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে ভুল হয়না। এমনকি বাড়ি ফিরলে আগের মতই ‘ক্লাস’ নিতে চলে যান। বর্তমানে বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষিকা সহ ১৫ জন শিক্ষক আছেন এবং প্রত্যেকেই স্নাতক।
বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা হলেও দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোচিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে পরবর্তীকালে অন্য বিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষায় পাঠরত এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সমস্যায় না পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও আছে। বিকাল হলেই ফুটবল পায়ে তারা ছুটে যায় মাঠে। বাচ্চাদের উপযুক্ত সমস্ত ধরনের খেলাতেই তারা মেতে ওঠে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয় নিয়মিত।
‌ এতদিন সব ঠিক ছিল। নির্দিষ্ট ছন্দে চলছিল বিদ্যালয়। ধীরে ধীরে তাল কাটতে শুরু করে লকডাউনের সময় থেকেই। আর পাঁচটা জায়গার মত করোনার আঘাত এখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মাঠে কাজ বন্ধ। কর্মহীন অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার নুন্যতম খরচ আর বহন করতে পারছিল না। পরিস্থিতির চাপে ও করোনা জনিত নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ছাত্রছাত্রীরা ফিরে যায় নিজ নিজ ঘরে। তীব্র অনটনে শিকেয় ওঠে তাদের লেখাপড়া। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকাটাই কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। অনেকেই পড়াশোনার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে । কিন্তু হাল ছাড়েন না এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহ অন্যান্য শিক্ষকরা। গভীর যত্নে তৈরি করা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়ে যায় তার জন্য এক অভিনব সিদ্ধান্ত নেন তারা। নিজেরাই পায়ে হেঁটে অথবা সাইকেলে চেপে দূরদূরান্তে থাকা ওইসব ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে পৌঁছে যান এবং নিয়মিত তাদের লেখাপড়ায় সাহায্য করে চলেছেন।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা সহ বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, উত্তরপত্র সংগ্রহ ও উত্তরপত্র পরীক্ষা করার কাজও বিগত দেড় বছর ধরে করে চলেছে বেতনহীন পনেরোজন শিক্ষক। বেতন সামান্য। সেটাও দীর্ঘদিন ধরে জুটছে না। নিজেদের ঘরেই তীব্র অভাব-অনটন। সেটা উপেক্ষা করেই উনারা লড়াই করে চলেছেন। একটাই লক্ষ্য গরীব ঘরের শিশুদের মনে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানোর। গরীব আদিবাসী ঘরের আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষকদের এই নিরলস লড়াই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
বিদ্যালয়ের কথা জানতে পেরে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে চলেছে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্হা ‘কলাপী’। সংস্হার পক্ষ থেকে বছরের শুরুতেই ছেলমেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বই, খাতা, পেন, পেনসিল সহ বিভিন্ন পড়াশোনার সামগ্রী এবং ছেলেমেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক। এই বিদ্যালয় ও ‘কলাপী’ আজ যেন অবিচ্ছিন্ন, সম্পৃক্ত। বিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে তারা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পাশে থেকেছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। আজ এই কঠিন সময়ে বিদ্যালয়টি যখন ঘোরতর সঙ্কটে তখনও ‘কলাপী’ তার মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের সাধ্যমত সাহায্য করে চলেছে। পরবর্তী লক্ষ্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে অর্থ তুলে দেওয়া যাতে অভাবী শিক্ষকদের হাতে কিছু বেতন তুলে দেওয়া যায়। ‘কলাপী’-র আবেদনে সাড়া দিয়ে কলকাতার ‘হেল্পিং হ্যাণ্ডস’ ও ‘ফুডিজ ক্লাব’ বিনা প্রশ্নে বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। উভয়েই বিদ্যালয়ের, অল্প সময়ের জন্য হলেও, বাচ্চাদের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছে এবং আগামী দিনেও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘হেল্পিং হ্যাণ্ডস’ এর কর্ণধার বিশিষ্ট চলচ্চিত্র, দূরদর্শন ও যাত্রাশিল্পী পিয়ালী বসুর ভাষায় – পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত। একই সুর শোনা যায় সি.এফ.সির চন্দন গুপ্তের কণ্ঠে।
‘কলাপী’-র কর্ণধার পেশায় শিক্ষিকা সুস্মিতা নন্দী বললেন – সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু কখন যে যাদুগোড়ার ‘বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা নিকেতন’- এর ছাত্রছাত্রীরা আমার সন্তান হয়ে উঠেছে বুঝতেই পারিনি। ওটা আমার আর এক কর্মক্ষেত্র। চেষ্টা করি সবসময়ই ওদের পাশে থাকতে। প্রসঙ্গত সুস্মিতা দেবীর চেষ্টায় প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের কয়েকটি করে বাচ্চা কলকাতা প্রথম সারির বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে চলেছে। তাদের খরচ সুস্মিতা দেবীই বহন করেন।
বিদ্যালয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেসে যান বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাণপুরুষ রামনাথ মুর্মু। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সুস্মিতা দেবীর কথা। কার্যত বিনা বেতনে যেভাবে বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারা পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাতে তিনি গর্বিত। তিনি বললেন – বিদ্যালয়ের মূল ভাবধারা বজায় রেখে আগামী দিনে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়টিকে উন্নিত করায় তাদের মূল লক্ষ্য। এরজন্য সরকার, স্হানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সঙ্গে স্হানীয় মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন। তার আশা গরীব আদিবাসী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার স্বার্থে অদূর ভবিষ্যতে এই আশা পূর্ণ হবে। হয়তো সেদিন শিক্ষা বিস্তারে অন্যান্য মনীষীদের সঙ্গে সঙ্গে রামনাথদের নামও মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *