প্রশাসন

মা ঝাংলাই পুজোর ইতিকথা

দীনবন্ধু পাঁজা,

বড়পোষলা, ছোটপোষলা, পলসোনা ও মুসুরির আঞ্চলিক গ্রাম দেবী ঝঙ্কেশ্বরী(ঝাঁকলাই/ঝাংলাই)
[ আষাঢ় কৃষ্ণা প্রতিপদ তিথিতে (গুরুপূর্ণিমার পর যে প্রতিপদ ) বাৎসরিক পুজো ]
অবস্থান
পূর্ব-বর্ধমান জেলার ভাতাড় ব্লকের নিত্যানন্দপুর গ্রাম-পঞ্চায়েতের পষলা মৌজাটির (জে.এল.নং – ৭৬ ) পূর্বনাম পোষলা (বর্তমানে যে নামে পরিচিত, সেটাই পূর্বনাম ছিল )। পাশাপাশি মঙ্গলকোট ব্লকে আর একটি পোষলা থাকায়, বর্তমান পরিচিতি বড়পোষলা নামে ।
মঙ্গলকোট ব্লকের পষলা (জে.এল.নং – ১২০) মৌজা, পলসনা (জে. এল. নং – ৬৯) মৌজা ও মুসারু (জে.এল.নং – ১১৯) মৌজাগুলি, পরগনা থেকে থানা গঠিত হওয়ার আগে ধৈঞা পরগনার অন্তর্গত ছিল ।
এই ধৈঞা পরগনার প্রাচীন নাম ছিল ঝঙ্ক পরগনা । তাই ঝঙ্ক পরগনার অধিষ্ঠাত্রী ভূমিদেবী হিসাবে বড়পোষলা, ছোট পোষলা, পলসোনা ও মুসারুতে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবী জাঙ্গুলী, ঝঙ্কেশ্বরী (ঝাকলাই বা ঝংলাই) নামে এলাকায় প্রতিষ্ঠা পায়।

“নয়শো এগারো সালে কৃষ্ণা প্রতি পদে,
প্রথম বরিখা কালে পড়িয়া বিপদে,
প্রকটিত হন দেবী ডাঙা খুনগড়ে ।”
(বিমল সামন্তের চটি বই থেকে)
দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে স্বপ্নাদেশ পেয়ে মাঠের মাঝে খুনগড়ের ডাঙায় এই কেউটে সমগোত্রীয় সাপের দেখা মেলে । অনেকেই মনে করেন বৌদ্ধ- তন্ত্রের জাঙ্গুলি দেবীই আজকের এই দেবী ঝাংলাই বা ঝঙ্কেশ্বরী নামে অষ্টনাগ মন্ত্রে পুজিত । আর এই মনে করার পিছনে রয়েছে এই অঞ্চলের বাবলা- ডিহির রাইতা দিঘি থেকে প্রাপ্ত জৈন্য তীর্থঙ্কর শান্তিনাথ এর মূর্তি, যা এলাকায় ন্যাংটেশ্বর শিব নামে পুজিত । আবার পাশ্ববর্তী কুন্দা গ্রামের কামার পুকুর থেকে প্রাপ্ত মহাবীরের দিগম্বর মূর্তি, যা ব্রহ্মেশ্বর নামে পুজিত । তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মূর্তি, যা মহাদেবের কালরুদ্র মূর্তি নামে পুজিত । কুন্দার ঘোষ পুকুর থেকে প্রাপ্ত বৌদ্ধ বিষ্ণু লোকেশ্বর মূর্তি, যা কেশ পদবীধারীর আরাধ্য বিষ্ণু হিসাবে পুজিত । মুসলিম আক্রমণে যখন বাংলা, ধর্মীয় ভাবে বিপর্যস্ত, তখনই এই পরিত্যক্ত জৈন ও বৌদ্ধ দেব-দেবীরা, হিন্দুধর্মের গৌণ দেব-দেবী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ।

নানা নামে ও নানা রূপে সাপের পুজো
ভাতাড় ব্লকের ভাটাকুলে শঙ্খিনী নামে ও শিলা- মূর্তিতে । কসিগ্রামে নর-নাগিনী (নন্না-নাগিনী) নামে । খুন্নাগ্রামে যমুনা নামে । মেমারি- ২ ব্লকের মন্ডল- গ্রামে জগৎগৌরী নামে ও শিলামূর্তিতে। মঙ্গলকোট ব্লকের কাঁকোড়া গ্রামে কর্কট নাগ রূপে পুজিত।
পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন
উচ্চতায় ৯ ইঞ্চি, দ্বিভুজা, কষ্টিপাথরে খোদিত এক হাতে সাপ ও অন্য হাতে গদা সম্বলিত মূর্তি বড় পোষলার মন্দিরে রক্ষিত । তেমনই ছোটপোষলায় কষ্টিপাথরের বড় মূর্তি এবং পলসোনা ও মুসুরির মন্দিরেও কষ্টিপাথরের বিগ্রহ বর্তমান ।
ঐতিহ্য
গুরুপূর্ণিমার পর যে প্রতিপদ তিথি অর্থাৎ আষাঢ় কৃষ্ণা প্রতিপদ তিথিতে দেবী ঝঙ্কেশ্বরীর বাৎসরিক পুজো বড়পোষলা, ছোটপোষলা, পলসোনা ও মুসুরির প্রাচীন ঐতিহ্য
দেবী ঝঙ্কেশ্বরী
এই ঝঙ্কেশ্বরী নামের কেউটে সমগোত্রীয় সাপের মাথার নীচে ঘাড়ে দুটি চোখ সদৃশ্য ছাপ বা চিহ্ন (চক্র) আছে । বড় মাপের ঝঙ্কেশ্বরী ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি ফণা তুলতে পারে । তীব্র বিষে ভরা বিষ থলি আছে । তীক্ষ্ণ বিষদাঁত আছে । তবে বিষ ঢালতে ও ছোবল দিতে চোয়ালে যে সাহায্যকারী টেমপোরালিস ও ডাইগ্রাসটিক পেশীর সক্রিয়তা থাকা দরকার, তা কিন্তু তেমনভাবে নেই । ঝঙ্কেশ্বরীর লেজ ক্রমান্বয়ে সরু হবার আগেই শেষ হয়েছে, ফলে এক ঝলক দেখলে লেজ ছোট বলেই মনে হয় । তাই লেজ কাটা জনশ্রুতি । ফুসফুস একটা ও ছোট, হৃদপিণ্ডে তিনটি প্রকোষ্ঠ । রক্ত সঞ্চালন মানুষের মতো স্বচ্ছন্দ নয় । নিরুপদ্রব জীবনে অভ্যস্ত হওয়ায় রক্তে অক্সিজেন মেশার হারও একটু কম । ফলে শান্ত, ধীর ও স্থির বৈশিষ্ট্যের অধিকারী । কোন ঘর্মগ্রন্থি না থাকায়, খুব বেশি দৌড়তে পারে না, একটু দৌড়েই হাঁপিয়ে ওঠে । কোন কিছু শুনতে পায় না, তবে কম্পন, সে খুব সামান্য হলেও টের পায় । আর দৃষ্টি শক্তি অদ্ভুত ধরনের ও প্রকৃতি আশ্চর্য রকমের । দিনের বেলাতেই বেশি বের হয় । অন্য সময় গৃহস্থ বাড়ির উনুনের খাল, মড়াইয়ের তলা, গোয়ালের মাচা, খড়ের পালুই ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থাকতে ভালোবাসে ।
ঝঙ্কেশ্বরী যে কেউটে সমগোত্রীয় সাপ, তাতে কোন সন্দেহ নেই । ঝঙ্কেশ্বরীর গায়ের রঙ লালচে কালো, কখনো-কখনো নিস্ কালো বা হালকা কালোও হয় । ঝঙ্কেশ্বরী প্রকৃতিতে কেউটের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কেউটে উত্তেজিত হলে, ফনা তুলে দ্রুত দৌড়ে ছোবল দিতে ছুটে আসে । ঝঙ্কেশ্বরীর প্রকৃতি কিন্তু এ রকম নয় । অতি বিষধর হয়েও ঝঙ্কেশ্বরী এ রকম ছোবল দিতে ছুটে আসে না বা দ্রুতগতিতে এসে আচমকা কামড়ায় না । উত্তেজিত হলে, পেশী নিয়ন্তন সম্যক কার্যকরী রাখতে না পারায় ছোবল মারার আগেই বিষ, বিষথলি থেকে বাইরে বেরিয়ে পরে । ফলে কামড়ের আগেই বিষঢালায়, ঝঙ্কেশ্বরীর কামড়ে অঙ্গহানি (সেলুলাইটিস) হলেও মৃত্যু প্রায় ঘটে না বললেই চলে । বিষধর সাপের চোয়াল ও পেশী উভয়েই বিষথলি (পয়জন গ্লাণ্ড) থেকে বিষ বাইরে বের করে দিতে বিশেষ ভূমিকা নেয় । কিন্তু চোয়াল ও পেশীর কর্ম সমন্বয় ঝঙ্কেশ্বরীর একেবারেই নাই । তাছাড়া বিষের গুণমান ও বিষ ঢালার পরিমানের উপর নির্ভর করে বিষক্রিয়া । সাপের বিষ, বিষগ্রন্থী থেকে ক্ষরিত নানা প্রকার উৎসেচক এবং প্রোটীন জাতীয় দ্রব্যের সংমিশ্রণ । উৎসেচকগুলি হল, প্রোটিয়েজ, কোলিনেস্টারেজ, রাইবোনিউক্লিয়েজ, হায়ালুরোনিডেজ ।
এই যে ভয় পেয়ে আত্মরক্ষায় যথেষ্ট বিষ ঢালা কেউটের ক্ষেত্রে দেখা গেলেও, ঝঙ্কেশ্বরীর ক্ষেত্রে বিষ ঢালায় ত্রুটি থেকে যায় । আর এই বিষ ঢালার ত্রুটিই ঝঙ্কেশ্বরীকে দেবীত্বে উত্তরণের প্রধান সোপান ।
সাপ এখানে আরাধ্য দেবী। বছরভর সাপের
সঙ্গেই দিনযাপন । স্থানীয় বিশ্বাস দেবীর ঐশ্বরিক আশীর্বাদেই ঝঙ্কেশ্বরীর কামড়ে কারো অনিষ্ট হয় না । তাই এখানে ঝাংলাই এর কামড়কে বলে প্রসাদ ।
dbp সন্ধানী
বাৎসরিক পুজো
ঝঙ্কেশ্বরী মনসা হিসাবে পুজিত নয় । কারণ পুজোর তিথি, ধ্যানমন্ত্র ও উপচার (ধূপ, ধুনা) মনসা পুজোর সঙ্গে মেলে না । দুধ, কলা, চিড়ে, মন্ডা, সন্দেশের সঙ্গে এক টুকরো উচ্ছে নৈবেদ্যের প্রধান উপকরণ । এই নৈবেদ্য, পুজোর পর প্রসাদ হলে, তখন প্রথমে উচ্ছে মুখে দিয়ে তবেই অন্য প্রসাদ মুখে দেওয়ার নিয়ম ।
গ্রাম ষোলআনার নৈবেদ্য এসে গেলে, শুরু হয় পুজো । প্রথমে একটি জীবন্ত ঝঙ্কেশ্বরী সাপকে দুধ ও ফুল দিয়ে পুজো করা হয়। এটিই ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর বিশেষত্ব । এ পুজোতেও সবার পুজো এক সঙ্গে হয় না । পুজোর নৈবেদ্য রাখা হয়, নিজ নিজ জাতির বরাদ্দকৃত স্থানে । ফলে এই পুজোয় জাতি- গত বিভাজন চোখে পড়ার মতো । এক কথায় পুজোয় বর্ণভেদ বর্তমান।
পুজো শেষে নির্দিষ্ট সামাজিকতা মেনেই হয় পাঁঠা বলি । বলির পর হয় হোম । সন্ধ্যায় চার গ্রামের চার পুরোহিত ক্ষীরকলসী নিয়ে খুনগড়ের ডাঙায় যায়, কলসীতে কলসীতে ঠোকাঠুকি করে
নিজ নিজ মন্দিরে এসে ক্ষীরকলসী ভাঙে ।এটি দেবীর প্রকটকালের স্মৃতি ও দেবীর উত্থানস্থলকে সামাজিকভাব স্মরণে আনার লৌকিক অনুষ্ঠান । আর এর ভিতর দিয়ে দেবীকে সামনে রেখে চার গ্রামের সম্প্রতির মিলনক্ষেত্র রচিত হয় ।
ঝঙ্কেশ্বরীর ধ্যান মন্ত্র
ওঁ দেবীং কাঞ্চন সন্নিভাং শুভাদাং ।
নাগেন্দ্রৈঃ ক্ষেত্র শেখরাং ফণীমনিং ।
রাগান্বিতাং চাব্যাং যশোদা প্রাসাদাৎ ।
করভ্যাং মুদা বিষহরিঃ পদ্মোদ্ভবাং ।
জাঙ্গলিং ওঁ হ্রীং ঝঙ্কেশ্বর্যে নমঃ ।।
dbp সন্ধানী
ঝঙ্কেশ্বরী’র বিজ্ঞান সম্মত নামকরণ বা
নোমেনক্লেচার (NOMENCALTURE)
পর্ব ( Phylum ) : কর্ডাটা ( Chordata )
উপপর্ব (Sub-Phylum) : ভার্টিব্রাটা (Vertebrata)
অধিঃশ্রেণী (Super Class) :
নাথোস্টোমাটা(Gnathostomata)
শ্রেণী ( Class ) : সরীসৃপ বা রেপ্টিলিয়া (Reptilia)
বর্গ ( Order ) : স্কোয়ামাটা ( Squamata )
উপ-বর্গ (Sub-order) : ওফিডিয়া ( Ophidia )
গোত্র (Family)‌ : ইলাপিড (Ilapid)
গণ (Genus) : নাজা (Naja)
প্রজাতি (Species) :
নাজা কাউট্টিয়া (naja kauttia)
উপ-প্রজাতি (Sub-Species) :
ICZN এর স্বীকৃতির উপর নির্ভর করছে ।
দেবীত্বে উত্তরণ পর্বে নাম : ঝঙ্কেশ্বরী ।
অপভ্রংশে : ঝাঙলাই / ঝাংলাই / ঝাঁকলাই ।

প্রাণীবিদ তথা সর্পবিদদের কাছে ঝঙ্কেশ্বরী সম্পর্কে সহজাত প্রশ্নগুলি ।
(১) ঝঙ্কেশ্বরী (ঝাংলাই বা ঝাঙলাই) কি
বিশুদ্ধ বা খাঁটি কেউটে (মাঠ-কেউটে /আল-কেউটে / কাল-কেউটে ) সাপ, নাকি জিনগত আকস্মিক পরিবর্তনে অর্থাৎ পরিব্যক্তি বা মিউটেশনের (Mutation) ফলে উৎপন্ন উপ- প্রজাতির (Sub-Species) সাপ ?
(২) সত্যিই কি ঝাংলাই মিউট্যান্ট, নাকি ঝাংলাই এর জৈব-বিবর্তন (Organic Evaluation) ঘটেছে ?
(৩) যদি ঝাংলাই বিশেষ প্রজাতির বা উপ-
প্রজাতির সাপই হয়, তবে ঝাংলাই এর বিবর্তন ক্রমিক ও ধারাবাহিক ধাপে ধীরগতিতে ঘটেছে, না কি বিচ্ছিন্ন ভাবে হঠাৎই ঘটেছে ?
(৪) ঝাংলাই এর কি অনু-বিবর্তন (মাইক্রোইভোলিউশন) ঘটেছে, নাকি বৃহৎ বিবর্তন (মাক্রোইভোলিউশন) ঘটেছে ?
(৫) নাকি ঝাংলাই ক্রমপরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন প্রজাতি (অ্যানাজেনেসিস), নাকি উপগোষ্ঠী থেকে পরিবেশগত প্রভাবে সৃষ্ট নতুন প্রজাতি (ক্ল্যাডেজেনেসিস) ?
ঝঙ্কেশ্বরী (ঝাঙলাই বা ঝাংলাই) যদি কেউটে (Cobra) তথা Naja naja kouttia ই হয় ।
তাহলে প্রশ্ন —
(১) ঝাঙলাই বা ঝাংলাই এর অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া, ভ্রূণতত্ত্ব, কোষবিদ্যা, DNA- হাইব্রিডাইজেশন টেকনিক, বায়োকেমিস্ট্রি, জেনেটিক্স,বাস্তুতত্ত্ব ও অভিব্যক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে, ঝাংলাই এর প্রজাতি বা উপ-প্রজাতি কী ঠিক করা হয়েছে ?
(২) ঝাংলাই ও কেউটে কি একই সম্পর্কেবদ্ধ প্রাণী ?
যদি তা না হয়ে থাকে—
(১) তবে কিসের ভিত্তিতে ঝাংলাইকে নিছকই কেউটে (Naja naja kouttia) সাপই বলা হচ্ছে
উপসংহার
অনেকের ধারণা এমন সাপে (ঝঙ্কেশ্বরী) মানুষে সহাবস্থান পূর্ব-বর্ধমান জেলার চারটি গ্রাম (বড় পোষলা, ছোট পোষলা,পলসোনা ও মুসুরি) ছাড়া আর কোথাও নেই । কিন্তু এ ধারণা সর্বাংশে ভুল । মহারাষ্ট্রের শোলাপুর জেলার শেতপাল গ্রামে ও অসম এর লালা এলাকায় মানুষের সাথে কেউটে সাপেরা নিশ্চিন্তে বাস করে । এলাকার জনশ্রুতি এই কাল-কেউটে গত ১০০ বছরেও এখানকার কোন মানুষকে ছোবল মারেনি । এখানকার মানুষের সহজ সিদ্ধান্ত ঘর-কেউটেকে বিরক্ত না করলে, কখনোই ছোবল মারে না । এখানে কেউটে সাপ দেবী হিসাবে নয়, রক্ষাকর্তা হিসাবেই মান্য, আর মানুষের ভালবাসায় মানুষের সাথেই বাস করে ।
তবে ভাবনার বিষয়, সাপে-মানুষে সহাবস্থানে বসবাসকারী এই সব বিশেষ প্রজাতির সাপেদের প্রাকৃতিক নিয়মেই নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল । দেখা গেছে এই বিশেষ প্রজাতির সাপেরা নির্দিষ্ট একটি এলাকায় থাকতে ভালোবাসে । তার বাইরে এরা যায় না । প্রত্যেক জীবের কিছু না কিছু ভেদ (Variation) থাকবেই । জীবের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভেদ জীবকে তার অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে । যে জীবদেহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভেদ বর্তমান, তারাই শেষ পর্যন্ত জীবন সংগ্রামে জয়ী হয় । বাকীরা চিরতরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয় । যে জীবের অভিযোজনমূলক ভেদ বিদ্যমান, তারা অন্যান্য জীবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে ।
ঝঙ্কেশ্বরীর এই অভিযোজনমূলক ভেদ অবর্তমান, তাই একদিন ঝঙ্কেশ্বরীরও চিরতরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল । সাতখানি গ্রামে বাস থেকে এখন চারখানা গ্রামে ঠিকেছে । স্যাঁতসেঁতে নোংরা জায়গায় বাস থেকে ছত্রাক,এঁটুলি ও নানা পরজীবী, এর যে ক্ষতি করে চলেছে, এ থেকে যদি ঝঙ্কেশ্বরী তার চারিত্রিক মানসিকতার বদল নিজেই নিজে থেকে ঘটাতে না পারে তবে হয়ত একদিন এ জীবটিরও বিলুপ্তি
ঘটবে । তবে এও ঠিক প্রাণীটি ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী হওয়ায় এই গরমের এলাকায় স্যাঁতসেঁতে জায়গা অনিবার্য হয়ে পড়ে ।
আর এখানেই জীবের জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য অনিবার্য হয়ে পরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভেদ যা তাকে পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে ।
মানুষের দেওয়া দেবীর স্বীকৃতি, ঝঙ্কেশ্বরীকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই নিরাপদ আশ্রয়ই ঝঙ্কেশ্বরীকে অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলেছে । ফলে ঝঙ্কেশ্বরীর জীবনে প্রতিযোগিতা একেবারেই নেই, অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম না থাকলে পরিবেশে খাপ খাওয়ানো দায় ।
এটা ভুলে গেলে চলবে না, এই অলসতার কারণেই প্রায় ৫০,০০০ বছর পূর্বে নিয়েনডারথাল (NEANDERTHAL) মানুষের এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্তি ঘটেছে ।
ঝঙ্কেশ্বরীর বিষঢালার ত্রুটিই ঝঙ্কেশ্বরীকে দেবীত্বে উত্তরণ ঘটিয়েছে । জয় সর্পরূপী ভূমিদেবী ঝঙ্কেশ্বরীর জয় । জয় ঝঙ্ক পরগনার পবিত্র মাটির জয় । এ জয়গান ধর্মীয় বিশ্বাস বা আবেগর প্রতি জয়গান নয় । এ জয়গান সত্য, শিব ও সুন্দরের প্রতি জয়গান । প্রকৃতির মহিমার প্রতি জয়গান ।

তথ্যসূত্র
ক্ষেত্রসমীক্ষায়( ২০১৮ খ্রিঃ) প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত ।
ছবি
কিছু আমার নিজের তোলা অন্যগুলি সংগৃহীত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *