সাহিত্য বার্তা

উড়ান পর্ব ১১

উড়ান (পর্ব- ১১),

দেবস্মিতা রায় দাস

 জিৎকে এতোদিন পর পেয়ে পালকের যেন অর্ধেক সমস্যাই মিটে গেল। আসলে জিৎ তার বন্ধুর থেকেও অনেক বেশী তার পরিবারের একজন সদস্যের মতোই ছিল। জিৎ এর বাবা মাও সেটা জানতো এবং তারাও পালককে বেশ পছন্দই করত। সে এটাও জানতো যে জিৎ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু তার নিজের ফিলিংস সম্পর্কে শিওর ছিল না বলে তাকে কিছু বলতে পারেনি। তাতে অবশ্য তাদের বন্ধুত্বের ওপর কোনো প্রভাব পড়ত না, তা অটুট ছিল। 

পালকের মন এতোটাই ভালো হয়ে গেল তাকে পেয়ে যে অন্য কিছু যেন তার মনকে আর ততোটা প্রভাবিত করতে পারলোনা আর খুব বেশী করে মনোনিবেশ করল সে নিজের প্রস্তুতিতে। জিৎএর সাথে বসে কিছু গানও শোনালো তার আবদারে, মন হাল্কা আর মাথা রিল্যাক্স হল।

এদিকে একজন কিন্তু তাদের অতো খুশি দেখে জ্বলতে লাগলো ভিতরে ভিতরে, সেটা হল করণ রস্তোগী। করণের পালকের ওপর নজর পড়েছিল তাদের ফ্রেশার্সের দিন থেকেই। ভালোলাগছিল তাকে বেশ৷ এরপর তাদের আলাপ বাড়লো, করণ হ্যান্ডসাম, পলিশড, কথাবার্তা ভালো, স্বাভাবিকভাবেই পালকেরও তাকে ভালোলাগতে শুরু করেছিল। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে তাদের বাইরেটা যতোটা সুন্দর, ভেতরটা ততোটা নয়। করণ ছিল সেইরকম একজন মানুষ। পালকের সরল ভালোলাগার আড়ালে ছিল করণের তাকে সম্পূর্ণ অধিকারের ইচ্ছা। তার মধ্যে যেন জোরাজোরিটাই বেশী ছিল। সেখানে জিৎএর মতো এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল না। এটা পালক বুঝে যাওয়ার পর থেকে আর একফোঁটাও করণকে পাত্তা দেয় না। কিন্তু না দিলে কি হবে, তার নজর এখনো ওর দিকে যে আছে, সেটা তার চোরাগোপ্তা নজর, আর সুযোগ পেলেই কথা বলতে আসার চেষ্টাতেই বেশ ভালোই বুঝতে পারে। তবে রোহিত স্যার আর মীরার সাপোর্ট পাওয়ার পর থেকে পালক আর ওকে পাত্তা দেয় না।

পালকের বেস্ট ফ্রেন্ড এসেছে, এটা এখানে তার বাকি বন্ধুদের কানেও পৌঁছালো। মীরা আগের থেকেই চিনতো। বাকিদের সাথেও আলাপ হল। ঝিলম আর তুষার কিন্তু পড়ল বেজায় মুশকিলে। তাদের বানিয়ে রাখা প্ল্যান নষ্ট হতে চলেছে। তুষার ছেলেটা ছিল খুব ধূর্ত। যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে, তাই সে এসে আলাপ করে গেল জিৎএর সাথে।

মনে মনে প্রমাদ গুনতে লাগলো। হাতে তো আর বেশী সময় নেই। যা করার আজ রাতের মধ্যেই করতে হবে। পরেরদিনই তো কম্পিটিশন! একটা বেশ জোরদার প্ল্যান বানিয়েছে, কিন্তু তার জন্য তো এই আপদটাকে পালকের থেকে আলাদা করতে হবে। যাও বা মীরাকে আলাদা করল তার থেকে, আর একজন এসে বসে গেল সেই জায়গায়।

মীরার সাথে একটু স্বাভাবিক হলেও এখনো আগের মতো হতে পারেনি পালক। তার মাথায় এখনো ঝিলমের আগেরদিনের বলা কথাগুলোই ঘুরছে। কি এমন করেছে মীরা যার কথা বলতে চাইছিল ও পালককে৷

অপরদিকে মীরা ওদেরকে এই ঘরে ঢুকতে দেখেনি, তাই সে বুঝে উঠতে পারছিল না কি কারণে এমন হচ্ছে, কিন্তু সে এই নিয়ে বেশী ঘাঁটায় না পালককে। কাল কম্পিটিশন আর সেও মনেপ্রাণে চায় পালক একটা ভালো জায়গায় পৌঁছাক, তাই আর অন্য কথা বলে তাতে ব্যাঘাত ঘটিয়ে লাভ নেই। ভাবে প্রতিযোগিতা হয়ে যাক, তার পরে এই বিষয়ে বিশদ কথা বলা যাবে।

সন্ধ্যাবেলা সকলকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য রোহিত রায়, স্যাম সকলে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন এসে সকলের সাথে। করণও ছিল তাদের সাথে। এরপর হাসিঠাট্টা গানবাজনা করে রিল্যাক্স হওয়া চলতে লাগলো রাহুলের রুমে বসে। মীরা ছিল না। হঠাৎ ঝিলম এসে একবার পালককে বাইরে ডাকলো। পালক উঠে বাইরে এল। জিৎ আসতে চাইলেও পালক বারণ করল। প্রশ্নমাখা চোখে তাকাতেই তুষার বলে উঠল..

“তোমাকে বলেছিলাম না এমন কিছু দেখাবো যাতে তোমার চোখ খুলে যায়! চলো এবারে সেই সময় হয়েছে!!”

বিস্ময়মাখা চোখে পালক তাকায় তার দিকে….

“কি দেখাবে?”

“চলোই না, নিজেই বুঝতে পারবে”।

দুজনে পালককে নিয়ে গিয়ে হাজির করে রোহিত রায়ের ঘরের সামনে। হতবাক পালক দেখল স্যারের ঘরের দরজা খোলা। ভিতরে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তুষার হাত দিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করল।

ঘরের ভিতর কাউকেই দেখা যায় না কিন্তু সেই সুবিশাল খাটের দিকে তাকিয়েই পালক স্তব্ধ হয়ে গেল। খাটের উপর একটা লাল ড্রেস অবিন্যস্ত পড়ে। পালক চেনে সেটা, মীরার ড্রেস। তার মনে পড়ল স্যামের ক্লাস শেষ হওয়ার পর থেকেই মীরাকে আর কোথাও দেখতে পায়নি। ব্যস, আর কিছু দেখতে চাইলো না পালক, ছুট মারলো ওখান থেকে। ঝিলম ‘পালক, পালক’ বলে কতোকটা দৌড়েও তাকে ধরতে পারলো না। কিছুক্ষণের জন্য জিৎএর সমস্ত সাবধানবাণী ভুলে গেল পালক। তুষার আর ঝিলম কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিছুটা কার্যসিদ্ধি তো হল, বাকি অনেকটা এখনো বাকি আছে। পালক ঘুণাক্ষরেও টের পেল না কি সাংঘাতিক ভুল বুঝলো সে মীরাকে।

তাদের হোটেলটার একদম ওপরের তলায় ছাদের ঠিক আগে একটা স্টোররুম ছিল। তার পাশেই একটা খালি রুম তুষার আগের থেকেই আলাদাভাবে লুকিয়ে নিয়ে রেখেছিল। বাকি কাউকে জানতে দেয়নি। ছেলেটা ট্যালেন্টেড হওয়া সত্বেও খুবই বদ স্বভাবের ছিল। সব মেয়েদেরই ওপর বোধহয় তার খারাপ নজর থাকতো। আর ঝিলম তো সেদিনের সেই অপমান সারা জীবন ভুলতে পারবেনা। নিজে সে সকলকে ছোট করার সতত চেষ্টা করে চলত, কিন্তু তাকে কেউ অপমান করবে এটা একদম বরদাস্ত করতে পারেনি।

পালকের মন যেন একদম ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কারুকে আর ধরা দিতে ইচ্ছা করছিল না। রোহিত স্যারকে সে খুব ভালোবাসতো, খুব বিশ্বাস করতো, খুব স্নেহ আর ভালোবাসা অপর দিক থেকেও পেয়েছিল.. তাই সেই দৃশ্য যতোবার তার চোখের সামনে ভাসছিল, ততোবারই যেন সে শিউরে উঠছিল।সকলের আড়ালে ওই স্টোররুমটায় উঠে বসেছিল, যাতে কেউ খোঁজার চেষ্টা করলেও তাকে খুঁজে না পায়৷ কারণ সে জানতো একটু পরেই আর কেউ না হলেও, জিৎ তার খোঁজ করা শুরু করবে।

তুষার আর ঝিলমের হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোন অবস্থা, পাখি নিজের থেকেই খাঁচায় ধরা দিতে চলে এসেছে৷ রাত তখন নটা প্রায়। তারা ক্রন্দনরত পালককে ধরে বেঁধে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাশের ঘরটায় নিয়ে এল। তারপর তুষারের ইশারায় ঝিলম তার পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে রইল। পালকও তাকে আঁকড়ে ধরল। এরপর তুষার একটা পেগ বানিয়ে তার হাতে তুলে দিয়ে বলল..

“তোমার কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি পালক,, সেইজন্যই সেদিন ঝিলম বলেছিল মীরা কি জিনিস তুমি জানো না। কিন্তু তোমারও দোষ নেই.. মানুষের মন তো! সবাইকে কি আর বাইরে থেকে বোঝা যায় বলো!! যা হওয়ার তা তো হয়েইছে, এখন তো সব জানলে.. জানি খুব কষ্ট পাচ্ছো, এটা খেয়ে নাও শরীর মন দুটোই ভালোলাগবে।”

পালক কিন্তু কিন্তু করতে করতেও তুষারের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে নিল। মনের ভিতরটা সত্যিই যেন জ্বলেপুড়ে যাচ্ছিল তার! রোহিত স্যারকে কি সত্যি তবে ভালোবেসে ফেলেছে সে?? নাকি তার বিশ্বাসের অমর্যাদা হয়েছে বলে এতো খারাপ লাগছে?? দু মিনিটে শেষ হয়ে গেল গ্লাসটা। কথা বলতে বলতে আবার সেটা ভরে দিল তুষার। কখন যে চার পাঁচটা নেওয়া হয়ে গেল, টেরও পেল না পালক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার অচেতন দেহ এলিয়ে পড়ল খাটের উপর।

ঝিলম আর তুষার একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। তুষারের চোখ লোভে চকচক করে উঠল পালকের মিষ্টি মুখ আর নিথর আকর্ষণীয় শরীরের দিকে তাকিয়ে। সেটা ঝিলমের নজর এড়ালো না। তার হাত টেনে ধরে বলল..

“না, একদম না,, অনেক কষ্ট করে এই প্ল্যান বানিয়েছি… রোহিত স্যারকে বলে যে ওনার ল্যাপটপ টা একটু ইউস করতে হবে.. চাবি নিয়ে, মীরার ঘর থেকে ওর একটা ড্রেস হাতিয়ে.. রোহিত স্যারের রুমে ড্রেসটা রেখে..!! নিজের বুদ্ধিবলে এতো কিছু করেছি এখন এইসব করে সেটা নষ্ট করতে দেব না! কালকের দিনটা মিটে যাক, তারপর অনেক সময় পাবি!”

বলে হাত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে চলে গেল।

এদিকে নিচে তখন পালকের জন্য জোর খোঁজাখুঁজি শুরু হয়েছে। ওরা দুজন টুক করে গিয়ে তাদের মধ্যে মিশে গেল আর বাকিদের মতোই বলতে লাগলো যে কোথায় গেল মেয়েটা অতো বড়ো প্রতিযোগিতার ঠিক আগের দিন? এখন কি হবে? রোহিত রায়ের তো মাথায় হাত! অর্গানাইজারদের এখনো জানানো হয়নি, তারা জানলে যে কি বলবে! হোটেল ম্যানেজমেন্টকে জানানো হল.. তোলপাড় কান্ড শুরু হল সেখানে। ওপরের ওই স্টোররুমের আশেপাশে তেমন কেউ যেত না, তাই সেখানে যে কেউ থাকতে পারে এটা কারুর মাথাতেও এল না। তুষার একজন কর্মচারীকে কিছু টাকে দিয়ে ওই ঘরটা খুলিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেও জানতো না যে সেখানে কি হচ্ছে বা হবে! স্যাঁতসেঁতে ঘুপচি ঘর, কিন্তু পালকের সেই সময়ে সেই দিকে তাকানোর মতো মনের অবস্থা ছিল না। মীরা আর জিৎএর নিজেদেরকে বড্ড অপরাধী মনে হতে লাগলো.. সবথেকে কাছে থেকেও কিচ্ছুটি টের পেল না। দুজনেই রোহিত রায় আর স্যামের কাছে খুব বকাও খেল। নীচে যখন দুর্ভাগা মেয়েটাকে নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে,, তখন ওই একই বিল্ডিংয়ের উপরের একটি ঘুপচি ঘরে পড়ে রইল পালকের অচেতন দেহ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *