হাইকোর্ট সংবাদ

বৃহত্তর বেঞ্চে সাতদফা নির্দেশ পুন বিবেচনার আর্জি রাজ্যের

বৃহত্তর বেঞ্চের সাতদফা নির্দেশ পুনবিবেচনার আর্জি রাজ্যের

মোল্লা জসিমউদ্দিন টিপু,


আবার কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চের সাতদফা নির্দেশ পুনবিবেচনার আর্জি রাখলো রাজ্য।আগেও একবার রেখেছিল তা অবশ্য খারিজ করে দিয়েছিল বৃহত্তর বেঞ্চ। তবে গত ২ জুলাই কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের তরফে যে সাতদফা নির্দেশ জারি করা হয়েছে। তা খারিজের আবেদন জানালো রাজ্য।রাজ্যের বক্তব্য – ‘গত ২ জুলাই নির্দেশ জারির পূর্বে রাজ্যের বক্তব্য পেশ করার সূযোগ দেওয়া হয়নি।একতরফাভাবে জারি করা হয়েছে আদেশনামা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে সবরকম সহযোগিতা করা হয়েছে। কোন তথ্য গোপন করা হয়নি।জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট রাজ্য কে পর্যবেক্ষণ করার সময় দেওয়া হয়নি।তাই পুন বিবেচনা করতে রাজ্যের বক্তব্য  জানা উচিত বৃহত্তর বেঞ্চের’।একুশে বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে মামলা দাখিলের পর থেকে আশঙ্কা ছিল আদালত হিংসা রুখতে কড়া দাওয়াই দেবে।অবশেষে তা ঘটলো গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চে। সাত দফার অন্তবর্তী নির্দেশ জারি করেছে আদালত। যা রাজ্যের কাছে মোটেই সুখকর নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মুখবন্ধ খামে রিপোর্ট দেখে ক্ষুব্ধ কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। রাজ্য কে নজিরবিহীনভাবে তীব্র ভৎসনা করেছিল আদালত। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষে জানানো হয়েছিল, তারা আদালতের নির্দেশে রাজ্যের ১৬৮ টি জায়গায় পরিদর্শনে গিয়েছিল। তবে যাদবপুরে গেলে তাদের আক্রান্ত করা হয়। রাজ্য কোনভাবেই সহযোগিতা করেনি।পুলিশ ছিল নিস্ক্রিয়। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশের সংশ্লিষ্ট ডিসি রশিদ মুনির খান কে শোকজ করা হয়েছে আদালত অবমাননার জন্য।যা আগামী ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে এই পুলিশ অফিসার কে লিখিতভাবে জানাতে হবে। আগেই আদালত জানিয়েছিল – রাজ্যের  কোন অসহযোগিতা এলে,তা আদালত অবমাননার মধ্যে পড়বে।গত ২ জুলাই যে সাত দফার অন্তবর্তী নির্দেশ জারি হয়েছে সেগুলি হলো, ১/  প্রত্যেক অভিযোগের ভিক্তিতে এফআইআর করতে হবে। সমস্ত ঘটনার দ্রুত তদন্ত শুরু করতে হবে। ২/ ভোট পরবর্তী হিংসায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার। ৩/ মৃত বিজেপি কর্মী অভিজিৎ সরকারের মৃতদেহ কলকাতার কম্যান্ডো হাসপাতালে রাখতে হবে। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত হবে দেহের।৪/ যাদবপুরে কেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিদের হামলার মুখে পড়তে হলো, ডিএম /এসপি  কে কেন শোকজ করা হবেনা, তা জানাতে হবে রাজ্য কে।৫/ ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসায় আহতদের রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে রাজ্য কে। ৬/ যে যে অভিযোগ বিভিন্ন কমিটি বা আহতদের লোকজন করছে তা ১৬৪ নং ধারা মতে পুলিশ কে নথিভুক্ত করতে হবে। সমস্ত অভিযোগ গুলি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে জানাতে হবে। ৭/ রাজ্যের কাছে যা তথ্য আছে তা মুখ্যসচিবের দায়িত্বে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। এদিন শুনানিতে রাজ্যের আইজি ( আইনশৃঙ্খলা)  রিপোর্ট নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। গত সপ্তাহে   কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষে অসম্পূর্ণ রিপোর্ট জমা পড়েছিল।কমিশনের আইনজীবী আদালতের কাছে আরও সময় চেয়েছেন। ওইদিন রাজ্যের আইনজীবী জানিয়েছেন – ‘ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে সহযোগিতা করছে রাজ্য’। যদিও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষে অসহযোগীতা পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। গত সপ্তাহে যাদবপুরে কমিশনের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ। কমিশন আদালত কে জানিয়েছে- ‘গত ২৪ জুন তারা এই রাজ্যে এসেছে। ৫ টি নোডাল পয়েন্ট গড়া হয়েছে। এছাড়া ৫/৬ টি ভাগে তারা রাজ্যের বিভিন্ন সন্ত্রাস কবলিত ১৬৮ টি এলাকায় ঘুরছেন’।ভোট পরবর্তী হিংসার মামলা নিয়ে জোর ধাক্কা খেয়েছে রাজ্য সরকার। গত ১৮ জুনের কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের নির্দেশিকার উপর পুন বিবেচনার আর্জি রেখেছিল রাজ্য সরকার।তা খারিজ করে দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চ। শুধু তাই নয় গত ১৮ জুনের যে নির্দেশিকা ছিল, তার তদন্তের অভিমুখ পরিস্কার করে দিয়েছে আদালত। ওইদিন ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে একযোগে ৯ টি মামলার শুনানি চলেছিল। সেখানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কে বিশেষ কমিটি গঠন করে রাজ্যের জেলায় জেলায় ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ গুলি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। যেসব পুলিশ অফিসার ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ পেয়ে নিস্ক্রিয় থেকেছেন। এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রান্তের অভিযোগ নিয়ে উল্টে আক্রান্তকেই চমকেছেন।সেইসব ‘নীরব’ পুলিশ অফিসারদের চিহ্নিতকরণ করতে বলা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে। তা ৩০ ই জুনের মধ্যে জমা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। গত শুনানিতে রাজ্যের তরফে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন কে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল আদালতের কাছে।তবে তাতে অনাস্থা রেখেছিল কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। ওইদিন আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে – ‘ রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছে কোন অভিযোগই জমা পড়েনি।অর্থাৎ আক্রান্তরা রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছে অনাস্থা রেখেছে বলা যায়।অথচ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে ৬৪১ টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করলে রাজ্যের আপত্তি কিসের?  ভোট পরবর্তী হিংসায় পুলিশ এফআইআর করেনি।রাজ্য সরকারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে এত লুকোচুরি কেন রাজ্যের? ‘ এইভাবে কড়া অবস্থান নেয় পাঁচ সদস্যের বিচারপতিদের এই বৃহত্তর বেঞ্চ।  গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ অত্যন্ত কড়াভাবে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন কে রাজ্যে ঘুরতে নির্দেশ দেয় ।পাশাপাশি রাজ্য কে সহায়তা করতে নির্দেশ দেয়।রাজ্য নিস্ক্রিয়তা দেখালে তা আদালত অবমাননার সামিল হবে বলেও হুশিয়ারি দেয় আদালত। এহেন নির্দেশে চাপে পড়ে রাজ্য সরকার এই নির্দেশিকা পুন বিবেচনা করার পিটিশন দাখিল করে ছিল। য রাজ্য সরকার আবেদনে জানায় – ‘ সময়ের অভাবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে  পারেনি।আগেকার নির্দেশ পুন বিবেচনা করা হলে সব অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে’। রাজ্যের তরফে হলফনামা জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতে কোন সাড়া দেয়নি আদালত। এর আগে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছিল – ‘ শুধু শারীরিক আঘাত নির্যাতন নয়, চাকরি কেড়ে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে না দেওয়া একপর্যায়ে নির্যাতন।যা আদালত মেনে নেবেনা’। গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের তরফে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল – ‘ রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা জানতে ঘুরবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরা।শুধু তাই নয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী রাজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রাজ্য কে আদালত অবমাননা মামলার মুখে পড়তে হবে’। ঠিক এভাবেই  কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চ রাজ্য কে হুশিয়ারি দিয়েছিল।কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখবে। তাদের সাহায্য করবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন বলে জানিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। ওইদিন আদালত পর্যবেক্ষণে জানায় – ‘ ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার কথা স্বীকার করেনি রাজ্য সরকার। কিন্তু আমাদের কাছে যে অভিযোগ জমা পড়েছে। তাতে ভোট পরবর্তী হিংসার প্রমাণ মিলেছে। ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরাতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মানবাধিকার কমিশন ও রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিসের প্রতিনিধিরা ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজনীয় সহযোগী পাইনি রাজ্যের কাছ থেকে। তাদের কে অসহযোগিতা করা হয়’। এরপর আদালত নির্দেশ দেয় – ‘রাজ্য কে অসহযোগিতা করার  দায় নিতে হবে। কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন আদালত কে রিপোর্ট জমা দেবে।এই নির্দেশ না মানলে আদালত অবমাননার মধ্যে পড়তে হবে রাজ্য কে’। ওইদিন এইবিধ মামলার আবেদনকারীদের আইনজীবী প্রিয়াংকা টিবরেওয়েল জানিয়েছিলেন – ‘ আমরা বারবার ভোট পরবর্তী হিংসার তথ্য দিয়েছি, তবে তা রাজ্য স্বীকার করেনি।পরে আদালত এইসব অভিযোগের সততার গভীরতা বুঝলো’।ইতিমধ্যেই ৩২৪৩ টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিস কমিটির কাছে।উল্লেখ্য, গত মাসে বীরভূমের নানুর লাভপুর থানায় ঘরছাড়া ঘরে ফেরানোর বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন এই আইনজীবী। তারপর এক গ্রামছাড়া গ্রামে ফিরলে ব্যাপক মারধর করা হয় এক গেরুয়া সমর্থক কে।নানুরের এই ঘটনায় এখনও চাঞ্চল্য রয়েছে এলাকা জুড়ে। কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে চলছে রাজনৈতিক হিংসায় ঘরছাড়াদের নিয়ে একগুচ্ছ মামলার শুনানি। এই বৃহত্তর বেঞ্চে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডাল, বিচারপতি ইন্দ্রপ্রসন্ন মুখার্জি, বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন, বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি সুব্রত তালুকদার।গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ মামলা চলাকালীন জানায় – ‘ প্রত্যেক মানুষ তার নিজের বাড়িতে থাকার অধিকার রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করতে হবে রাজ্যকেই’। গত ২ জুলাই সাতদফা নির্দেশ জারি করে কলকাতা হাইকোর্ট। যার পুন বিবেচনা চেয়ে আপিল পিটিশন দাখিল করে থাকে রাজ্য।চলতি সপ্তাহে এই মামলার শুনানি রয়েছে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *