সাহিত্য বার্তা

উড়ান পর্ব ৮

উড়ান (পর্ব- ৮)
দেবস্মিতা রায় দাস,

দুবাইতে এসে বেশ কদিন হয়েছে, যা বুঝেছে পালক.. এখানে মাসখানেক থাকতে হবে। জিতের সাথে আর সেভাবে কথা বলা হয়নি। ও সেমিস্টার নিয়ে ব্যস্ত, আর পালকও যেন এক অন্য জগতে। ঝাঁ চকচকে শহরে নিজের মেলে ধরতে ব্যস্ত। তার গ্রুমিংএর পর্ব দ্বিতীয় দিনেই সমাপ্ত করে দিয়েছে মীরা কতোকটা রোহিত স্যারের ইচ্ছাতেও। এখানে তা ছাড়া যে টেকা মুশকিল তা পালকও কতোকটা বুঝেছে বৈকি। তাই হেয়ার স্পা, ফেসিয়াল, ম্যানিকিওর, পেডিকিওর, বডি অয়েল ম্যাসাজ কমপ্লিট প্যাকেজের পর নিজেকে খুবই রিফ্রেশড লাগছিল পালকের। অনেকটা যেন কনফিডেন্স বাড়ালো তার।

এখানে আসা ইস্তক তাদের সকলেরই সাধারণ ট্রেনিং এর বাইরেও প্রচুর পার্টি এটেন্ড, লোকজনের সাথে পরিচয় এসব লেগেই ছিল। পালক এসব ব্যাপারে কখনোই খুব স্বচ্ছন্দ ছিল না। কিন্তু কতোকটা বা রোহিত স্যারের সাহায্যেই সে এই পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে লাগলো। আর আশ্চর্যজনক ভাবে মীরা একটা সুরক্ষা বলয়ের মতো সর্বক্ষণ তার আশেপাশে রইল। করণ অনেক চেষ্টা সত্বেও তার ধারেপাশে ঘেঁষতে পারলো না।।

প্রথম যেদিন দুবাইয়ের আর জে অফিসে ঢুকলো পালকের তো মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। এতো সুন্দর সুবিশাল অফিস সে আগে কোথায় দেখেছে মনে করতে পারলো না। প্রায় দশতলার বিল্ডিং এ প্রতিটা তলাই দুর্দান্ত করে সাজানো। বিশাল উঁচু সিলিং আর বিশাল বড়ো বড়ো ঘর।

আর দু একদিনের মধ্যেই সবার একটা করে স্যাম্পল টেস্ট নেওয়া হবে। সেটা অবশ্য পালকের একার নয়, মীরা সহ বাকি প্রত্যেকেরই।
আজ স্যামের কাছে পালকের একার একটা স্যাম্পল টেস্ট হবে তার আগে। পালক একটু নার্ভাস। রোহিত স্যার আজ আর সাথে আসতে পারেননি। তাই রাহুলকে পাঠিয়েছেন। করণকে পাঠাতে গিয়েও থমকে গিয়েছিলেন পালকের মুখের হাবভাব দেখে। কারণটা সঠিক বুঝতে পারেননি। কিন্তু সেদিনের পর থেকে পালকের সাথে তার এতোটুকু তো সম্পর্ক হয়েছে যে তার কিছু না বলা কথাও তার দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন। তাই আজ তিনি রাহুলকেই পাঠিয়েছেন এতোবড়ো জায়গায় পালক একা এলে ঘাবড়ে যেতেই পারে সেই কথা ভেবে। রাহুল সাতে পাঁচে থাকে না, রোহিত রায়ের সাথে পালকের এই সুন্দর সম্পর্কে মীরার মতোন সেও উদাসীন। সারাক্ষণ গানের কলি গুনগুন করে নিজে হাসিখুশি থাকা আর সবাইকে হাসিয়ে রাখাই তার স্বভাব। আজকেও যথারীতি সে পালককে হাসি মজার মধ্যেই ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল।

রেকর্ডিং রুমটায় ঢুকে পালকের দারুণ লাগলো। দারুণ ঝকঝকে করে সাজানো একপাশে মাইকের সামনে বসার চেয়ার। একটু গ্যাপে গ্যাপে আরো দুটো মাইক আছে৷ পালক খেয়াল করল রুমটা বেশ বড়ো, ফুল নিট এন্ড ক্লিন.. আর খুব সুন্দর করে সাজানো। স্যাম আজ তাকে টপিক দিল একটা ওল্ড এজ হোমে ফোন করে বয়স্ক লোকেদের সাথে কথা বলার কথোপকথন। সে নিজে একজন বয়স্ক লোকের গলায় কথা বলল। পালক প্রথমে বেশ থমকে গিয়েছিল, তারপর তার মতোন করে শুরু করল কথোপকথন। মিনিট দশেক চলার পর স্যাম তাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিল, পালক বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছিল। রাহুল একটা ছোট্ট করে ক্ল্যাপ করে ওঠার পর স্যাম বলল..

“মোটামুটি ঠিক আছে, আর একটু মাজাঘষা দরকার! নিজে নিজে ঘরের মধ্যেও এরম বলা প্র‍্যাকটিস করবে, তাহলেও হবে। আসলে তোমার একটা খুব বড়ো প্লাস পয়েন্ট হল তোমার ভয়েসটা খুবই এট্রাকটিভ আর টোনাল কোয়ালিটিও ভাল। সেইভাবে কাজে লাগাতে পারলে বেশ ভালো জায়গাতেই পৌঁছাবে!”

শেষের কথাটা শুনে পালক মনে ভরসা পেল খুব। কি করে যেন একটু একটু করে তার স্বপ্নপূরণের পথে যাত্রা শুরু করেছে সে। রাহুল তো ফেরার পথে খালি তাকে বলতে বলতে এল এই দারুণ খবরের ট্রিটটা তাকে কবে দিচ্ছে সে।

রেকর্ডিং রুম থেকে বেরিয়ে বাকি সব গুলো ফ্লোর ঘুরে ঘুরে দেখল তারা দুজন। স্যাম চলে গিয়েছিল। দারুণ ঝকঝকে জায়গা। পালকের দারুণ লাগছিল। রাহুলের সাথেও ভালো করে আলাপ হল। বসিরহাটের ছেলে.. খুব অভাবী ঘরের। বাবা তেমন কিছু করে না.. দুটো বোন আছে। সমস্ত দায়িত্ব একা রাহুলের উপর। তবুও কতো হাসিখুশি থাকে সে, বাইরের কাউকে কিছু বুঝতেই দেয়না। রোহিত স্যারও খুব পছন্দ করেন তাকে তার ব্যবহার আর ভালো কাজের জন্য।

রাত্রিবেলা রাহুলদের ঘরে বেশ খাওয়াদাওয়া ড্রিংক্স গানবাজনা করছিল তারা। রাহুলও ভালো গান করে। পালকও গান করল বেশ কয়েকটা। পালকের হঠাৎ তার বন্ধু সুরভির কথা মনে পড়ল, সেও বেশ ভালো গান করে। যদিও এখানে নতুন বন্ধু হয়েছে, তবুও খুব মিস করছে সুরভি আর প্রীতমকে। পার্টি চলছে চুটিয়ে, হঠাৎ মীরা তার কানে কানে এসে কিছু বলল। পালক সবাইকে একটু ‘এক্সকিউজ মি’ বলে বাইরে বেরিয়ে এল। বেশ কজনের ভ্রু একটু কুঞ্চিত হল, কেউ বা একটু মুখ বেঁকিয়ে হাসলো।

পালক তাতে বিশেষ আমল না দিয়ে হাঁটা লাগালো রোহিত স্যারের ঘরের দিকে। স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন। রোহিত রায়ের রুমটা বেশ বড়ো, তারা যেই দিকটায় আছে তার অপর প্রান্তে। ঘরের মাঝে একটা সুবিশাল খাট। আর উপরে সিলিংএর অনেকটা জুড়ে ডিমলাইট লাগানো। ঘরের সাথে লাগোয়া একটা বিশাল ব্যালকনি। পালক ঘরে ঢুকে দেখল ঘরে কেউ নেই, খালি ডিমলাইটগুলো জ্বালানো। রোহিত স্যারকে দেখতে পেল ব্যালকনিতে একটা স্লিপ গাউনে গ্লাস হাতে। পালক পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই উনি ফিরলেন.. চোখদুটো অল্প লাল। হাসলেন তার দিকে তাকিয়ে। একই সাথে স্নেহের সাথে তীব্র আকর্ষণ সেই চাহনিতে। সেদিনের মতো করেই পালকের গালে হাত রাখলেন। কিন্তু তার বেশী এগোলেন না তক্ষুনি। পালককে জিজ্ঞেস করলেন সকালের কথা.. কেমন লেগেছে রেকর্ডিং অফিস, সে কেমন বলতে পারলো, এখানে এসে তার কেমন লাগছে, এই দারুণ সুযোগ পেয়ে সে খুশি কিনা,, ইত্যাদি ইত্যাদি। পালক অভিযোগ জানালো প্রথমবার এতো বড়ো জায়গায় গিয়ে সে খুবই ভয় পেয়েছে, তিনি সাথে গেলে অনেকটা আরো ভরসা পেত। রোহিত মুখে কিছু না বলে তার কোমরে একটা হাত রেখে নিজের দিকে টানলেন। অনেক্ষণ ধরে একটা চুম্বন এঁকে দিলেন তার ঠোঁটে। এরপর ঘরে নিয়ে এলেন তাকে। গ্লাসটা পাশের টেবলে রেখে আস্তে আস্তে আনড্রেস করতে লাগলেন তাকে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললেন..

“আজ আমার বড্ড একা লাগছে পালক, বড্ড একা। আজকের রাতটা আমার কাছে থাকবে তুমি?? আমায় একটু ভালোবাসবে??”

আজ আর পালক না করতে পারে না। আস্তে আস্তে করে নিজেকে মিলিয়ে দেয় স্যারের সাথে। কেমন এক প্রকার মায়া জন্মে গেছে তার স্যারের উপর। আজ যেখানে যেমন দাঁড়িয়ে আছে, সব এই স্যারেরই জন্য। রোহিত রায়ের হাত ঘুরে বেড়াতে লাগলো পালকের সারা শরীরে। পালকও চোখ বুজে ঝিম ধরা আমেজে বিভোর হয়ে রইল। পালকের কানের লতিতে, চোখের পাতায়, গলায়, ঘাড়ে, পিঠে তিনি অজস্র চুম্বন এঁকে দিতে লাগলেন। আর এই দারুণ অন্তরঙ্গ মুহুর্তে পালক রোহিত রায়কে করণের তার উপর করা অশালীন ব্যবহারের কথা জানিয়ে দিল। মনের মধ্যে জমে ছিল অনেকখানি মেঘ হয়ে, মীরার পরে তাকেই প্রথম বলে ফেলল পালক। রোহিত রায়ের চোখদুটো ধক করে একবার জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেল.. কি চলল মনের মধ্যে পালক ঠিক বুঝতে পারলো না।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাও চলতে লাগলো তাদের। সবাই মিলেই ঘোরা হল একটা ট্র‍্যাভেলরএ করে। বেশ কিছু সী বীচ যেমন কাইট, কোভ,, কিছু থিম পার্ক দেখলো। দুবাই ফাউন্টেন, দুবাই এমিরেটস মল, বুর্জ আল আরব জুমেইরাহ, জুমেইরাহ মসজিদ, স্কাইডাইভিং.. পরের কদিন এইসবেই সময় কাটলো তাদের। স্কাইডাইভিং করতে প্রথমে সাহস পাচ্ছিল না পালক। কিন্তু মীরা আর রাহুলের উৎসাহে করে তার দারুণ লাগলো। ভেসে বেড়ানোর সময় তার নিজেকে পাখির মতোন হাল্কা মনে হচ্ছিল। দৈনন্দিন টানাপোড়েনের থেকে যেন সে অনেকটা ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিল সেই সময়। পালকের মনে হচ্ছিল সে যেন স্বপ্ন দেখছে। প্রথম যেদিন এই অফিসে জয়েন করছিল, বোধহয় ভাবতেও পারেনি কদিনের মধ্যেই এমন সৌভাগ্য হতে পারে। মনে হল যেন সে আকাশে উড়ছে। করণও এসেছে তাদের সাথে, খেয়াল করল রোহিত রায় কেমন কড়া দৃষ্টি দিচ্ছেন করণের দিকে, আর প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ একটা কথা বলছেন না।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *