সাহিত্য বার্তা

তোমার দেশে

,তোমার দেশে,

হেমন্ত সোরেনের ছেলে জীবন হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে আসছে টুলের উপরে জলের গ্লাসটা ধরার জন‍্যে ‌‌। আমি তাড়াতাড়ি গ্লাসটা হাতে না ধরলে আজ সকালে সে কাচের গ্লাসটা ভেঙ্গে ফেলত । আমার ছেলে সার্থকের মতো সে খুব ছটফটে । এমন সময় আকাশে ঝড় উঠেছে ‌। মাতাল বাতাসে দমকা ধাক্কায় আমার হৃদয় দরজা কেমন করে খুলে যায় । অন্ধকার ঘর থেকে বাহির হয়ে আমি ফিরে যাই তোমার দেশে যেখানে তুমি দীর্ঘ দিবস রজনী জেগে আছো । সেই কবিতার দেশে যেখানে তুমি আছো প্রিয়ার বেশে । আমি সুখে থাকি শুধু তোমার কাছে । আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল ফকির চাঁদ কলেজে ডায়মন্ড হারবারে । দু’জনের পরিচয় হয়েছিল গান গেয়ে । ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়ায় আমার প্রাণে ।
দহনে দানে পূণ‍্য করো এ জীবন ‌।’
কলেজের নবীন বরণে তুমি শুনিয়েছিলে যে গান ‌, সেদিন সবাই শুনেছিল সে গান কিন্ত মনে রেখেছে শুধু একজন । তোমার গান শুনে পূণ‍্য আমার এ জীবন ‌‌‌‌। ফুলের বুক থেকে সেই গান নিয়ে অলি আমার কানে সদা গুন গুনায় ‌‌। কোকিলের ডাক শুনে কত বসন্ত ফিরেছে তোমার দুয়ার থেকে ‌‌।
তারপর । তারপর শুধু অতীত । ধন‍্য আমি তোমাকে পেয়ে আজ এ বসন্তে এই কবিতার দেশে । আমি এখন সুখী রাজ পুত্র । দুঃখ ,কষ্ট কি জানি না ! পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পারে আমার স্বপ্নে থাকা যে রাজ কন‍্যার আমি খোঁজ করছিলাম ; সেই রাজকন‍্যা এখন আমার সামনে ! চল না ফিরে যাই আমাদের সেই কলেজে । নতুন করে শুরু করি ‌‌। তুমি ফুলের প্রথম কুঁড়ি । বসন্তের বাতাসে ভ্রমরের মতো আমার প্রথম আহ্বান । প্রথম আলো । প্রথম অনুভূতি । তারপর শুধু গান আর গান ।
তোমার সঙ্গে কত ঝগড়া ! কলেজে কোন বান্ধবী আমার সঙ্গে কথা বললে তোমার কত রাগ হত ! কলেজ থেকে আমরা দু’জনে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম সবুজ ঘাসে ঝাউগাছের তলায় । নদীর ঢেউ গুনতাম ‌। তোমার কোলে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখতাম ‌। কখনও নদীতে জোঁয়ার আসত ‌। ঝড় উঠত ‌। কলেজ থেকে ছুটির ঘন্টা শুনতাম ‌। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতাম ।
সত‍্যি- সত‍্যি একদিন সব অভিমান, বিরহের অবসান হল। নহবৎ বেজে উঠলো এক বৈশাখী সন্ধ‍্যায় । বর বেশে আমি গেলাম তোমাদের বাড়িতে । আমি মালা দিলাম আমার রাজকন‍্যার গলায় । তুমি মালা দিলে আমার গলায় । মালা বদল হল । বাসর ঘর ! ফুলে ফুলে সাজানো ছিল । ফুল শয‍্যায় তুমি বধূর বেশে এলে আমার পাশে । মুদিত চোখে তোমার হৃদয় বীণা বেজে উঠল । দু’টো হৃদয় এক হয়ে কি স্বপ্ন দেখেছিল সে রাতে ! তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হল ‌‌। কী আনন্দ ! তোমার শরীরের কী মাদকতা ! কী সুবাস ! আমি মুগ্ধ হয়ে শুধু তোমাকে দেখতাম । তুমি হাত বাড়ালে আমি বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতাম । সব দুঃখ, যন্ত্রণা দূর হত ‌। আমাকে পেয়ে তুমি কত সুখী ! কত গর্ব ! আমাকে সর্বদা তোমার দেখতে ইচ্ছা করত । আমারও ঠিক তাই হত । এ পৃথিবীতে এতো সুখ আছে তোমাকে না পেলে হয়ত জানতাম না ‌‌। তুমি সকালে ফুল তুলতে ,মন্দির পূজো করতে আমি দেখতাম । সন্ধ্যা বেলায় তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালাতে ‌। প্রদীপের আলো থেকে তাপ নিয়ে তোমার হাতের উষ্ণ স্পর্শ দিতে আমার কপালে,বুকে ‌। তোমার হাতের কোমল স্পর্শে সুখের অনুভূতিগুলো আরোও মধুর লাগত । স্বর্গের দেবীর স্পর্শে কিছু অপূর্নতা থাকে !
আমাদের ঘর আলো করে যেদিন নতুন অতিথি এল ,সে কী আনন্দ হয়েছিল বল ! তার নাম রাখা নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার রাগারাগি হল । তুমি তার নাম দিলে সার্থক । স্বার্থক হল আমাদের ভালোবাসা । সার্থক একটু বড় হল। তার সঙ্গে খুনসুটি করে আমার সারা রোববারটা কখন কেটে যেত ! কখনও আমি পক্ষীরাজ ঘোড়া হতাম । সে আমার পিঠে চড়ত । তুমি রান্না ঘর থেকে হেসে বলতে ,’কিরে ,তোর বাবার কষ্ট হয় না ?’ কখনও অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে ,তুমি সঙ্গে ছেলে আমার জন‍্যে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে । কেন এতো দেরি হল বলে রাগ দেখাতে । সার্থক খাবার দাও বলে তার ছোট দু’হাত আমার সামনে বাড়িয়ে দিত । পকেট থেকে তার হাতে খাবার দিলে কি আনন্দ ! পৃথিবীর যত সুখ সব আমাদের এই ছোট ঘরে । আমার ঘাম ঝরছে দেখে তুমি আমার জামার বোতাম খুলে দিতে । তারপর জলের গ্নাস আমার হাতে দিতে ।
কখন জলের গ্নাস আমার হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে গেল । আমি কবিতার দেশ থেকে ফিরে এলাম । দেবীর মতো তুমি কখন অদৃশ্য হয়ে গেল । তোমার সঙ্গে সার্থক বাতাসে মিলিয়ে গেল ‌‌‌। আমি এখন একা । দুর্গম পাহাড়ের কোলে জঙ্গলের কুঁড়ে ঘরে ‌। পাহাড় দেখি । সূর্যাস্ত দেখি । পাখীরা দলবেঁধে বাসায় ফেরে । মেঘেরা উড়ে রায় । কোথায় যায় ! হয়ত তোমার কাছে ‌‌। মন চায় মেঘকে বলি,’একবার দাঁড়াও । তুমি আমার প্রিয়াকে সংবাদ দিতে পারো । বল তার জন‍্যে আমি অপেক্ষা করছি ।’

সুবল সরদার
মগরাহাট
দক্ষিণ ২৪ পরগনা
তাং ১২ ০৭ ২০২১
ফোন ৯৬০৯০৫৮৫২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *