পুলিশ

ওড়িশার গ্যাংস্টার ধৃত বীরভূম জেলায়

খায়রুল আনাম, ৬ জুলাই,

দীর্ঘায়িত হচ্ছে নিউটাউনের  ছায়া
ওড়িশার  গ্যাংস্টার  গ্রেফতার বীরভূম  থেকে 
         
জেলা বীরভূম কী ক্রমশই অপরাধীদের উৎকৃষ্ট আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে ?  বীরভূম জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে ভাবে একের পর এক ভিন রাজ্যের অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে, তাতে এই প্রশ্নটাই উঠে আসছে জোরালোভাবে। এইসব অপরাধীরা এই রাজ্যের এবং এই দেশের না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই আতঙ্কটা বাড়ছে অধিক মাত্রায়।        শান্তিনিকেতনের তালতোড়ের একটি ভাড়া বাড়ি থেকে পুলিশ রাজমিস্ত্রী পরিচয় দিয়ে থাকা কয়েকজন যুবককে  পাকড়াও করে জানতে পেরেছিলো যে, তাঁদের বাংলাদেশ থেকে ভড়া করে আনা হয়েছে,  নানুরের এক রাজনৈতিক নেতাকে খুনের উদ্দেশ্যে।  মেদিনীপুর  জেলে বন্দী এক কয়েদি জেলে বসেই তাদের  বাংলাদেশ থেকে  এখানে আনার বিষয়টি জানতে পেরে  বিষ্মিত হয়েছিলো পুলিশ।আবার কলকাতার নিউ টাউনের সাপুরজি আবাসনে আত্মগোপন করে থাকা পাঞ্জাবের যে দুই গ্যাংস্টার  ৯ জুন স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মারা  গিয়েছিলো সেই জয়পাল সিংহ ভল্লার ওরফে  মনজিৎ সিংহ  এবং যশপ্রীত ওরফে  জাসসি  ওই ঘটনার আগে বীরভূম ঘুরে গিয়েছিলো বলে জানা গিয়েছিলো।  এখানকার ঝাড়খণ্ড রাজ্য সীমানা লাগোয়া মহম্মদবাজারের  শেওড়াকুড়ি হয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে আগত একটি ট্রাককে  সিউড়ির আব্দারপুর রেলগেটে আটক করে  দু’ জনকে গ্রেফতার করে এবং ট্রাকটি থেকে  ৫ টি সেভেন এমএম পিস্তল,  ১০ টি ম্যাগাজিন, ৩০ রাউণ্ড গুলি ও কুড়ি কেজি  কালো এবং লাল রঙের  বিস্ফোরক উদ্ধার করেছিলো। এখান থেকে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই স্পেশাল টাস্ক ফোর্স কলকাতার  নিউ টাউনের গ্যাংস্টারদের ডেরার হদিশ পেয়েছিলো বলে জানা যায়। এরপর ১৬ জুন রাত্রে ওই   শেওড়াকুড়ি এলাকার মালডাঙা থেকে উজ্জ্বল বাগ্দী নামে একজনকে গ্রেফতার করে তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিলো ১টি নাইম এমএম ও ১ টি সেভেন এমএম  পিস্তল,  ৪ টি  ম্যাগাজিন ও ২০ রাউণ্ড কার্তুজ।  এরপরই ২৬ জুন লাভপুরের  বিষয়পুর গ্রামের বাইরে  একটি শ্মশান এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়  ১ টি বন্দুকের অংশ, ১ টি রাইফেল, ১ টি পিস্তল ও ৫ রাউণ্ড গুলি। ২৭ জুন খয়রাশোল ব্লকের লোকপুর থানার  বারাবনি জঙ্গল থেকে শেখ সামসের, শেখ  আজিজুর ও শেখ রিটনকে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে ৯ রাউণ্ড করে গুলি ভর্তি  ২টি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছিলো। একইভাবে ২৫ জুন কলকাতার আর্মহার্স্ট  থানা এলাকা থেকে কলকাতা পুলিশের  স্পেশাল টাস্ক ফোর্স  মকবুল হোসেন নামে এক  যুবককে  মোটরবাইক-সহ  আটক করে  তার কাছ থেকে ডবম ম্যাগাজিনের  ৪ টি সেভেন এমএম পিস্তল উদ্ধার করেছিলো। সেগুলি মোটরবাইকের সীটের তলায়  লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো।  জানা গিয়েছিলো, এই মকবুল হোসেনের  আসল নাম রাজেন্দ্র প্রসাদ। সে একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী। আদি বাড়ি বিহারের ভাগলপুর। বিহারের মুঙ্গের থেকে আগ্নেয়াস্ত্র এনে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করতো। বীরভূমে এসে সে একটি মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেই অস্ত্র সরবরাহের কাজ করছিলো।            এবার বীরভূমে  পালিয়ে এসে আত্মগোপন করে থাকা ওড়িশার  গ্যাংস্টার  সোলেমান খান ওরফে সলুকে গ্রেফতার করা হলো পাইকর থানার করমজি গ্রাম  থেকে। তার  বাড়ি ওড়িশার ভদ্রক জেলার পুরনো বাজার থানার মিত্রামহুল্লা স্নানঘাট এলাকায়।   এই গ্যাংস্টারের বিরুদ্ধে  একাধিক খুন ও দুষ্কর্মের অভিযোগ রয়েছে।  গত ১৬ জুন সে ও তার দলবল  ওড়িশার  বালেশ্বরে কপিলেশ্বর রাউত নামে এক ব্যবসায়ীকে খুন করে বলে অভিযোগ। ওই ব্যবসায়ী যখন নিজের গাড়ি করে আসছিলেন তখন তাঁর কাছে প্রচুর পরিমাণে নগদ টাকা ও সোনা রয়েছে বলে  গ্যাংস্টার সোলেমান খান জানতে পেরেছিলো। তারপরই সোলেমান খান দু’টি গাড়ি ভর্তি করে তাঁর দলবল নিয়ে ভোরের দিকে  কপিলেশ্বর রাউত নামে ওই ব্যবসায়ীকে মাঝ রাস্তায় আটকে তাঁকে খুন করে সর্বস্ব লুঠ করে নিয়ে চম্পট দেয়।  খুন হয়ে যাওয়া কপিলেশ্বর রাউত নামে ওই ব্যবসায়ী রাজ্যের শাসক দলের প্রভাশালী  নেতা হওয়ার সুবাদে  পুলিশ এই ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসে এবং  গ্যাংস্টার সোলেমান খান ও তার দলবলকে পাকড়াও করতে উঠেপড়ে লাগে। তার গ্যাংয়ের লোকজন বিভিন্ন জায়গায়  গা ঢাকা দেয়। আর সোলেমান খান চলে আসে বীরভূমের পাইকরের করমজি গ্রামে তার পরিচিত   রেশন ডিলার জহরুল ইসলামের বাড়িতে।  এর আগে সে কয়েক জায়গায় ঘুরেও বেড়িয়েছে। ওড়িশা পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজেও তার সন্ধান পাচ্ছিল না। সে কয়েকদিন তার মোবাইল বন্ধ রাখায়  ওড়িশা পুলিশ তার মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন পাচ্ছিল না। কিন্তু দিন কয়েক আগে সে মোবাইলটি চালু করতেই  ওড়িশা পুলিশ মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ধরে  জানতে পারে সে  পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের পাইকর থানা এলাকায় রয়েছে। তারপরই ওড়িশা পুলিশ বীরভূম পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ওই গ্যাংস্টারের ছবিও পাঠিয়ে দেয়। এরপরই বীরভূম জেলা পুলিশ পাইকর পুলিশকে সমস্ত বিষয়টি জানায় এবং পুলিশের একটি দল গোপনে করমজি গ্রামে নজরদারি চালিয়ে এখানকার রেশন ডিলার জহরুল ইসলামের বাড়িতে  সোলেমান লুকিয়ে রয়েছে বলে জানতে পারে। এরপরই বীরভূম পুলিশ বিষয়টি জানায় ওড়িশা পুলিশকে। জহরুল ইসলামের বাড়িতে সোলেমানের লুকিয়ে থাকার বিষয়ে সুনিশ্চিত হয়ে,  পুলিশের একটি দল ৪ জুলাই রাত্রে করমজি গ্রামে জহরুল ইসলামের বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং সেখান থেকে ওই গ্যাংস্টার  সোলেমান খানকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানতে পারে,  সোলেমান খান ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার আড়ালে  ট্রাকে চাপিয়ে গরু পাচারের ব্যবসার সাথেও জড়িত।  ওড়িশা পুলিশ ইতিমধ্যেই সোলেমান খানের আরও চার সঙ্গীকে  কপিলেশ্বর রাউত খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে। সোলেমান খানের বিরুদ্ধেও খুনের ঘটনায়  ৩০২ ধারায় মামলা রুজু করে একদিন পরে রামপুরহাট  আদালতে হাজির করা হয়। ওড়িশা পুলিশ   রামপুরহাট আদালত থেকে সোলেমান খানকে  ট্রানজিট রিমাণ্ডে নিয়ে ওড়িশা রওনা দেয়। সোলেমান খানের সঙ্গে করমজি গ্রামের রেশন ডিলার জহরুল ইসলামের কী ধরনের সম্পর্ক তা এখন খতিয়ে দেখছে বীরভূম জেলা পুলিশ ।।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *