সাহিত্য বার্তা

উড়ান পর্ব ১০

উড়ান (পর্ব- ১০),

দেবস্মিতা রায় দাস

অনেকক্ষণ বুকে হাত দিয়ে বসে রইল পালক। তার চোখ দিয়ে এখনো জল পড়ছে। এতো কম দিনে সে যে এতো বড়ো প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিতে পারবে, এটাই তো সে ভাবতে পারেনি। তারা যতজন এখানে এসেছে, তাদের মধ্যে সবথেকে জুনিয়র পালক। মা আজ এখানে থাকলে কতই না খুশি হতেন। মীরা, পালক আর রাহুল বাদে তুষার আর রাগিনী দুজন সিলেক্টেড হয়েছে। রাগিনী শান্ত স্বভাবের, কিন্তু তুষার ছেলেটা একটু বদ ধরনের। বিশেষত চোখের চাউনি ভালো না, আর ঝিলমের সাথে খুব ভাব ছিল।

ঝিলম কিন্তু উঠতে পারেনি। এতে তার রাগ বেড়ে গেল দ্বিগুণ এবং আক্রোশ পুরোটাই গিয়ে পড়ল পালকের উপর। তার চরম কিছু ক্ষতি করার সুযোগ খুঁজতে লাগলো।

এদিকে টেস্ট হয়ে যাওয়ার পর সকলে বাইরে এসে পালকের খুব প্রশংসা করতে লাগলো। রীনা ম্যাডাম পালকের হাতটা ধরে বলল..

“আমি প্রথম দিন থেকেই জানতাম তোমার মধ্যে অনেক পোটেনশিয়ালস আছে, রোহিতকে তাই বলতাম.. সামনের দিনের জন্য অনেক শুভকামনা রইল পালক!”

পালক ও প্রত্যুত্তরে একটা ‘থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম’ বলল ধরা গলায়। স্যাম খুব কড়া, বেশী প্রশংসা করে একেবারেই স্টুডেন্টকে নষ্ট করার পক্ষপাতী না! রাহুল আর মীরা ছাড়া আর সবাই তার কাছে বকা খায়। পালকের দিকে তাকিয়ে বলল..

“পরিণত হয়েছে আগের থেকে অনেক বেশী, তাও আরো ইমপ্রুভমেন্ট দরকার। প্র‍্যাকটিস চালিয়ে যাও যা করছিলে তার দ্বিগুণ। মনে রেখো, কম্পিটিশন কিন্তু একদম সামনে!”

পালক বাধ্য ছাত্রীর মতোন ঘাড় নাড়লো। মীরা একটু হেসে পালকের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল..

“চলো তো ইট নিডস আ সেলিব্রেশন.. স্যাম সারাক্ষণ সবাইকে বকা দেয়.. লেটস গো এন্ড এনজয়! আজ চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি। একটু ফ্রেশ এয়ার দরকার। কি স্যার পারমিশন আছে তো?!”

রোহিত রায় একটু হাসলেন..

“ওকে কাম কুইক.. অল অফ ইউ নিড মোর প্র‍্যাকটিস।”

বলে পালকের দিকে সস্নেহে তাকালেন।

বাকি দিনটা মীরা, পালক আর রাহুল খুব এনজয় করল। আজ মীরার মনটা খুব খুশি, পালক সিলেক্টেড এতে সে বোধহয় সবথেকে খুশি হয়েছে। তার নিজের জীবনটা অন্যরকম বলেই বোধহয় পালকের কষ্টটা সে বুঝতো। মীরা আর জে হিসেবে নাম করে গেছিল ঠিকই, সামনে তাকে সকলেই ভয় করে চলত.. কিন্তু পিছনে যে তাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরণের কথা হয় এটা তার অজানা ছিল না। যেটা ঝিলম একটু উগ্র ধরনের বলে সামনে বলে ফেলেছে, সেটাই যে অনেকের মনের কথা এটা সে ভালোই বুঝতে পারতো। তাই রোহিত রায়, রীনা ম্যাডাম, পালক আর রাহুলকে ছাড়া বিশেষ একটা কাউকে মীরা বিশ্বাস করত না। পালক আর রাহুলের সরলতা তার ভীষণ ভালোলাগতো। তাই পালকের কাছ থেকে করণের তার প্রতি করা অন্যায়ের কথা শোনার পর থেকে সে করণের ওপরও খুব খেপে গিয়েছিল।।

তাদের টেস্ট দুপুর বারোটার মধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর তারা বাইরে লাঞ্চ করে দুবাই এমিরেটস মলে গিয়ে মুভি দেখল, মলে অনেক্ক্ষণ ঘোরাঘুরি করল, শপিং করল.. তারপর সন্ধ্যাবেলা কিউরানিক পার্কে বসে অনেক গল্প করল। রাহুল যথারীতি দুজনকে সমানে হাসিয়ে যেতে লাগলো। খুব ভালো কাটলো দিনটা সকলের। কি সুন্দর শহর এই দুবাই, পালক ভাবে।

পরের দিন থেকেই আবার লড়াই শুরু, কারণ কম্পিটিশনের আর মাত্র সাতদিন বাকি। মাঝে একদিন ইন্টারন্যাশনাল আর জে ফোরাম থেকে লোক এসে তাদের নাম ফোন নম্বর আর কিছু তথ্য নিয়ে আর প্রত্যেককে একটা ভালো হেডফোন উইথ মাইক দিয়ে গেল। প্রত্যেক পার্টিসিপ্যান্টের জন্যই আছে।

এদিকে ঝিলম সমানে সুযোগ খুঁজে যেতে লাগলো পালক আর মীরার ওপর শোধ তোলার। এর মধ্যে পালকের জিৎএর সাথে বারকয়েক কথা হল। বেশ অনেকদিন পরই হল। রোহিত রায় আর স্যাম তাদের পাঁচজনের পিছনেই ভালোমতোন সময় দিতে লাগলেন।

প্রতিযোগিতার ঠিক দিনদুয়েক আগে তুষার হঠাৎ ঝিলমকে নিয়ে এল পালকের কাছে। পালক সেই সময় তার ঘরে একাই ছিল, মীরা বাইরে কোথাও গিয়েছিল। নাহলে আসার সাহস করত না। পালক একটু অবাক হল আর ভয় পেল। ঝিলমের উগ্র স্বভাবকে সে একটু ভয়ই পেত, আর তুষার ছেলেটাকে সে কোনোদিনই খুব একটা পছন্দ করত না! কিন্তু তাদের আচরণ দেখে সে আরো অবাক হয়ে গেল। পালক তখন স্যাম একটা স্পেশাল ভয়েস মডুলেশন ক্লিপ দিয়েছিল, সেটা শুনছিল। তাদেরকে দেখে হেডফোনটা নামিয়ে খাটের উপর রাখে। তুষার একপাশে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে আর ঝিলম এসে পালকের হাতটা ধরে কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেলে….

“আমার সেদিনকার ব্যবহারে আমি সত্যিই খুব লজ্জিত পালক। জানি না কিভাবে অমন করে ফেললাম। আমার কিন্তু শুরুর থেকেই তোমায় বেশ ভালোই লাগতো,, আসলে জানিনা বলাটা উচিত হবে কিনা, এর জন্য মীরাও কিছুটা দায়ী, জানো তো! যাক তোমাকে আর সেসব কথা বলবোনা.. তোমার খুব ভালো বন্ধু তো!”

পলকে পালকের মুখ লাল হয়ে উঠল। সে এমনিতে ঠান্ডাই, চট করে রাগে না। কিন্তু মীরার সম্পর্কে কোনো কথা শুনতে রাজি নয়। বেশ কড়া গলাতেই জিজ্ঞেস করল..

“মানে কি বলতে চাইছো কি তুমি? এর সাথে মীরার কি সম্পর্ক??”

“ওই দেখো এইজন্যই তো কিচ্ছু বলতে চাইছিলাম না, জানি তো বিশ্বাস করবে না। ও যা জিনিস সে শুধু আমি জানি। তুমি তো সবে এসেছো। কবে থেকে চেনো ওকে? আমি এখানে শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতেই এসেছি, তুমি আমায় ভুল বুঝো না আর সম্ভব হলে ওদের ফাঁদে পা দিও না!!”

“ওদের মানে?”

“মানেটা তুমি বুঝবে সময়ের সাথে পালক, ঠিকই বুঝবে একদিন। তুমি তো অমন মেয়ে নও আমি জানি। কিন্তু যখন বুঝবে হয়তো দেরি হয়ে যাবে!”

পালক এবার একটু থতমত খেয়ে যায়। ওদের বলতে যে ঝিলম রোহিত স্যার আর মীরার কথা বলছে সেটা তার বুঝতে বাকি থাকে না। তুহিনাও এমনই কিছু কথাই বলেছিল না! পালক খুব একটা বোকা মেয়ে নয়। কারুর কোনো কথাই যে একবারে বিশ্বাস করে নিতে হবে এমনও কোনো কথা নেই৷ বিশেষত মাকে হারিয়ে সে আগের থেকেও আরো অনেক বেশী পরিণত হয়ে উঠেছে। কোনো ঘটনাকে সুস্থির ভাবে ভেবেচিন্তেই সে কিছু ডিসিশন নেয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা এসব ব্যাপারে তার একটু কমই আছে। একটু যেন উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ল সে। তুষার এতোক্ষণ একটাও কথা বলে নি। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে পালকের মনোভাব কতোকটা বুঝতে পেরেই যেন বলে উঠল….

“একটাই কথা পালক, তুমিও এডাল্ট, কাজেই যা করার তুমি নিশ্চই বুঝেশুনেই করবে.. কিন্তু কারুর প্রতি অন্ধ হয়ে থেকোনা আর মনে রাখবে তোমার আরো দুটো ভালো বন্ধুও কিন্তু তোমার পাশে রইল। কোনো অসুবিধা হলে জানিও। আর যদি তুমি দেখতে চাও, তো তোমায় এমন কিছু দেখাবো যাতে তোমার চোখে সবকিছু পরিষ্কার হবে,, তবে সময় সুযোগ বুঝে!”

দুজনে চলে যাওয়ার পর পালক হাঁ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। যা শুনলো তার সত্যতা কতোটা? মেজাজটা খিঁচরে গেছে, আর ক্লিপে মনোনিবেশ করতে পারলো না। কি দেখাবে বললো তাই বা কে জানে!

কিছুক্ষণের মধ্যেই মীরা ফিরে এল। ঝিলম নিজেই একটি অত্যন্ত উগ্র ধরনের হিংসুটে হীনমন্য মেয়ে। তুষারও তথৈবচ। পালক এগুলো সবই জানে, কিন্তু কিছু কিছু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের এমন ক্ষমতা আছে যে তাদের কথা অন্য মানুষকে যেন তেন উপায়ে কিছুটা হলেও বিশ্বাস করিয়েই ছাড়ে। পালক দেখলো মীরার সাথে সে আর আগের মতোন সহজভাবে কথা বলতে পারছে না। মীরাও বুদ্ধিমতী মেয়ে, সেও কিছু আঁচ করল। কিন্তু তার সাথে রাগিনী এসেছিল, তাই আর সে খুব একটা উচ্চবাচ্য করল না। রাগিনী খুব শান্ত, নামের সাথে মিল খাইয়ে দারুণ গান করত। কথা বলাও খুব সুন্দর। রাগিনীও অনেক আগের থেকেই এই চ্যানেলের সাথেই আছে, কিন্তু আজ অবধি তার কোনো উঁচু গলা বা চেঁচিয়ে কথা বলতে কেউ দেখে নি।

আসল ঘটনাটা ঘটল এর পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিযোগিতার ঠিক একদিন আগে। পালকের মন প্রচন্ড বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। আসলে অতোবড়ো প্রতিযোগিতায় তাদের পাঁচজনের মধ্যে সেই একমাত্র নতুন, তার টেনশন তো ছিলই,, তার উপর মনটা প্রচন্ড বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল কাকে বিশ্বাস করবে, কাকে করবে না! এর মধ্যে একটা দারুণ কান্ড হল.. সেইদিনই দুপুর নাগাদ একটা দারুণ সারপ্রাইজ পেল। নিজের রুমে মীরার সাথে বসে ছিল, এমন সময় পিছন থেকে একজন এসে হঠাৎ তার চোখদুটো চেপে ধরল৷ ফিরে দেখে জিৎ! পালক তো প্রচন্ড খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরল জিৎকে। কতোদিন দেখা হয়নি তাদের। কথা বলে জানতে পারলো রোহিত স্যারের সাথে আগেই কথা বলেছিল সে এই প্রতিযোগিতা দেখতে আসতে চায় বলে, উনিই টিকিট পাঠিয়েছেন। পালকের চোখে জল এল। এই লোকটা করেই চলেছে তার জন্য আর সে কিনা তাকেই অবিশ্বাস করল?? জিৎকে দেখে তার অর্ধেক মনখারাপ দূর হয়ে গেল, তবু মনে একটু দ্বিধা তো ছিলই। তাই সে আর কিছু না লুকিয়ে সমস্তটা জিৎকে খুলে বলল। পুরোটা মন দিয়ে শুনে জিৎ মাথা নাড়লো….

“দেখ, আমি জানি না ওরা তোকে ঠিক কি দেখানোর কথা বলেছে৷ কিন্ত আমার মনে হয় না, তোর এখন এই সমস্ত বিষয়কে পাত্তা দেওয়াটা ঠিক হবে৷ নিজের যোগ্যতায় তুই এখানে এসে পৌঁছেছিস, সেটা আর কারুর কথায় নেচে নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না! আর যারা বলেছে তারা নিজেরাই কিরকম তার প্রমাণ তো তার কাছে রয়েছেই। তাই তাদের কথায় নাচাটা কি এই মুহুর্তে ঠিক হবে??”

পালক আর কিছু না বলে একটু হাসল শুধু। আর মনে মনে ভাবলো সে খুব ভাগ্যবতী এমন একটা বন্ধু পেয়ে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *