সাহিত্য বার্তা

উড়ান পর্ব ৯

উড়ান (পর্ব- ৯),

দেবস্মিতা রায় দাস,

করণ অবশ্য পালকের দিকে চোরাগোপ্তা নজর দিচ্ছিল, কিন্তু পালক বিশেষ একটা পাত্তা দেয় নি। এখানে আসার পর থেকে বেশ কিছু মেসেজও করে করণ পালককে, পালক তা পড়ারও দরকার মনে করে নি.. বাইরে থেকেই ডিলিট করে দিয়েছে।

ক্রমে সকলের স্যাম্পল টেস্টের দিন এসে গেল। এর মধ্যে ওই বেড়ানোর সময়টুকু ছাড়া অনেকটা সময় পালক নিজেকে ইমপ্রোভাইস করার পিছনে দিল, নিজের রুমে একা বা মীরার সামনে বিভিন্ন টপিকে বলা প্র‍্যাকটিস করতে লাগলো। কানে হেডফোন লাগিয়ে কিছু প্রসিদ্ধ আর জের করা অডিও ক্লিপও শুনতে লাগলো। রোহিত রায়ের সাথে প্রায় রোজ রাতেই দেখা হতে লাগলো। উনিও খুব উৎসাহ দিলেন তাকে।

ইত্যবসরে একটা বেশ অদ্ভুত ঘটনা ঘটল পালকের সাথে। ঝিলম বলে একটা মেয়ে ছিল তাদের আটজনের মধ্যে। মেয়েটি বেশ উগ্র ধরনের। স্যাম্পল টেস্টের দিন দুবাইয়ের সেই বিশাল আর জে অফিসের সেই রেকর্ডিং রুমের নীচের তলায় একটা জায়গায় একটা চা কফি খাওয়ার জায়গা ছিল। পালক নিজের কফি আনতে যেতেই ঝিলম ইচ্ছে করে তাকে ধাক্কা মেরে কফিটা তার অরেঞ্জ টপ আর ব্লু জিন্সের উপর ফেলে দিল। পালক প্রচন্ড অবাক হয়ে প্রতিবাদ করতে যেতেই ঝিলম মুখ বেঁকিয়ে বলল..

“সো হোয়াট! টেল ইয়োর স্যার, এন্ড ইউ উইল গেট মেনি!!”

বলেই বক্র হেসে তাকালো বাকিদের দিকে, তাদের মধ্যেও একটা হাসির রোল উঠল।

পালকের মুখ পলকে লাল হয়ে উঠল। তার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল। কতো কষ্ট করে ও আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে, সেটা যে ওর নিজের যোগ্যতায় তা ও খুব ভালোভাবেই জানে। এই বয়সেই ওর মা বাবা ভাই বোন কেউ নেই। তাও যথেষ্ট হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে ও। ওর এই কঠিন যাত্রাপথে কেউ কেউ ওকে সাহায্য করেছে, তাদের মধ্যে একজন অবশ্যই এই রোহিত স্যার। কিন্তু কিছু না করেই শুধু রোহিত রায়ের সুনজরেই সে এতোটা উঠেছে.. এই কথা যে কতো ভুল সেটা সে ছাড়া আর কে জানে! তাই ঝিলমের কথা শুনে আর বাকিদের অভিব্যক্তি দেখে সত্যিই তার চোখ ফেটে জল এল। আবার এটাও চিন্তা হল এই অবস্থাতেই অডিশন দিতে হবে তাকে, দ্বিতীয় কোনো পোশাক তো সে আনে নি!

ওখানে দাঁড়িয়েই কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল পালক.. সেটা দেখে ঝিলম আবার নাক সিঁটকালো..

“নাউ প্লিজ ডোন্ট ক্রিয়েট আ ড্রামা ওভার হিয়ার!!”

“হু ইজ ক্রিয়েটিং ড্রামা ঝিলম?? পালক অর ইউ??”

গর্জে উঠল মীরার গলা পিছন থেকে। ঝিলম আবার মুখ বেঁকালো..

“ওহ মাই মাই,, দেখো এবার কে এসেছে ওকালতি করতে.. আমাদের মক্ষীরানি! যার নিজেরই ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ম্যানেজমেন্ট হেড সহ আরো কতজনের সাথে সম্পর্ক আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই! এন্ড ইউ থিংক আই এম এফ্রেড অফ ইউ হাহ!?”

মীরার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। এবারে আর বাকিরা কিন্তু আগের মতোন হাসতে পারলো না৷ মীরাকে বেশ ভালোই ভয় পেত লোকজন। মীরার কঠিন স্বভাব সম্পর্কে পালক এতোদিন শুধু শুনেইছিল, এবারে দেখল। গট গট করে ঝিলমের সামনে গিয়ে সপাটে তার গালে একটা চড় মারলো! ঝিলমের মুখ হাঁ হয়ে গেছে, পালকও হতবাক। ও বোধহয় ভাবতে পারেনি যে এমন করতে পারে মীরা। যে সব মানুষের মন হিংসায় ভর্তি থাকে, তাদের আদতে কোনো সৎ সাহস থাকে না। তাই একটু দাবড়ানি খেলেই তারা চুপ করে যায়। সেখানে সে খেয়েছে একটা সপাটে চড়! বাকিদের মুখও তখন দেখার মতো। পালককে নিয়ে চলে যাওয়ার আগে মীরা ঠান্ডা গলায় ঝিলমকে বলে গেল..

“আই উইল জাস্ট মেক ইট সিয়োর দ্যাট ইউ উড নট বি এবল টু বি ইন দ্য কম্পিটিশন, জাস্ট ওয়াচ ইট!!”

ঝিলম মূর্তির মতোন দাঁড়িয়ে রইল, এবার তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে! পালকের মাথায় ঘুরতে লাগলো ঝিলমের কথাগুলো। তার কথার মধ্যে কি কোনো সত্যতা আছে? নাকি রোহিত স্যারের সম্পর্কেও যেমন অফিসের কেউ কেউ আজেবাজে কথা বলে তেমনই কিছু??

অবশ্য এখন আর অতো ভাবার সময় নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে তাদের টেস্ট। অলরেডি অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর তার মনেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনকে শক্ত করার চেষ্টা করে পালক। তার জীবনে যেন কোনো কিছুই সহজে আসে না। এতো কম দিনে এতোটা উঠে আসার জন্যই তার উপর এই ঈর্ষা, তা সে জানে। যা তার বন্ধুরা প্রায় কেউই পারেনি।

মীরার কাছে যেন সবকিছুর সলিউশন আছে। সে কোথাথেকে তাকে একটা শর্ট ড্রেস জোগাড় করে দিল আর অনেকটা চিয়ার আপ করার চেষ্টা করল তাকে। বলল যেন সে ভুলে যায় এক্ষুনি এখানে কিছু হয়েছিল বলে। পিঙ্ক ড্রেসটা পড়ে বেশ মিষ্টি লাগছিল পালককে। আজ রোহিত রায় এসেছিলেন। পালকের মাথায় হাত রেখে বেস্ট অফ লাক জানালেন তিনি। একটু আগের ঘটনা পালক আর কিছু বললোনা তাকে। মীরা ইশারায় বারণ করল।

রাহুল আর মীরাকে দিয়ে স্টার্ট হওয়ার পরই ডাক পড়ল পালকের। সেদিন শুধু সে, স্যাম আর রাহুল ছিল। আজ সকলের সামনে, বিশেষত তার আইডল মেন্টর আছে তার সামনে৷ পালকের বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো। রেকর্ডিং রুমের ভিতরে একপাশে রোহিত রায়, একপাশে রীনা ম্যাডাম আর অন্যপাশে স্যাম বসে। বসে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে মায়ের মুখটা স্মরণ করে নেয় পালক। স্যাম কিছুটা সময় দেয় তাকে। চোখ খুলেই পালক আগে সবাইকে অভিবাদন জানায়। এই টেস্টের উপর অনেককিছু নির্ভর করছে। নির্ভর করছে সে আদৌ কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা। কারণ আটজনের মধ্যে থেকে তিনজন বাদ যাবে আর পাঁচজন যাবে৷ তার মধ্যে মীরা আর রাহুল যে উঠবে এই বিষয়ে কারুরই কোনো সন্দেহ নেই! তবে আর বাকি তিনজনের মধ্যে তার নাম কি থাকবে? পারবে সে এই বিশাল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে?? বুক ঢিপঢিপ যেন বেড়েই চলেছে পালকের।

স্যাম আজ তাকে টপিক দিল একজন এমন ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বক্তব্য রাখতে যে পালকের জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। পালকের মুখ দিয়ে ওই একটা শব্দ বেরোতে একমিনিটও দেরি হয় না ‘মা’। এরপর কখন যে সে নিজের কথার মধ্যে হারিয়ে যায়, তা নিজেও টের পায়নি। যখন বলা শেষ করল তখন তার নিজের সহ রীনা ম্যাডাম, স্যাম প্রত্যেকের চোখে জল। রোহিত স্যার অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

রেকর্ডিং রুম থেকে বেরিয়ে চুপ করে এক জায়গায় বসে ছিল পালক। হঠাৎ মীরা এসে তাকে জড়িয়ে ধরল আনন্দে। উত্তরটা বুঝতে পেরে পালকের দুচোখ দিয়ে আনন্দাশ্রুর ধারা নামলো।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *